আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৭ আগস্ট ২০২৬, ০৫:২০ পিএম
‘আপনার কি বয়ফ্রেন্ড চাই... আমরা ভাড়া দেব। পারিশ্রমিক নির্ভর করবে কাজ এবং সময়ের ওপর’, ‘আপনি কি একাকীত্বে ভুগছেন? আপনি কি কোনো সুদর্শন ছেলের সঙ্গে কফি খেতে বা সিনেমা দেখতে যেতে চান? তাও আবার ৫০ শতাংশ ছাড়ে?’— এমন কিছু বিজ্ঞাপন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের দক্ষিনী রাজ্য তেলেঙ্গানার রাজধানী হায়দরাবাদে। তবে পুলিশের দাবি এই বিজ্ঞাপনগুলোর নেপথ্যে নারীদের সঙ্গে প্রতারণা করার নানা কৌশল লুকিয়ে রয়েছে।
হায়দরাবাদ পুলিশ কমিশনার ভিসি সজ্জনার সতর্কবার্তা দেন, ‘এটি সাইবার অপরাধীদের পাতা একটি নতুন ডেটিং ফাঁদ, যা বিশেষ করে তরুণীদের উদ্দেশ্য করে তৈরি করা হয়েছে।’
পুলিশ কমিশনার ভিসি সজ্জনার জানিয়েছেন, তারা খেয়াল করে দেখেছেন সামাজিক মাধ্যমে ঘন ঘন এই ধরনের পোস্টার দেওয়া হচ্ছে।
তিনি তার এক্স অ্যাকাউন্টে এই ধরনের কয়েকটি বিজ্ঞাপনের বিবরণ পোস্ট করেছেন। এই বিজ্ঞাপনগুলো দেখলে দুটি প্রধান বিষয় লক্ষ্য করা যায়। প্রথমত, সময়, অর্থাৎ কতক্ষণের জন্য ভাড়া পাওয়া যাবে। দ্বিতীয়ত, ভাড়ার মূল্য।
পুলিশ জানিয়েছে, বিজ্ঞাপনগুলিতে প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা মূল্যের উল্লেখ করা হচ্ছে। যেমন, এক ঘণ্টা কফি খাওয়া ও আড্ডার জন্য ৪৯৯ রুপি, সিনেমা দেখার জন্য ১,২৪৯ রুপি, কেনাকাটায় সঙ্গী হিসেবে ১,৪৯৯ রুপি এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা বিয়েতে সঙ্গী হিসেবে ১,৯৯৯ রুপি নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, ‘এগুলো ছাড়াও, তারা ১০ ঘণ্টার একটি পুরো দিনের প্যাকেজের জন্য ৪,৪৯৯ রুপির একটি রেট কার্ড ঘোষণা করেছে।’
বিজ্ঞাপনগুলিতে সরাসরি বার্তা পাঠানোর জন্য বলা হচ্ছে এবং বলা হচ্ছে যে ‘ভাড়ার বয়ফ্রেন্ড’ পাঠানোর সময়ে নারীর বিবরণ গোপন রাখা হবে।
সজ্জনার জানিয়েছেন তাদের তদন্তে জানা গেছে, বিজ্ঞাপনে দেখানো ছেলেদের ছবিগুলির সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই। বিজ্ঞাপনে দেখানো ছবিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।
প্রতারণার ধরন ব্যাখ্যা করে জানান পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘নারীদের বিবরণ পাঠানোর পর তাদের সঙ্গে কথা বলে তাদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়। বুকিং নিশ্চিত হলে অগ্রিমের নামে ওয়ালেট ট্রান্সফার ও কিউআর কোডের মাধ্যমে রুপি সংগ্রহ করা হয়। তারপর তারা অ্যাকাউন্টগুলো ব্লক করে উধাও হয়ে যায়।’
সাইবার অপরাধ সম্পর্কে পুলিশ ও সরকার জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা সত্ত্বেও নতুন নতুন বিষয় সামনে আসছে। কল সেন্টার, ট্রেডিং, ডিজিটাল গ্রেফতার, ডেটিং অ্যাপ ইত্যাদি নানা পদ্ধতিতে সাইবার অপরাধ ক্রমশ বাড়ছে। এর মধ্যেই হায়দরাবাদ পুলিশ ‘রেন্ট বয়ফ্রেন্ড’ নামে সাইবার অপরাধের আরও একটি নতুন কেলেঙ্কারি শনাক্ত করেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, এখনও পর্যন্ত ভুক্তভোগীরা কেউই সরাসরি পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাতে এগিয়ে আসেননি।
