Dhaka Mail Logo

আন্তর্জাতিক

যেসব অস্ত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে ফেলতে পারে কানাডা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০:৫২ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ যতই তীব্র হচ্ছে, ততই সামনে আসছে কানাডার পাল্টা চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা। অর্থনীতির আকারে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক ছোট হলেও জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, কৃষিপণ্য ও ভোক্তা বাজারে কানাডার ওপর দেশটির উল্লেখযোগ্য নির্ভরতা রয়েছে। কানাডা তার মোট উৎপাদিত পণ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি করে। ফলে শুল্কের পাল্টা শুল্কের বাইরে গিয়েও ওয়াশিংটনের ওপর কৌশলগত চাপ তৈরির সুযোগ রয়েছে অটোয়ার।

সাম্প্রতিক বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে ‘ডলার-ফর-ডলার’ পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে তা কার্যকর হওয়ার কথা। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডার গাড়ি, যন্ত্রাংশ ও ইস্পাতের ওপর ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন।

মেইন, মিশিগান ও উইসকনসিনসহ যুক্তরাষ্ট্রের ২৬টি অঙ্গরাজ্যের পণ্যের প্রধান ক্রেতা কানাডা। দেশটির ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ৪৫টির ক্ষেত্রেই কানাডা শীর্ষ তিন রফতানি বাজারের একটি। ফলে বাণিজ্যযুদ্ধ আরও তীব্র হলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পাল্টা চাপ তৈরির কিছু কৌশলগত সুযোগ কানাডার হাতেও রয়েছে।

জনমত জরিপেও কানাডীয়দের কঠোর অবস্থানের বিষয়টি উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য বিরোধে কানাডা সরকার বড় ধরনের ছাড় দিলে সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক তাতে অসন্তুষ্ট হবেন বলে জরিপে দেখা গেছে। একই অবস্থানে রয়েছেন অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড। কানাডায় ট্রাম্পের অন্যতম সোচ্চার সমালোচক ফোর্ড যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের হুমকি প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং প্রয়োজনে কঠোর পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, মার্কিন পণ্যের বাজারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ তৈরির সুযোগ রয়েছে কানাডার। কানাডা যেসব ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে পারে, সেগুলোর কয়েকটি নিচে তুলে ধরা হলো-

জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ

শনিবার কার্নি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হওয়া প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিদ্যুতের বিপুল অংশই কানাডা সরবরাহ করে, পাশাপাশি দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশ সরবরাহ করে।

তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় না, তারা চায় আমরা এসব জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দিই।’

বর্তমান পাল্টা ব্যবস্থার মধ্যে জ্বালানি খাতকে লক্ষ্য করে কোনো পদক্ষেপ নেই। তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা স্পষ্টভাবে বলেছেন, এই বিকল্পটি বাতিল করা হয়নি। আবার সব প্রাদেশিক প্রিমিয়ারও এই চাপ প্রয়োগের পক্ষে নন।

অন্টারিওর প্রিমিয়ার ফোর্ড। কানাডার গাড়ি নির্মাণ শিল্পের বড় একটি অংশ এই প্রদেশে অবস্থিত। বাণিজ্য বিরোধ কতটা দূর গড়াতে পারে, সে বিষয়ে তিনি বেশ কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘জ্বালানি সারচার্জের বিষয়টি বিবেচনার টেবিলে রয়েছে।’

অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড। কানাডার গাড়ি নির্মাণ শিল্পের বড় একটি অংশ এই প্রদেশে অবস্থিত। বাণিজ্য বিরোধ কতটা দূর গড়াতে পারে, সে বিষয়ে তিনি বেশ কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘জ্বালানি সারচার্জের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।’

২০২৫ সালে তিনি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে রফতানিকৃত সব বিদ্যুতের ওপর ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত চার্জ আরোপের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তার সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এতে মিশিগান, মিনেসোটা ও নিউইয়র্কের ১৫ লাখ বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রভাবিত হতো।

