আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০৬ পিএম
১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকারকে দেওয়া ৩৫ হাজার টাকা ভারতের মধ্যপ্রদেশের এক ব্যবসায়ী। সেই টাকা এখনো পরিশোধ করা হয়নি দাবি করে দীর্ঘ ১০৯ বছর পর যুক্তরাজ্যের সরকারের কাছে সেই অর্থ সুদসহ ফেরত চেয়েছে ওই ব্যবসায়ীর পরিবার।
ওই পরিবারটি দাবি করেছে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ব্রিটিশ বাহিনীর ভারতীয় সৈন্যদের ভরণপোষণের জন্য তৎকালীন সরকার তহবিল সংগ্রহ করছিল। এসময় মধ্যপ্রদেশের সেহোরের তৎকালীন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জুম্মালাল রুঠিয়া ভোপাল এজেন্সির এক ব্রিটিশ কর্মকর্তার মাধ্যমে সরকারকে ৩৫ হাজার টাকা ঋণ দেন।
এক্ষেত্রে ১৯১৭ সালের ৪ জুন দেওয়া একটি প্রশংসাপত্র বা সনদকে এই আর্থিক লেনদেনের মূল প্রমাণ হিসেবে দাবি করছে রুঠিয়া পরিবার।
এদিকে এই দাবির পরে যুক্তরাজ্যের ডেট ম্যানেজমেন্ট দফতর বা ডিএমও পরিবারটির কাছ থেকে এই বিষয় সংশ্লিষ্ট নথিপত্র চেয়ে পাঠিয়েছে।
জুম্মালাল রুঠিয়ার প্রপৌত্র গৌতম রুঠিয়া জানিয়েছেন, ব্রিটিশ কর্মকর্তারা এই ঘটনটির আরও বিস্তারিত মূল্যায়ণ করবেন বলে সে দেশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হয়েছেন। এছাড়াও পরিবারটির থেকে আরও কিছু তথ্য চেয়ে যোগাযোগ করা হয়েছে।
গৌতম রুঠিয়া বলেন, ‘আমরা ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে একটি ইমেইল পেয়েছি, যেখানে বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য কিছু তথ্য চাওয়া হয়েছে। তারা আরও বলেছে যে বিষয়টি তদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। যাচাইয়ের জন্য তাদের যা যা তথ্য প্রয়োজন, আমরা তা পাঠিয়ে দিচ্ছি।’
তবে, ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ এখনো নিশ্চিত করেনি যে তারা পরিবারটির দাবি গ্রহণ করবে কি না। নথিপত্রের এই অনুরোধটি বর্তমানে দাবি যাচাই প্রক্রিয়ার একটি অংশ।
জুম্মালালের নাতি এবং গৌতমের বাবা বিনয় রুঠিয়া বলেন, ব্রিটিশ সরকারের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় পরিবারটি খুবই উচ্ছ্বসিত।
তিনি বলেন, ‘কয়েক মাসের মধ্যে এই প্রথম আমরা যুক্তরাজ্যের সরকারের কাছ থেকে সাড়া পেয়েছি। আমাদের আশা জেগেছে। এই বিষয়টি টাকার ঊর্ধ্বে। আমাদের কাছে এটি আমাদের পৈতৃক ঐতিহ্যের বিষয়।’
পরিবারটি এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে এই নথিটির বিষয়ে জানতে পারে বলে জানিয়েছেন বিনয় রুঠিয়া।
তিনি বলেন, ‘এই বছরের শুরুতে, আমরা অন্য একটি মামলার জন্য পুরোনো নথি ঘাঁটতে গিয়ে ব্রিটিশ সরকারকে দেওয়া একটি ঋণ সংক্রান্ত এই নথিটি খুঁজে পাই। এরপর আমরা একজন আইনজীবীর মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করি।’
রুঠিয়া পরিবারের ভাষ্যমতে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জুম্মালাল রুঠিয়া এই টাকা ব্রিটিশ সরকারকে দিয়েছিলেন।
বিনয় রুঠিয়া বলেন, ‘প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ভারতীয় সৈন্যরাও ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। তখন ব্রিটিশ সরকার সৈন্যদের ভরণপোষণের জন্য তহবিল সংগ্রহ করছিল। এই সূত্রে আমার দাদু, জুম্মালাল, যুদ্ধে যাওয়া ভারতীয় সৈন্যদের খরচের জন্য এই অর্থ ব্রিটিশ সরকারকে দিয়েছিলেন।’
