আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৬:০০ পিএম
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শণাক্ত করেছে মিয়ানমারের জান্তা-সমর্থিত সরকার। রাখাইন অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হলে এই যাচাইকৃত রোহিঙ্গাদের ধাপে ধাপে ফেরত নেওয়া হবে জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
শনিবার রোহিঙ্গা সংকটের ৯ম বছর শুরু হওয়ার প্রেক্ষাপটে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিকে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পাঠানো মোট ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন শরণার্থীর তালিকা থেকে মিয়ানমার ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের নিবন্ধিত বা সাবেক বাসিন্দা হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে।
তবে তালিকায় থাকা ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের পরিচয় মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ যাচাই করতে পারেনি। এছাড়া ৪ হাজার ২৪১ জনের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে’ জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে তাদের ফেরত নিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছে নেপিদো।
বিবৃতিতে মিয়ানমার জান্তা সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, রাখাইনে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের প্রত্যাবাসন বা সশরীরে ফিরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম শুরু হবে না।
এছাড়াও মন্ত্রণালয় রাখাইন থেকে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার দাবিও প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বলেছে, ২০১৭ সালের সহিংসতার পর ৫ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং ২ লাখেরও বেশি মানুষ উত্তর রাখাইনে থেকে গেছে।
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর তীব্র সহিংসতা ও নিপীড়নের মুখে প্রায় ৭ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা জীবন বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। পূর্বে আসা রোহিঙ্গাসহ বর্তমানে বাংলাদেশের কক্সবাজার ও ভাসানচরের শরণার্থী শিবিরগুলোতে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে, যার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি শিশু।
২০১৮ সালে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ দুই বছর মেয়াদী প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় সম্মত হয়েছিল। তবে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে জান্তা সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যের সিংহভাগ অঞ্চল এখন বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এই তীব্র লড়াইয়ের কারণে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি চরম অস্থিতিশীল, যার ফলে নিরাপদ প্রত্যাবাসন সম্পূর্ণ থমকে গেছে।
এর মধ্যেই ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত রাখাইনের চলমান সহিংসতার কারণে নতুন করে আরও হাজার হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, যা বিদ্যমান ক্যাম্পগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে।
অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে অন্যান্য নতুন নতুন ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার পরিমাণ ক্রমান্বয়ে কমছে। তহবিল সংকটের কারণে শরণার্থীদের জন্য খাদ্য সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ঘিঞ্জি ও জরাজীর্ণ ক্যাম্পগুলোতে পুষ্টিহীনতা, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং বর্ষাকালে বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
এছাড়াও ক্যাম্পে কর্মসংস্থানের অভাব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক রোহিঙ্গা যুবক দালালদের খপ্পরে পড়ে বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর দিয়ে ছোট ছোট নৌকায় মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে এই ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় প্রতি বছর শত শত রোহিঙ্গা প্রাণ হারাচ্ছে।
এদিকে গত জুলাই মাসের মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বলেছিলেন, প্রত্যাবাসন কর্মসূচির অংশ হিসেবে বর্তমানে মালয়েশিয়ায় বসবাসরত ৫ হাজার ও বাংলাদেশ থেকে সাড়ে ৩ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সম্মত হয়েছে।
তবে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা হান উইন অং সে সময় মালয়েশিয় প্রধানমন্ত্রীর এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, প্রত্যাবাসন কর্মসূচিটি শুধুমাত্র মালয়েশিয়ার আটক কেন্দ্রগুলোতে বর্তমানে আটক থাকা যাচাইকৃত মিয়ানমার নাগরিকদের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ।
উল্লেখ্য, মিয়ানমারের এই ঘোষণাকে রোহিঙ্গা সংকটের ৯ম বছরে পদার্পণের মুখে একটি দ্বিপাক্ষিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হলেও, মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সূত্র: এপি
এমএইচআর