Dhaka Mail Logo

আন্তর্জাতিক

জেন জি আন্দোলনের পর প্রথম ভোটে বিজেপির ভরাডুবি, কিসের ইঙ্গিত?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

০৩ আগস্ট ২০২৬, ১০:১৮ পিএম

ভারতে সাম্প্রতিক জেন-জি তথা তরুণ প্রজন্মের ‘ককরোচ আন্দোলন’ যে কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা রাজপথের বিক্ষোভের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, তার প্রমাণ মিলল ব্যালট বাক্সে। আজ সোমবার (৩ আগস্ট) অনুষ্ঠিত দেশটির তিন রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা উপনির্বাচনে বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিহার, মধ্যপ্রদেশ ও গুজরাটের তিনটি আসনে অনুষ্ঠিত এই উপনির্বাচনকে দেখা হচ্ছিল দেশের যুবসমাজের সাম্প্রতিক ক্ষোভের একটি লিটমাস টেস্ট হিসেবে। তবে ফলাফলে পরিষ্কার দেখা যায়, নরেন্দ্র মোদি সরকারের প্রতি তরুণ প্রজন্মের চরম অসন্তোষ বিজেপিকে বড় ধরনের ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে।

ভারতের নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, আজ ভোট হয়েছিল বিহারের বাঁকিপুর, মধ্যপ্রদেশের দাতিয়া, এবং গুজরাটের মঞ্জলপুর। ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, বিজেপি কেবল গুজরাটের ঐতিহ্যবাহী মঞ্জলপুর আসনটি ধরে রাখতে পেরেছে। তবে মধ্যপ্রদেশ এবং বিহারে ধরাশায়ী হয়েছে মোদির দল।

নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অনুযায়ী, বিহারে বিজেপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত বাঁকিপুর আসনের উপনির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয় পেলেন ভোট কৌশলী থেকে রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা প্রশান্ত কিশোর।

ভোট গণনায় দেখা যায়, জন সুরাজ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্ত কিশোর পেয়েছেন ৬৪ হাজার ১৫১। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির নীরজ কুমার সিনহা পেয়েছেন ৪৪ হাজার ৮২৭ ভোট। অর্থাৎ ১৯ হাজার ৩২৪ ভোটে জয় পেয়েছেন প্রশান্ত। এ ছাড়াও ১৪ হাজার ২৭৩ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন আরজেডির রেখা কুমারী।

এদিকে মধ্যপ্রদেশের দাতিয়া আসনে কংগ্রেস প্রার্থী ঘনশ্যাম সিং বিজেপির আশুতোষ তিওয়ারিকে প্রায় সাড়ে সাত হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে আসনটি পুনরুদ্ধার করেছেন। 

কংগ্রেস বিধায়ক রাজেন্দ্র ভারতী জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের বিধান অনুযায়ী ২ এপ্রিল অযোগ্য ঘোষিত হওয়ায় আসনটি খালি হয়েছিল। উপনির্বাচনে প্রথমবার বিধানসভায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিজেপির আশুতোষ তিওয়ারি। আর দু’বারের সাবেক বিধায়ক এবং দাতিয়ার রাজপরিবারের সদস্য ঘনশ্যাম পুরোনো জনসংযোগ, ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি এবং বিজেপির অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের ওপর ভর করেই নির্বাচনে লড়েছেন।

তবে বিজেপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত গুজরাটের মঞ্জলপুর আসনে বিজেপির সতীশ প্যাটেল ৩০ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে কংগ্রেসের ভিখাভাই রাবারিকে হারিয়ে নিজেদের দুর্গ রক্ষা করেছেন। বিজেপি বিধায়ক যোগেশভাই নারানদাস প্যাটেলের মৃত্যুতে আসনটি খালি হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, গুজরাটের জয়টি বিজেপির জন্য স্বস্তির হলেও বিহার ও মধ্যপ্রদেশে ভরাডুবি এবং সামগ্রিকভাবে ভোট প্রদানের হার ব্যাপক হারে কমে যাওয়া শাসক দলের জন্য গভীর চিন্তার। কারণ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নিজের রাজ্য গুজরাটের মঞ্জলপুর কেন্দ্রে ২০২২ সালে বিজেপি ১ লাখের বেশি ভোটের ব্যবধানে জিতেছিল। তবে এবারের উপনির্বাচনে দলটির সেই জয়ের ব্যবধান নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, মঞ্জলপুরে ভোট পড়ার হার ৬০.১ শতাংশ থেকে কমে ৩৭.৫ শতাংশে এবং বাঁকিপুরে ৪১.৩ শতাংশ থেকে ৩৪.৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা তরুণ ও সাধারণ ভোটারদের একটি বড় অংশের রাজনৈতিক উদাসীনতা ও ক্ষোভকে নির্দেশ করে।

ককরোচ আন্দোলন ও জেন-জি শক্তির উত্থান

ভারতের জাতীয় পর্যায়ের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার (নিট) প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রতিবাদে গত জুন মাস থেকে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলন শুরু করে তরুণদের ব্যঙ্গাত্মক ও প্রতিবাদী রাজনৈতিক প্লাটফর্ম ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। গত ২০ জুলাই তাদের সংসদ ভবন অভিমুখে মিছিলে পুলিশ লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস এবং পেলেট গান ব্যবহার করলে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। এরপরই দেশজুড়ে ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভ শুরু হয়।

