আন্তর্জাতিক ডেস্ক
৩১ জুলাই ২০২৬, ০৮:১২ পিএম
উত্তর আফ্রিকায় স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত ছিটমহল সেউতায় গত ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৫০ হাজারের বেশি অভিবাসী প্রবেশ করেছিলেন, যা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। তবে স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, তারা অভিবাসীদের এই নজিরবিহীন ঢল প্রতিহত করেছে এবং স্থল ও সমুদ্রপথে সীমান্ত পার হওয়া হাজার হাজার মানুষ ইতোমধ্যে স্বেচ্ছায় ফিরে গেছে।
স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করেছে অনুমান করা হচ্ছে, তবে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ ইতোমধ্যেই ফিরে গেছে।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে পাঠানো এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় বলেছে, 'শুক্রবার দুপুর ১টা পর্যন্ত মরক্কোর উদ্দেশে সেউতা ছেড়েছে ২৫ হাজার মানুষ। নজিরবিহীন গণঅনুপ্রবেশের পর দুই দেশের সমঝোতার ভিত্তিতে প্রতি মিনিটে ১৫০ জন হারে এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া চলছে।’

অন্যদিকে মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনী সেউটার প্রবেশদ্বারে লাঠি ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে সেখানে অবস্থারত হাজার হাজার মানুষকে সরিয়ে দিয়েছে, যাতে আরও কেউ মরক্কো থেকে ভূমধ্যসাগরে হয়ে স্প্যানিশ ভূখণ্ডে জোর করে প্রবেশ করতে না পারে।
এদিকে সেউতার স্থানীয় সরকারের প্রধান হুয়ান জেসুস ভিভাস বলেছেন, প্রায় ৬০ হাজার মানুষ সাগর পাড়ি দিয়ে ছিটমহলটিতে প্রবেশ করেছিল। তবে এই যাত্রায় প্রাণ হারিয়েছেন অনেকে, এখন পর্যন্ত ৩৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে কর্তৃপক্ষ।
এর আগে স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, সাগর থেকে ১৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

হঠাৎ করে অভিবাসীদের এই নজিরবিহীন ঢল নামার পেছনে স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের একটি সাম্প্রতিক যুগান্তকারী রায় এবং দেশটির নতুন উদার অভিবাসন নীতিকে দায়ী করছে সেউতার স্থানীয় প্রশাসন।
চলতি জুলাই মাসে স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট একটি ঐতিহাসিক রায় দেয়। এই রায় অনুযায়ী, সমুদ্রপথে সেউতা অঞ্চলে প্রবেশের চেষ্টাকালে কোনো অভিবাসীকে আটক করা হলে, তাকে আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া তাৎক্ষণিকভাবে মরক্কোতে ফেরত পাঠানো যাবে না।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তাদের মতে, এই আইনি সুরক্ষাকে কাজে লাগিয়ে মানবপাচারকারী চক্রগুলো হাজার হাজার অভিবাসীকে স্পেনে ঢুকতে উৎসাহিত করেছে। তারা অভিবাসীদের বুঝিয়েছে যে, এখন একবার স্পেনের জলসীমায় বা মাটিতে পা রাখতে পারলে আর সহজে ফেরত পাঠানো হবে না এবং পরবর্তীতে বৈধ হওয়ার সুযোগও মিলবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে এর প্রমাণ মিলেছে। বেশকয়েকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, বৃহস্পতিবার রাতে মরক্কোর সীমান্তবর্তী শহর ফনিদেকে হাজারো তরুণ জড়ো হন। তাদের অনেকেই দাবি করেন, তারা শুনেছেন ‘সীমান্ত খুলে দেওয়া হয়েছে’।
সেউতার স্থানীয় সরকারের মুখপাত্র আলেহান্দ্রো রামিরেস বলেন, স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের ওই রায় সেউতায় এই অভিবাসী ঢল নামার পেছনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। তাই অনিয়মিত প্রবেশের চেষ্টা কমাতে বিদ্যমান আইনি বিধান পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।

অন্যদিকে, চলতি ২০২৬ সালের শুরুতে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজের সরকার ঘোষণা করে যে, দেশটিতে অনিয়মিতভাবে থাকা ৫ লাখেরও বেশি অবৈধ অভিবাসীকে ধাপে ধাপে আইনি বৈধতা দেওয়া হবে। এই সহজ সাধারণ ক্ষমার খবর ছড়িয়ে পড়ায় উন্নত জীবনের আশায় আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অভিবাসীরা যেকোনো উপায়ে স্পেনের ভূখণ্ডে পৌঁছানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।
মানবাধিকারকর্মীদের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর আফ্রিকার মরক্কো উপকূল থেকে স্পেনের সেউতা শহরের দূরত্ব মাত্র ৫ কিলোমিটার (৩.১ মাইল)। হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে সাঁতার কেটে বা ফোলানো টিউব ব্যবহার করে সাগরের বাঁধ পেরিয়ে চলে আসায় স্থানীয় সীমান্তরক্ষীদের পক্ষে এই স্রোত আটকানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।
স্প্যানিশ সরকারের এই সিদ্ধান্ত আগেই ইউরোপের অনান্য দেশগুলোকে ক্ষুব্ধ করেছিল। গতকাল অভিবাসীদের ঢলের ঘটনায় ইউরোপজুড়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এ ঘটনাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে স্পেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভিসামুক্ত ‘শেনজেন অঞ্চল’ থেকে সাময়িকভাবে বাদ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি।
শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘সেউতা থেকে আসা দৃশ্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে। প্রয়োজন হলে স্পেনের বিরুদ্ধে শেনজেন চুক্তি স্থগিতের মতো ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।’
সূত্র: রয়টার্স, ইউরো নিউজ
এমএইচআর