Dhaka Mail Logo

ইসলাম / আন্তর্জাতিক

সৌদি আরবের পাঠ্যবই থেকে ইহুদিবিদ্বেষ সরানো হয়েছে: প্রতিবেদন

ঢাকা মেইল ডেস্ক

১৮ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৪৬ পিএম

সৌদি আরবের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে ধারাবাহিক সংস্কারের চিত্র পাওয়া গেছে। নতুন সংস্করণের বইগুলো থেকে আগের পর্যালোচনায় চিহ্নিত অবশিষ্ট ইহুদিবিদ্বেষী বিষয়বস্তু সরানো হয়েছে। একই সঙ্গে ধর্মীয় সহনশীলতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সমালোচনামূলক চিন্তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর মনিটরিং পিস অ্যান্ড কালচারাল টলারেন্স ইন স্কুল এডুকেশন (আইএমপ্যাক্ট-এস)-এর এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনটি সৌদি আরবের বিভিন্ন মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানবিষয়ক ১৩৬টি পাঠ্যবই পর্যালোচনা করে তৈরি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সংস্কারগুলো সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’-এর আধুনিকায়ন লক্ষ্যের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

আইএমপ্যাক্ট-এসের দাবি, আগের পর্যালোচনাগুলোতে সৌদি পাঠ্যবইয়ে ইহুদিবিদ্বেষী হিসেবে চিহ্নিত যেসব বিষয় অবশিষ্ট ছিল, নতুন সংস্করণে সেগুলোও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে সপ্তম শ্রেণির ‘জীবন ও পারিবারিক দক্ষতা’ বইয়ের একটি হাদিসের অংশ বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ওই অংশে ইহুদি, খ্রিস্টান ও জরথুস্ত্রবাদীদের বিকলাঙ্গ প্রাণীর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া ইহুদিরা জাহান্নামে যাবে-এমন বক্তব্য এবং ইহুদি প্রভাব অটোমান সাম্রাজ্যের পতনে ভূমিকা রেখেছিল-এমন বক্তব্যও বাদ দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

নতুন পাঠ্যবইয়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও ঐতিহাসিক বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন এসেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ের সমালোচনামূলক চিন্তাবিষয়ক বইগুলোতে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও উন্মুক্ত সংলাপকে মানুষের মৌলিক প্রয়োজন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

সৌদি আরবের ইসলাম শিক্ষা বিষয়ক বইয়েও শান্তি ও সহাবস্থানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেখানে ইহুদি, খ্রিস্টান ও আরব গোত্রগুলোর সঙ্গে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর বিভিন্ন শান্তিচুক্তি ও সমঝোতার ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তকে সংঘাত নিরসন ও সামাজিক সংহতির মডেল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

শিয়া মুসলিম ও সুফিদের সম্পর্কে আগের কিছু নেতিবাচক বক্তব্যও সরিয়ে দেওয়া বা নমনীয় করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আইএমপ্যাক্ট-এস। একইভাবে ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসের কিছু বর্ণনায় ইহুদিদের সামগ্রিকভাবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে উপস্থাপনের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট গোত্রের কর্মকাণ্ডের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া ইহুদি ও খ্রিস্টানদের সঙ্গে বন্ধুত্ব নিষিদ্ধ করে তাদের ‘আল্লাহর শত্রু’ হিসেবে উল্লেখ করা আগের কিছু পাঠও বাদ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। নাগরিক ও আইনবিষয়ক বইয়ে জাতিগত বৈষম্য এবং বিদেশি নাগরিকদের প্রতি বৈষম্য নিয়ে সমসাময়িক উদাহরণও যুক্ত করা হয়েছে।

জিহাদ ও সশস্ত্র সংঘাতের উপস্থাপনাতেও পরিবর্তন এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে সহিংসতার প্রশংসার পরিবর্তে শান্তি ও বেসামরিক মানুষের সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নবম শ্রেণির ইসলাম শিক্ষা বইয়ে অযোদ্ধাদের ক্ষতি করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। দ্বাদশ শ্রেণির অলংকারশাস্ত্র বিষয়ক একটি বই থেকে যুদ্ধে শহীদ হওয়ার প্রশংসামূলক একটি অংশও বাদ দেওয়া হয়েছে।

