আন্তর্জাতিক ডেস্ক
৩০ জুলাই ২০২৬, ১০:৪৩ পিএম
বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে টোকিওর বিকল্প বা ‘ব্যাকআপ’ রাজধানী খোঁজার ঐতিহাসিক উদ্যোগ নিয়েছে জাপান সরকার।
গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) জাপানের পার্লামেন্টে ‘সেকেন্ডারি ক্যাপিটাল’ বা বিকল্প রাজধানী গঠনের এই ঐতিহাসিক বিলটি পাস হয়েছে।
দেশটির সরকারি হিসাব অনুযায়ী, আগামী ৩০ বছরের মধ্যে টোকিও মহানগর এলাকায় ৭ বা তার চেয়ে বড় মাত্রার মারাত্মক ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৭০ শতাংশ। এমন দুর্যোগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পার্লামেন্ট ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয়গুলো অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে এ সময় দেশের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম যেন নিরবচ্ছিন্নভাবে সচল রাখা যায়, সেটিই এই আইনের মূল লক্ষ্য।
নতুন আইন অনুযায়ী, টোকিও কোনো কারণে অকার্যকর হয়ে পড়লে পূর্বনির্ধারিত বিকল্প অঞ্চলটি সাময়িকভাবে দেশের মূল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করবে।
আইনে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো শহরের নাম উল্লেখ করা হয়নি, বরং একটি আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে যার অধীনে বিভিন্ন অঞ্চল আবেদন করতে পারবে। তবে যোগ্যতার প্রাথমিক শর্ত হলো—সেটিকে টোকিওর সমসাময়িক দুর্যোগ বলয় থেকে মুক্ত হতে হবে এবং পর্যাপ্ত অবকাঠামো থাকতে হবে।
বিকল্প রাজধানী হিসেবে সবচেয়ে বড় দাবিদার মনে করা হচ্ছে দেশটির অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসাবে পরিচিত বন্দরনগরী ওসাকা। ওসাকাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দল ‘জাপান ইনোভেশন পার্টি’ (ইশিন)-এর দীর্ঘদিনের এজেন্ডাও ছিল এটি। ২০১০ সালের দিকে দলটির প্রতিষ্ঠাতা ও ওসাকার সাবেক গভর্নর তোরু হাশিমোতো প্রথম ওসাকাকে বিকল্প রাজধানী করার প্রস্তাব দেন।
অন্যদিকে গাড়ি নির্মাতা জায়ান্ট টয়োটার মূল কেন্দ্রস্থল আইচি প্রিফেকচারের গভর্নর হিদেয়াকি ওমুরা বিল পাসের পরপরই তার অঞ্চলকে দেশের প্রথম বিকল্প রাজধানী করার তীব্র ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
এছাড়াও ফুকুওকা, হোক্কাইদো, সাপ্পোরো এবং মিয়াগি প্রিফেকচারও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি।
এদিকে তাকাইচি সরকারের জন্য এই বিলটি পাস করা সহজ ছিল না। নিম্নকক্ষে সহজে পাস হলেও বিরোধী দল নিয়ন্ত্রিত উচ্চকক্ষে বিলটি মাত্র ২ ভোটের ব্যবধানে পাস হয়।
সমালোচকদের মতে, এই পরিকল্পনার ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও কর ছাড় কেবল ওসাকা বা নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলের দিকে চলে যেতে পারে, যা অন্য অঞ্চলগুলোকে বঞ্চিত করবে। এছাড়া বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ ও মূল্যস্ফীতির মাঝে এই বিশাল প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্য খরচ নিয়ে জাপানি নাগরিকদের মনে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
প্রসঙ্গত, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ তাদের প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা, অতিরিক্ত জনসংখ্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা কৌশলগত কারণে রাজধানী পরিবর্তন করেছে অথবা পরিবর্তনের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। এ তালিকায় শীর্ষে রয়েছে এশিয়ার আরেক দেশ ইন্দোনেশিয়া।
দেশটির রাজধানী জাকার্তা অতিরিক্ত মাত্রায় ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে সমুদ্রের পানিতে প্রতি বছর একটু একট করে তলিয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও এক কোটির বেশি মানুষের আবাসস্থল এই নগরটি জনাকীর্ণ ও দূষিত হয়ে পড়েছে। ফলে জাকার্তার ১৩০০ কিলোমিটার (৮০০ মাইল) দূরে বোর্নিও দ্বীপে একটি নতুন রাজধানী গড়ে তোলার জন্য ২০১৯ সালে প্রথম প্রস্তাব করা হয়েছিল। তাদের নতুন রাজধানীর নাম হবে ‘নুসান্তারা’।
২০২২ সাল থেকে বোর্নিও দ্বীপের জঙ্গলে এই শহরের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে আংশিক কার্যক্রম শুরু হলেও ২০৪৫ সালের মধ্যে পুরো স্থানান্তর প্রক্রিয়া শেষ হবে।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস, নিক্কেই এশিয়া
এমএইচআর