সার উৎপাদনে ব্যবহৃত পটাশসহ গুরুত্বপূর্ণ পণ্যেরও বড় উৎস কানাডা। এই পণ্যের ক্ষেত্রে কানাডাই বিশ্বের শীর্ষ সরবরাহকারী।

ফোর্ড সোমবার বলেন, ‘আমি দেখতে চাই (ট্রাম্প) তেল ছাড়া কীভাবে গাড়ি চালান। আমি দেখতে চাই পটাশ ছাড়া কীভাবে তিনি ফল ও সবজি উৎপাদন করেন।’

লিথিয়াম, নিকেল এবং গ্রাফাইটের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজেরও উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে কানাডায়। সামগ্রিকভাবে কানাডা থেকে রফতানি হওয়া খনিজের সবচেয়ে বড় গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। ফলে এটিও এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে অটোয়া যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারে।

এ ক্ষেত্রেও ফোর্ডই সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস বা এপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘অন্টারিও থেকে যুক্তরাষ্ট্র এক দানা বালুও পাবে না।’

ক্রয়ক্ষমতা

কানাডা ইতোমধ্যেই দেখিয়েছে যে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার আগেই, গত বছরের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম দফায় শুল্ক আরোপ করার পর জবাবে কানাডার অধিকাংশ প্রদেশের মদের দোকানের তাক থেকে মার্কিন অ্যালকোহল সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের এই শিল্পে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে।

মার্কিন ওয়াইনের রফতানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ওয়াইন ইনস্টিটিউট এই পরিস্থিতিকে ‘কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় বাজার বিপর্যয়’ বলে অভিহিত করে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কানাডায় মার্কিন ওয়াইন রফতানি বছরে বছরে ৭৮ শতাংশ কমেছে। যার ফলে রফতানি মূল্যে ৩৫ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার (৪৯ কোটি ৪০ লাখ কানাডীয় ডলার; ২৬ কোটি ১০ লাখ পাউন্ড) ক্ষতি হয়েছে।

ডিস্টিলারদের সংগঠনও প্রায় একই ধরনের তথ্য দিয়েছে। তাদের ভাষ্য, বিভিন্ন প্রদেশের নিষেধাজ্ঞার কারণে মার্কিন মদজাতীয় পানীয়ের রফতানি ৭০ শতাংশেরও বেশি কমেছে।

কানাডার ১৩টি প্রদেশ ও অঞ্চলের মধ্যে ১১টিতে এই বয়কট এখনো কার্যকর রয়েছে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটা বড় ধরনের হতাশার কারণ। যদিও অ্যালকোহল বয়কটের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক নেতাদের উদ্যোগে চালু হয়েছিল। তবুও সাধারণ কানাডিয়ানদের নেওয়া নানা স্বতঃস্ফূর্ত সিদ্ধান্তও প্রতিবেশী দেশটির অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ এড়িয়ে চলা।

এপ্রিল মাসে সড়কপথে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ কিছুটা বাড়লেও, জাতীয় তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের ক্ষমতায় ফেরার আগে ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ওই মাসে আট লাখ কানাডিয়ান কম সফর করেছেন।

ভ্রমণ বয়কটের ফলে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩.৩ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার (২.৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার; ১.৭৫ বিলিয়ন পাউন্ড) রাজস্ব হারিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কানাডীয়দের আবার যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণে উৎসাহিত করতে দেশটির কয়েকটি শহর ও অঙ্গরাজ্য বিশেষ বিজ্ঞাপন ও আকর্ষণীয় অফারের মাধ্যমে তাদের ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে।

রাজনৈতিক চাপ

আলোচনার ক্ষেত্রে সময়সূচি এবং কানাডার রাজনৈতিক সদিচ্ছাও একটি হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। কানাডীয়রা জানেন, এই বিরোধে তাদেরও অর্থনীতি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। আর্থিক খাত বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, কানাডীয় আমদানির প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের ওপর সাম্প্রতিক ৫০ শতাংশ শুল্ক স্বল্পমেয়াদে দেশটির জিডিপি ০.৩ শতাংশ থেকে ০.৬ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে।