তবে কমিশনার সজ্জনার মতে, এই নতুন ধরনের প্রতারণার বিষয়ে যদি আগে থেকেই সতর্ক না হওয়া যায় তাহলে ভবিষ্যতে এই ধরনের প্রতারণা বেড়ে যাওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘পুলিশ যখন সামাজিক মাধ্যম থেকে এই ধরনের প্রতারণার বিষয়ে জানতে পারে তখন এটা বোঝা যায় যে এটা একেবারেই নতুন ধরনের ফাঁদ। সম্প্রতি শুরু হয়েছে। কারা এটি পরিচালনা করছে, এর পেছনে কারা আছে, আমরা তা তদন্ত করে দেখছি। মনে হচ্ছে, এটি অন্য কোনও রাজ্য থেকে পরিচালিত হচ্ছে।’
তিনি আরও জানান, হায়দরাবাদ সাইবার ক্রাইম শাখা এই প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপনের বিষয়টির দিকে বিশেষ ভাবে নজর দিচ্ছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবে।
পুলিশ সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে জানিয়েছে, তারা যদি বিজ্ঞাপন এবং অনলাইনে বলা কথা বিশ্বাস করে সরাসরি এই প্রতারকদের সঙ্গে দেখা করতে যান তাহলে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি এবং পরিচিতি তৈরি করে ভালোবাসার নামে প্রতারিত হতে পারেন।
কমিশনার সজ্জনার সতর্ক করে বলেন, ‘অসৎ উদ্দেশ্যে ফোন নম্বর এবং ব্যক্তিগত ছবি অশ্লীল ভাবে ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেলের ঝুঁকিও এ ক্ষেত্রে রয়েছে।’
তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, যদি কেউ এই ধরনের সাইবার অপরাধের শিকার হন বা সন্দেহজনক পোস্ট দেখেন, তাহলে যেন তারা অবিলম্বে পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন।
ভারতে প্রতি বছর সাইবার অপরাধ বাড়ছে। ২০২৪ সালের দেশটির জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশে ৬৫ হাজার ৮৯৩টি সাইবার অপরাধ নথিভুক্ত হয়েছিল, যেখানে ২০২৩ সালে নথিভুক্ত হয়েছিল ৮৬ হাজার ৪২০টি সাইবার অপরাধ।
২০২৪ সালে ১ লাখ ১ হাজার ৯২৮টি সাইবার অপরাধ নথিভুক্ত করা হয়েছিল, এর মধ্যে ১৮ হাজার ৬১৫টি ঘটনা নারীদের সঙ্গে ঘটেছে।
সাইবার ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মোট ৬০১টি মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছিল, যার মধ্যে ৩৭০টি মামলা নারীদের সঙ্গে জড়িত।
কাউন্সেলিং মনোবিদ অনিতা আরের পরামর্শ, সন্তানরা বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছালে অভিভাবকদের উচিত সন্তানের প্রতি নিজেদের ব্যবহারে কিছুটা প্রয়োজনীয় বদল আনা।
তিনি বলেন, ‘বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছালে কিশোরীরা এই ধরনের বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে। এছাড়াও, তাদের এই বয়সে নতুন সম্পর্কের প্রয়োজন মনে করে সমবয়সী ছেলেদের দেখলে তাদের প্রতি বিজ্ঞাপন দ্বারা আকৃষ্ট হতে পারে। বাড়িতে তাদের নেতিবাচক কথা বললে হবে না, তাদের বুঝিয়ে বলা প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘বাইরের লোকজন কোনও রকম সমালোচনা ছাড়াই তাদের নানান রকম মিষ্টি ভাষণে ভুল বোঝানোর চেষ্টা করবে, সে বিষয়ে সতর্ক হতে হবে।’— বিবিসি বাংলা
এমএইচআর