Dhaka Mail Logo

আন্তর্জাতিক

প্রচণ্ড তাপপ্রবাহে যুক্তরাজ্যে ৩০০০ জনের মৃত্যু

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

০৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:২৩ পিএম

চলতি বছরের ২৪ থেকে ২৭ মে পর্যন্ত চলা তাপপ্রবাহের কারণে আনুমানিক ৭৫৩ জনের এবং ২১ থেকে ২৮ জুনের মধ্যে ঘটা তাপপ্রবাহে আরও ২,১২৪ জনের মৃত্যুর কথা সরকারি ভাবে ঘোষণা করেছে ইংল্যান্ড। 

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে অগস্টে। গরমে কাহিল গোটা ইউরোপ। সেই আঁচে সর্বাঙ্গ পুড়ছে ইংল্যান্ডেরও। 

তাপপ্রবাহের বলি হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। পারদ ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁতেই সেই তাপ আর সহ্য করতে পারছেন না ইংরেজরা। 

ভয়ঙ্কর গরম মোকাবিলা করতে না পেরে প্রাণ হারিয়েছেন কয়েক হাজার নাগরিক। উষ্ণতা বৃদ্ধির শঙ্কার মধ্যেই ইংল্যান্ডের মৃত্যুমিছিল নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বিশ্ব জুড়ে।

তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে মাত্র দু’মাসের মধ্যে প্রায় তিন হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। গত দু’মাসে তাপপ্রবাহ ও তাপজনিত কারণে ২,৮৭৭ জনের মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে ইংল্যান্ডে। 

এর আগে গরমের কারণে মৃত্যুর ঢল নেমেছিল ২০২২ সালে। সেই বছর মারা গিয়েছিলেন ২,৯৮৫ জন। চলতি বছরে এই সংখ্যা টপকে যাওয়ার আশঙ্কা যথেষ্টই।

hot

দেশটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা সংস্থা (ইউকেএইচএসএ) জানিয়েছে, ২০২৬ সালে তাপপ্রবাহে মৃত্যুর সংখ্যা এ যাবৎ সব রেকর্ডকে ছাপিয়ে যেতে পারে। ২৪ থেকে ২৭ মে পর্যন্ত চলা তাপপ্রবাহের কারণে আনুমানিক ৭৫৩ জনের এবং ২১ থেকে ২৮ জুনের মধ্যে ঘটা তাপপ্রবাহে আরও ২,১২৪ জনের মৃত্যুর কথা সরকারি ভাবে ঘোষণা করেছে ইংল্যান্ড।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে অগস্টে। বছরের অন্যতম উষ্ণ মাসটিতে আরও কয়েক জনের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে গরম। এ বছরের গ্রীষ্মের শুরুতেই চড়চড়িয়ে বেড়েছিল পারদ। গোটা ইংল্যান্ড জুড়েই একই অবস্থা, যা কয়েক বছর আগেও লক্ষ করা যায়নি বলে দাবি করছেন আবহবিদেরা। 

আগামী দিনে এর থেকে পরিত্রাণ নেই বলেও জানিয়ে দিয়েছেন তারা। তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা।

ক্রমাগত বাড়তে থাকা তাপমাত্রার কারণে সে দেশের স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যবস্থার উপর অতিরিক্ত চাপ পড়েছে। একই সময়ে, দেশ জুড়ে বেড়ে যাওয়া দাবানল ও তাপপ্রবাহজনিত অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় দমকলকর্মীদেরও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। 

চরম এই পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করায় সতর্কতা জারি করেছে সে দেশের আবহাওয়া দফতর। কড়া রোদ ও কষ্টকর আর্দ্রতায় জেরবার হচ্ছেন মানুষ। 

১৭৬৭ সাল থেকে ব্রিটেনে জলবায়ুর রেকর্ড সংরক্ষিত রয়েছে। তা বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, গত ২০ বছরে আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা সব মাত্রা ছাড়িয়েছে। বদলে গিয়েছে বৃষ্টিপাতের ধরনও। দেশের অর্ধেকের বেশি অঞ্চল তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে বিপর্যস্ত।