তারপরও, দেশটির অধিকাংশ মানুষ ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার জন্য অটোয়ার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন। অন্যান্য কানাডীয় রাজনৈতিক নেতারাও এ বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান দেখিয়েছেন।

অ্যাঙ্গাস রিডের সপ্তাহান্তের এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭৬ শতাংশ কানাডীয় বাণিজ্য আলোচনা থেকে সরে আসার অটোয়ার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন। একই সঙ্গে তারা নিজেদের চাকরির নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনও দ্রুত এগিয়ে আসছে। ভোটারদের কাছে অর্থনীতি এখন অন্যতম প্রধান ইস্যু। আর কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণও খুব একটা নিরাপদ অবস্থায় নেই।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সিনেট নির্বাচনী লড়াই হচ্ছে মিশিগান ও মেইনে। উভয় অঙ্গরাজ্যই কানাডার সীমান্তবর্তী এবং তাদের অধিকাংশ রফতানি সেখানেই যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সিনেট নির্বাচন হবে মিশিগান ও মেইনে। দুটি অঙ্গরাজ্যই কানাডার সীমান্তবর্তী এবং তাদের রপ্তানির বড় অংশের গন্তব্য কানাডা।

ইয়েল বাজেট ল্যাবের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান আইন অনুযায়ী ট্রাম্পের আরোপ করা বৈশ্বিক শুল্কের কারণে মার্কিন পরিবারগুলোর বছরে প্রায় ১,১০০ ডলার অতিরিক্ত খরচ হবে।

পণ্যের দাম আরও বাড়লে এবং বাণিজ্য বিরোধের বিস্তৃত প্রভাব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর পড়লে, মার্কিন জনগণের মধ্যে অর্থনীতি নিয়ে অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে।

সোমবার কার্নি বলেন, ১ জানুয়ারির পর কানাডা থেকে আমদানি হওয়া গাড়ি ও যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক ৫০ শতাংশ করার ট্রাম্পের সর্বশেষ হুমকিতে মার্কিন শ্রমিকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

তিনি বলেন, ‘মিশিগান, ওহাইও, কেন্টাকি, আলাবামার শ্রমিকদের কাছে কী বার্তা যাচ্ছে? এই শ্রমিকরা কানাডার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল, কারণ কানাডাই তাদের সবচেয়ে বড় ক্রেতা।’

কার্নি আরও বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য দেশের তুলনায় কানাডা বেশি আমেরিকান গাড়ি কেনে।

সোমবার সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার প্রিমিয়ার ডেভিড ইবি বলেন, বিভিন্ন ধরনের পণ্যে মার্কিন শুল্কের প্রভাব ভোক্তাদের ওপর পড়বে।

তিনি বলেন, ‘আপনি যদি নতুন বাড়ি বানান, তাহলে প্লাইউডের ওপর এর প্রভাব পড়বে। মেঝে বদলালে ভেনিয়ারের ওপর প্রভাব পড়বে। বিয়ে করলে কাটা ফুলের দামে প্রভাব পড়বে। মাছ ধরতে গেলে মাছ ধরার ছিপের দামেও প্রভাব পড়বে।’

ডেভিড ইবি বলেন, ‘এটি আমেরিকানদের জন্য এক অদ্ভুত নীতি। এটি তাদেরই ক্ষতি করবে।’

ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির অন্যতম কড়া সমালোচক ফোর্ডও পাল্টা ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশেষভাবে রিপাবলিকান অঙ্গরাজ্যগুলোকে লক্ষ্য করার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে ‘নিশ্চিত করা হবে যে আমেরিকার অর্থনীতি এর যন্ত্রণা অনুভব করে।’

আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন সম্পর্কে ফোর্ড বলেন, ‘আমাকে যদি অনুমতি দেওয়া হতো, আমি সেখানে গিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাইতাম।’ সূত্র: বিবিসি বাংলা।

এমআর