পারিবারিক নথিপত্রে ঋণ গ্রহণের তারিখ হিসেবে চৌঠা জুন, ১৯১৭ উল্লেখ আছে।
জুম্মালালের পরিবার এটিকে যুদ্ধকালীন ঋণ বলে দাবি করেছে। অর্থাৎ, এই ঋণ সাধারণ ব্যাংক ঋণের মতো নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে শোধ করতে হয়।
গৌতম রুঠিয়া বলেন, ‘যদি এটি একটি ব্যাংকিং নথি হতো, তাহলে পরিশোধের জন্য পাঁচ বছর বা দশ বছরের মতো একটি সময়সীমা উল্লেখ করা থাকত। কিন্তু এটি ছিল একটি যুদ্ধকালীন ঋণ, অর্থাৎ যুদ্ধের জন্য দেওয়া ঋণ। যুদ্ধ কতদিন চলবে বা কখন শেষ হবে, তা নিশ্চিত ছিল না।’
ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ এখন রুঠিয়া পরিবারের পারিবারিক নথিপত্র, বংশতালিকা, পুরোনো সনদপত্র, ঋণের পরিমাণ এবং সেই সময়ের ফর্ম সম্পর্কে তথ্য চেয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবারটি।
গৌতম রুঠিয়ার মতে, কর্তৃপক্ষ যাচাই করে দেখতে চায় যে, ১৯১৭ সালে যে পরিবার টাকা দিয়েছিল এবং যে পরিবার এখন তা দাবি করছে, তারা একই পরিবার কি না।
রুঠিয়া পরিবার ১৯১৭ সালে দেওয়া ৩৫ হাজার টাকার বর্তমান মূল্যও হিসাব করছে।
গৌতম রুঠিয়ার মতে, পরিবারটি তাদের আর্থিক দাবিতে সুদ, আসল, চক্রবৃদ্ধি সুদ এবং অন্যান্য খরচ অন্তর্ভুক্ত করবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা সব টাকাটাই দাবি করব। ৩৫ হাজার হলো আমাদের দেওয়া ঋণের আসল, তার সঙ্গে যোগ হবে সুদ, চক্রবৃদ্ধি সুদ এবং উদ্ভূত যেকোনো খরচ। এই সবকিছু হিসাব করার পর, আমরা আজকের বাজারে টাকার অর্থমূল্যের সঙ্গে তুলনা করব।’
অর্থাৎ বর্তমান মুদ্রাস্ফীতিজনিত আর্থিক হিসাবও এই দাবিকৃত টাকার অঙ্কে যোগ হতে চলেছে। এই হিসাবটা এখনো হওয়া বাকি, তাই ১০৯ বছর পর এই কথিত ঋণের বিনিময়ে তারা কত টাকা দাবি করবে, পরিবারটি এখনো তা স্থির করেনি।
তবে ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ সরকারকে দেওয়া ৩৫ হাজার টাকার বর্তমান মূল্য কত হতে পারে, তা নিয়ে অর্থ ও আইনি বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে হিসাব কষেছেন। দীর্ঘ ১০৯ বছরে মুদ্রাস্ফীতি, সুদ ও সোনার দামের পরিবর্তনের কারণে এই অর্থের বর্তমান মূল্য কয়েকটি স্তরে হিসাব করা হয়েছে— এরমধ্যে চক্রবৃদ্ধি সুদের ভিত্তিতে ওই সময়ে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া যুদ্ধ বন্ডের গড় বার্ষিক সুদ ছিল আনুমানিক ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
এই হারে গত ১০৯ বছরের বার্ষিক চক্রবৃদ্ধি সুদ হিসাব করলে ওই ৩৫ হাজার টাকার বর্তমান মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ রুপি। তবে ভারতের অর্থনৈতিক ও মুদ্রাস্ফীতির অন্যান্য ঐতিহাসিক সূচক বিবেচনায় নিয়ে ব্যবসায়ী পরিবারটির আইনজীবী এবং কিছু বিশ্লেষকের মতে এর তাত্ত্বিক মূল্য প্রায় ১ কোটি ৮৫ লাখ রুপি ছুঁয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে স্বর্ণের মূল্যের ভিত্তিতে— ১৯১৭ সালে ১ ভরি বা ১ তোলা সোনার দাম ছিল মাত্র ২০ থেকে ২৫ টাকার কাছাকাছি।
রুঠিয়া পরিবারের হিসাব অনুযায়ী, ১৯১৭ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সোনার দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ৩ হাজার গুণেরও বেশি। যদি তৎকালীন ৩৫ হাজার রুপিকে সমপরিমাণ সোনার মূল্যে রূপান্তর করে বর্তমান বাজারের সাথে তুলনা করা হয়, তবে এর মূল্য দাঁড়ায় ১০ কোটি রুপিরও বেশি।
সূত্র: বিবিসি বাংলা, টাইমস অব ইন্ডিয়া
এমএইচআর