উষ্ণায়নের ফলে পৃথিবীব্যাপী সমুদ্রে পানিস্তর বেড়েছে। সেই বৃদ্ধির যে গড়, তার থেকে ব্রিটেনের চারপাশে সমুদ্রের পানিস্তর বেড়েছে অনেক বেশি। ফলে উপকূলবর্তী এলাকায় বন্যা হচ্ছে ব্যাপক হারে। 

hit

বৃষ্টিপাতের সময় পিছিয়ে গিয়েছে বেশ খানিকটা। বর্ষাকাল বাদ দিয়ে বৃষ্টির বেশির ভাগটাই হচ্ছে অক্টোবর থেকে মার্চ মাসের মধ্যে। গত কয়েক দশকে রোদের ঝাঁঝ বেড়েছে ৮ শতাংশ।

এই তাপপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বয়স্ক নাগরিকেরা। অসুস্থ এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিরা যুঝতে পারছেন না গরমের সঙ্গে। 

ইংল্যান্ডের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত গরমে থাকলে হৃদ্‌রোগ, ফুসফুসের রোগ-সহ বিভিন্ন আগে থেকে থাকা স্বাস্থ্য সমস্যা আরও গুরুতর হয়ে উঠছে। আর তাতেই প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ছে।

এই তাপপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বয়স্ক নাগরিকেরা। অসুস্থ এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিরা যুঝতে পারছেন না গরমের সঙ্গে।

ইংল্যান্ডের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত গরমে থাকলে হৃদ্‌রোগ, ফুসফুসের রোগ-সহ বিভিন্ন আগে থেকে থাকা স্বাস্থ্য সমস্যা আরও গুরুতর হয়ে উঠছে। আর তাতেই প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ছে।

এরই মাঝে বড় আশঙ্কার কথা শোনা গিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেড্রস অ্যাডানম গেব্রিয়েসাসের মুখে। তিনি জানিয়েছেন, পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণায়নশীল মহাদেশে পরিণত হয়েছে ইউরোপ। 

বিশ্ব জুড়ে গড়ে যে হারে তাপমাত্রা বাড়ছে, সেটা এখানে দ্বিগুণ। ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় ইংল্যান্ডে তাপমাত্রা কিছুটা হলেও মন্দের ভাল। অন্যান্য দেশে যেখানে পারদ ৪২-৪৫ ডিগ্রি ছুঁয়েছে সেখানে ইংল্যান্ডে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৫-৩৮ ডিগ্রির আশপাশে ছিল।

মে ও জুন, এই দু’মাসেই ইংল্যান্ডে সর্বোচ্চ মাসিক তাপমাত্রা নতুন রেকর্ড ছুঁয়েছে। ২৬ মে তাপমাত্রা ছিল ৩১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ২৬ জুন তা বেড়ে ৩৭.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়। 

জুনের তাপপ্রবাহ টানা আট দিন স্থায়ী হয়েছিল। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে ওঠে যে তাপজনিত কারণে ঘটা স্বাস্থ্যঝুঁকির জন্য সর্বোচ্চ স্তরে সতর্কতা জারি করা হয়। ইংল্যান্ডের স্বাস্থ্য পরিষেবা সংস্থা জানিয়েছে, ইংল্যান্ডে এই নিয়ে দ্বিতীয় বার এমন সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করতে হয়েছে।

গত বছরও প্রায় একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল ইংল্যান্ডে। বন্যা ও তাপপ্রবাহের জোড়া ফলায় ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসে জুনের শেষে ছ’শো জনের বেশি মারা যান। তীব্র তাপপ্রবাহ চলছিল দেশে। 