টানা বিক্ষোভ, পুলিশের লাঠিচার্জ এবং প্রবীণ সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের অনশনের চাপে পড়ে শেষ পর্যন্ত মোদি সরকার নতি স্বীকার এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়। তা সত্ত্বেও, সরকার আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে আইনি হয়রানি এবং সামাজিক মাধ্যমে নজরদারি চালু রাখায় তরুণদের ক্ষোভ কমেনি, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটল আজকের এই ভোটে।

এই ভরাডুবি কিসের ইঙ্গিত?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘ককরোচ আন্দোলন’ প্রমাণ করেছে যে আধুনিক জেন-জি প্রজন্ম কেবল সামাজিক মাধ্যমে মিম তৈরি করে না, বরং তারা চাইলে দেশের শক্তিশালী রাজনৈতিক দলকেও ভোটের মাঠে কোণঠাসা করতে পারে। শুধু তাই নয় এই উপনির্বাচনের ফলাফল ভারতের রাজনীতিতে কয়েকটি গভীর ও সুদূরপ্রসারী ইঙ্গিত বহন করছে।

আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভারতের তরুণ সমাজ মোদি সরকারের হিন্দুত্ববাদী বা জাতীয়তাবাদী আবেগের চেয়ে বাস্তবমুখী চাহিদা— যেমন কর্মসংস্থান, স্বচ্ছ পরীক্ষা ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রায় ৪০ শতাংশ স্নাতক পাস তরুণ ভারতে বেকার, যা এই ক্ষোভের প্রধান চালিকাশক্তি।

অন্যদিকে বিহারে প্রশান্ত কিশোরের জন সুরাজ পার্টির জয় প্রমাণ করে যে তরুণ সমাজ ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর বাইরে নতুন ও প্রযুক্তি-সচেতন বিকল্প নেতৃত্ব খুঁজছে।

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (সিএফআর)-এর বিশ্লেষক সদানন্দ ধুমের মতে, এই আন্দোলন ১৯৭১ বা ১৯৭৫ সালের জেপি আন্দোলনের (জয়প্রকাশ নারায়ণ) স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়, যেখানে ছাত্র সমাজ তৎকালীন ইন্দিরা গান্ধী সরকারকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। আজকের ফলাফল সেই ছাত্র শক্তিরই গণতান্ত্রিক প্রতিফলন। রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের আটক করা বা ইন্টারনেট সেন্সরশিপের মতো পদক্ষেপ তরুণদের আরও বেশি ক্ষুব্ধ করে তুলেছে, যা বিজেপির ভোট ব্যাংকে বড় ফাটল ধরিয়েছে।

প্রবীণ আইনজীবী ও বিরোধী নেতা কপিল সিব্বাল এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘সরকার শিক্ষার্থীদের বার্তা বুঝতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পরেও যেভাবে রাজপথে আন্দোলনকারীদের ওপর দমনপীড়ন চালানো হয়েছে, সাধারণ মানুষ ব্যালটের মাধ্যমে তার জবাব দিয়েছে।’

তার মতে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তরুণদের কাছে পৌঁছাতে প্রতিদিন ইনস্টাগ্রামে সেলফি ভিডিও এবং পোস্ট করলেও ডিজিটালভাবে সচেতন এই প্রজন্ম এখন কেবল সোশ্যাল মিডিয়ার আশ্বাসে সন্তুষ্ট নয়, তারা সরাসরি জবাবদিহিতা চাইছে।

এদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের মতো বিরোধী দলগুলো এই ফলাফলকে মোদি-শাহ জুটির ‘শেষের শুরু’ বলে আখ্যায়িত করেছে। এটি প্রমাণ করে যে মোদি সরকারের ‘অপরাজেয়’ ভাবমূর্তিতে বড় ধরনের চিড় ধরেছে।

অধিকাংশ বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে ভারতে ১৮ থেকে ৩২ বছর বয়সী ‘জেন-জি’ ভোটারের সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৩৮ কোটিতে। উপনির্বাচনের এই ট্রেন্ড ইঙ্গিত দেয় যে, এই বিশাল তরুণ ভোটারগোষ্ঠী যদি মোদি সরকারের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে ২০২৯ সালে বিজেপির ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

যদিও বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব গুজরাটের জয়কে হাইলাইট করে ড্যামেজ কন্ট্রোলের চেষ্টা করছে। দলটির রাজ্য নেতাদের দাবি, উপনির্বাচনের ফলাফল সবসময় জাতীয় রাজনীতির প্রতিফলন নয় এবং কম ভোটার উপস্থিতির কারণে বিহার ও মধ্যপ্রদেশে তাদের পরাজয় হয়েছে, যা তারা খতিয়ে দেখবেন। 

সূত্র: এনডিটিভি, আলজাজিরা, হিন্দুস্তান টাইমস 

এমএইচআর