তবে দশম শ্রেণির ইসলাম শিক্ষা বইয়ে জিহাদকে রাজার আনুগত্যের সঙ্গে যুক্ত করে একটি বক্তব্য আবার যুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আইএমপ্যাক্ট-এস। প্রতিষ্ঠানটির মতে, এটি আগের সংস্কারের ক্ষেত্রে আংশিক পশ্চাদপসরণ।

অন্যদিকে পাঠ্যবইগুলোতে আইএস, আল-কায়েদা, হিজবুল্লাহ, হুতিদের পাশাপাশি মুসলিম ব্রাদারহুডকেও সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদের সঙ্গে যুক্ত সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে সংস্কারের পাশাপাশি কিছু ঘাটতিও রয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে উচ্চমাধ্যমিকের ইতিহাস বইয়ে ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সালের যুদ্ধের বিভিন্ন সামরিক ঘটনা, জার্মানির রাশিয়া আক্রমণ এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জাপানের অভিযানসহ যুদ্ধকালীন নেতাদের আলোচনা থাকলেও হলোকাস্ট বা ইউরোপীয় ইহুদিদের পরিকল্পিতভাবে হত্যার কোনো উল্লেখ নেই বলে জানিয়েছে আইএমপ্যাক্ট-এস।

ইসরায়েল প্রসঙ্গেও পাঠ্যবইয়ে ধীরে ধীরে ভাষা পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। পঞ্চম শ্রেণির সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের আগের সংস্করণে ইসরায়েলের বর্তমান ভূখণ্ডকে ‘ফিলিস্তিন’ হিসেবে দেখানো হয়েছিল। নতুন সংস্করণে সৌদি আরবের সঙ্গে সীমান্ত নেই এমন অন্যান্য দেশের নামের মতো ‘ফিলিস্তিন’ নামটিও ওই মানচিত্র থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে সরকারি মানচিত্রে ইসরায়েলের নাম এখনও নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ‘মুসলমানরা জেরুজালেম ছেড়ে দেবে না’ এমন বক্তব্যও নতুন সংস্করণ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ‘জায়নিস্ট শত্রু’ বা ‘ইসরায়েলি শত্রু’ ধরনের শব্দের পরিবর্তে ‘ইসরায়েলি দখলদারত্ব’-এর মতো তুলনামূলক নিরপেক্ষ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

আঞ্চলিক রাজনীতির ক্ষেত্রে ইরান সম্পর্কে পাঠ্যবইগুলোর সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্য এখনও রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব বইয়ে পারস্য উপসাগরকে ‘আরব উপসাগর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং বিপ্লবী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনগুলোকে অস্থিতিশীলতার উৎস হিসেবে তুলে ধরা হয়।

‘ভিশন ২০৩০’-এর লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাঠ্যবইয়ে নারীকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতাও বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এর অংশ হিসেবে ঘরের কাজ শুধু নারীর দায়িত্ব-এমন প্রচলিত ধারণা বাদ দেওয়া হয়েছে। দাম্পত্য জীবনে স্ত্রীর আনুগত্য সম্পর্কিত ঐতিহ্যগত কিছু বক্তব্যও পাঠ্যবই থেকে সরানো হয়েছে।

আইএমপ্যাক্ট-এসের প্রধান নির্বাহী মার্কাস শেফ এই পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, ধারাবাহিক সংস্কার একটি আশাব্যঞ্জক অগ্রগতির পথ তৈরি করেছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপস্থাপন এবং শান্তি ও সহনশীলতার বার্তার ক্ষেত্রে সৌদি পাঠ্যক্রম আগের তুলনায় ইতিবাচক হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

আইএমপ্যাক্ট-এসের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, সৌদি আরবের শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে ঐতিহ্যগত ধর্মীয় কাঠামো এবং আধুনিক সংস্কারের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করছে। তবে আন্তর্জাতিক সহনশীলতার মানদণ্ডের সঙ্গে আরও সামঞ্জস্য আনার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ইহুদিবিদ্বেষী ও উগ্রবাদী বক্তব্য সরিয়ে নেওয়ার ধারাবাহিকতাকে সৌদি শিক্ষাব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছে প্রতিষ্ঠানটি।

সূত্র: দ্য জেরুজালেম পোস্ট ও আইএমপ্যাক্ট-এস