তার পরে পর পর আরও দু’টি তাপপ্রবাহের কবলে পড়ে মধ্য ইংল্যান্ড। জলবায়ু বিশারদেরা বার বার সতর্ক করছেন, এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না করলে উত্তরোত্তর খারাপ হবে পরিস্থিতি। বাড়বে মৃত্যু।

যেখানে ভারতের মতো দেশে ৪৮ ডিগ্রি তাপমাত্রা থাকে গ্রীষ্মকালে, সেখানে ৩৫ ডিগ্রি তাপমাত্রাতেই কী ভাবে এত মৃত্যু ঘটছে ইংরেজদের? এর উত্তর লুকিয়ে আছে সে দেশের জীবনযাত্রা ও ঘরবাড়ির নকশায়। 

বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গরম বা ঠান্ডার অনুভূতি আলাদা আলাদা হতে পারে।

বছরের বেশির ভাগ সময় ঠান্ডা আবহাওয়ার কারণে ইউরোপের প্রায় কোনও বাড়িতেই নেই পাখা, এসি বা কুলারের মতো যন্ত্র। ইংল্যান্ডও তার ব্যতিক্রম নয়। 

ফলে সে দেশে গরম মোকাবিলা করার মতো পর্যাপ্ত উপকরণ নেই। শীত আটকাতে বাড়ি ঘরের জানলা-দরজাও সঙ্কীর্ণ। তাই বায়ু চলাচলের মতো উপযুক্ত ব্যবস্থা নেই দেশটিতে। তাপপ্রবাহ শুরু হওয়ায় হাঁসফাঁস দশা হয় ইংরেজদের।

দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য পরিষেবা দফতর বা ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) সচিব ইভেট কুপার বলেছেন, ‘‘এত দিন আমরা শীতকালে বাড়তি চাপ নিয়ে কাজ করেছি। দুর্বল মানুষদের সুরক্ষার বিষয়টির দিকে বেশি নজর দিয়েছি। কিন্তু এখন গ্রীষ্মও হাজার হাজার মানুষের স্বাস্থ্যের উপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে। ফলে এনএইচএস-এর উপর ক্রমে চাপ বাড়ছে।’’

তা ছাড়া বছরের বেশির ভাগ সময় তীব্র ঠান্ডা থাকার কারণে সে দেশের বাসিন্দাদের শারীরিক গঠন গরম সহ্য করার মতো নয়। 

এশীয় অঞ্চলের মানুষ অতিরিক্ত তাপমাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছেন। গরম বাড়লে সেইমতো পোশাক বা খাওয়াদাওয়া করে থাকেন তারা। অন্য দিকে তাপপ্রবাহ মোকাবিলার উপায় জানা না থাকার কারণে বিপাকে পড়ছে ইংল্যান্ড।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, জুনে পশ্চিম ইউরোপের বেশির ভাগ এলাকায় রেকর্ড তাপপ্রবাহ দেখা দিয়েছে। একই সময়ে পশ্চিম ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিক উপকূলেও সমুদ্রের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে গিয়েছে। 

সংস্থাটি জানিয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ২০২৬ সালের জুন মাসটি পশ্চিম ইউরোপের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ জুন এবং বিশ্বে দ্বিতীয় উষ্ণতম জুন হিসাবে রেকর্ড করা হয়েছে।

গরমের পাশাপাশি একটি রোগ নিয়েও উদ্বেগ ছড়িয়েছে ইংল্যান্ডে। বিশেষ করে ভ্রমণকারীদের উদ্দেশে সাইক্লোস্পোরিয়াসিস নামে একটি সংক্রামক রোগ নিয়ে সতর্কতা জারি করেছে স্বাস্থ্য দফতর।

হঠাৎ করে বাড়তে থাকা সংক্রমণ সম্পর্কে সতর্ক করেছে তারা। এই রোগে তীব্র ডায়েরিয়া হতে পারে। বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল থেকে এখনও পর্যন্ত ৬৭টি সংক্রমণের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগই মেক্সিকো ভ্রমণ করে ফেরার পর এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।


-এমএমএস