নিজস্ব প্রতিবেদক
২৭ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩৯ পিএম
নেপাল ও চীনের তিব্বতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৮০০ জন বিদেশি। হিমালয়ের একটি নদীতে কাদা ও পাথরের বিশাল স্তূপ ধসে পড়ে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হলে বুধবার দুর্গম অঞ্চলটির বিভিন্ন শহর ও উপত্যকা প্লাবিত হয়।
বন্যার পর নেপালে উদ্ধারকারীরা হেলিকপ্টারে করে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান করছেন। দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া হাজারো মানুষের কাছে জরুরি ত্রাণসামগ্রীও পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের চলাচলে ব্যস্ত লাসা থেকে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু পর্যন্ত বিস্তৃত পার্বত্য অঞ্চলে এ দুর্যোগ আঘাত হেনেছে।
নেপালের পুলিশ জানিয়েছে, মৃতের সংখ্যা ১৬৫ ছাড়িয়ে যেতে পারে। পুলিশের মুখপাত্র অভি নারায়ণ কাফলে রয়টার্সকে বলেন, উদ্ধার অভিযান আবার শুরু হয়েছে। ফলে আরও মরদেহ উদ্ধারের সম্ভাবনা রয়েছে এবং মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে।
পুলিশ ও পর্যটন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নেপালে নিখোঁজ ৮২৬ জনের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন বিদেশি। দুই ডজনের বেশি দেশের নাগরিকদের মধ্যে ভারতের ১৭৭ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৬৩ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪ জন, যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন এবং কানাডার ২৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, তিব্বতের গিয়রং কাউন্টিতে নিখোঁজ রয়েছেন ৫৫৮ জন। তাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি। সেখানে মৃতের সংখ্যা তিনজনেই রয়েছে।
যাচাই করা ভিডিওতে দেখা গেছে, গিয়রংয়ের সীমান্ত এলাকায় পানি ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত কয়েক ডজন মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। নেপালে ঘরবাড়ি, সড়ক ও বিদ্যুৎ প্রকল্পও পানির তোড়ে ভেসে গেছে।
নেপালের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৬৮ বছর বয়সী বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি কেশব প্রসাদ বারাল বলেন, কাদার বিশাল স্রোত তাদের দিকে ধেয়ে এসেছিল। সেটি যত কাছে আসছিল, ততই উঁচু হচ্ছিল। কাদা ঘরে ঢুকে পড়ার পর তিনি স্ত্রীকে হাত ধরে বাড়ির ছাদে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কাদার স্রোতে তার স্ত্রী ভেসে যান।
চার ঘণ্টা পর একটি হেলিকপ্টারে করে তাঁকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। বারাল বলেন, তার স্ত্রী এখনো কাদার নিচে কোথাও চাপা পড়ে আছেন। আরেকজন বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি একটি আমগাছ আঁকড়ে ধরে জীবন বাঁচান। তিনি যে বাড়িতে কাজ করছিলেন, সেটি তার চোখের সামনেই ধসে পড়ে।
আরও পড়ুন: নেপাল-তিব্বত সীমান্তে কেন এই বিপর্যয়?
জরুরি ত্রাণ পৌঁছানো শুরু
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে হেলিকপ্টারে করে তাঁবু, খাবারসহ বিভিন্ন জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এসব ত্রাণ দিয়েছে প্রতিবেশী ভারত। নেপালের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেট এ তথ্য জানিয়েছেন।
উদ্ধার অভিযানে সেনাবাহিনী ও পুলিশের ৫ হাজারের বেশি সদস্য অংশ নিয়েছেন। বৃহস্পতিবার তাঁরা ১২৫ জনকে উদ্ধার করেছেন, যাদের মধ্যে ২০ জন বিদেশি।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ সড়কপথে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর একটি নুওয়াকোটের বিদুরের উদ্দেশে রওনা হন। তাঁর দপ্তর জানিয়েছে, তিনি সেখানে বন্যা পরিস্থিতি পরিদর্শন করবেন।
নেপালের কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে জানিয়েছিলেন, ওই এলাকায় ভূমিকম্পের কারণে হিমবাহের নিচের অংশ ধসে গিয়ে বন্যার সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানায়, প্রথমে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প বলে যে কম্পন শনাক্ত করা হয়েছিল, সেটি আসলে হিমবাহের পাথর ও বরফ ধসে পড়ার ফলে সৃষ্ট ভূকম্পন। এর পরই ধস নেমে ভয়াবহ স্রোত সৃষ্টি হয়।
এদিকে তিব্বতের গিয়রংয়ে একটি হ্রদ এখনো আটকে রয়েছে বলে জানিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ। ওই হ্রদ থেকে নতুন করে পানি বেরিয়ে এলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত তিব্বত-নেপাল সীমান্তের ওপরের দিকে অবস্থিত হ্রদটি উদ্ধারকাজেও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সিসিটিভি জানিয়েছে।
এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের বড় একটি অংশ তিব্বতের কৈলাস-মানসসরোবর তীর্থযাত্রায় ছিলেন। হিন্দু ও বৌদ্ধসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের কাছে উচ্চ হিমালয়ে অবস্থিত এই স্থানটি পবিত্র। হিন্দুদের বিশ্বাস, কৈলাস পর্বত ভগবান শিবের আবাসস্থল। মানসসরোবর হ্রদও বিভিন্ন ধর্মে পবিত্র হিসেবে বিবেচিত।
হিমালয়ভিত্তিক একটি পর্যটন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী সাগর পান্ডে জানান, তার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কৈলাস-মানসসরোবর তীর্থযাত্রায় যাওয়া ১৫ জন ভারতীয়-অস্ট্রেলীয় নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।
হেলিকপ্টারে করে ওই এলাকা পর্যবেক্ষণের পর তিনি বলেন, সেখানে মানুষের বসতি বা কোনো স্থাপনা প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই। সবকিছু সমতল হয়ে গেছে। হোটেল, রেস্তোরাঁ কিংবা গাড়িতে থাকা সবাই মারা গিয়ে থাকতে পারেন বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বলেন, দুর্যোগের বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, নেপাল একটি উন্নয়নশীল দেশ এবং এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোর তুলনায় তাদের সম্পদ সীমিত। এ কারণে তথ্য পাওয়া কঠিন হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, তারা একজন দুর্যোগ মোকাবিলা বিশেষজ্ঞ পাঠাচ্ছে এবং নেপালকে ৫ লাখ ডলার সহায়তা দিচ্ছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, তার সরকার পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি বন্যাকে অত্যন্ত ভয়াবহ বলে বর্ণনা করেন।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত নেপালি জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করতে জাতিসংঘের বিভিন্ন দল ও অংশীদার সংস্থাগুলো ত্রাণসামগ্রী ও জনবল পাঠাচ্ছে।
এআরএম