আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৫ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫৯ পিএম
বাংলাদেশে অবৈধ ম্যাচমেকিং সেবা বা দালালের মাধ্যমে বিয়ে করার বিষয়ে নিজ নাগরিকদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা জারি করেছে চীন। সম্প্রতি অবৈধ ম্যাচমেকিং বা বিয়ের নামে প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়ে বাংলাদেশি নারীরা চীনে পাচারের শিকার হচ্ছেন—এমন আশঙ্কায় বেইজিং এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বিবৃতিতে ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, ‘কোনো চীনা নাগরিক যদি দালাল বা অবৈধ আন্তঃসীমান্ত বিবাহ ম্যাচমেকিং এজেন্সির মাধ্যমে স্ত্রী খোঁজার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে আসেন, তবে তিনি মানবপাচারের সন্দেহে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হতে পারেন।’
এছাড়াও অর্থের বিনিময়ে কনে খোঁজার চেষ্টা বা ‘কনে কেনা’ প্রায়ই আর্থিক চাঁদাবাজি, প্রতারণা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায় বলেও সতর্ক করেছে দূতাবাস।
চীনা দূতাবাস জানিয়েছে, তাদের দেশ কোনো এজেন্সিকে আন্তঃসীমান্ত বিবাহ ম্যাচমেকিং পরিষেবা চালানোর অনুমতি দেয় না। তাই চীনা নাগরিকদের এসব এজেন্সি থেকে দূরে থাকতে এবং অনলাইন রোমান্স স্ক্যাম থেকে সতর্ক থাকতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে
বাংলাদেশের মানবপাচারবিরোধী আইন ও দণ্ডবিধির কঠোরতার বিষয়টি তুলে ধরে পোস্টে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী- মানবপাচারের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে ন্যূনতম সাত বছরের কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। অপরাধের প্রকৃতি ও গুরুত্ব অনুযায়ী সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
এছাড়া মানবপাচারে প্ররোচনার মতো অপেক্ষাকৃত কম গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে তিন থেকে সাত বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
চীনের দূতাবাস জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে চীনা নাগরিকদের জড়িয়ে আন্তসীমান্ত বিয়ে–সংক্রান্ত প্রতারণার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বহু চীনা নাগরিক বাংলাদেশে এসে কনে খোঁজার নামে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক দালালদের খপ্পরে পড়ছেন। মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পর তারা আইনি ও আর্থিক জালিয়াতির শিকার হচ্ছেন।
দূতাবাস জোর দিয়ে বলেছে, আন্তর্জাতিক বিয়ে অবশ্যই উভয় পক্ষের স্বাধীন সম্মতি ও পারস্পরিক ভালোবাসার ভিত্তিতে হওয়া উচিত।
চীনে আন্তর্জাতিক ম্যাচমেকিং ব্যবসা সম্পূর্ণ অবৈধ। তবে দেশটিতে এ ধরনের অবৈধ ব্যবসা বিস্তার লাভ করেছে, যা নিয়ে বেইজিংয়ের উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। যদিও এর পেছনে রয়েছে চীনের দীর্ঘদিনের এক সন্তান নীতির কারণে দেশটিতে নারী ও পুরুষের অনুপাতে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা।
২০২০ সালের জাতীয় আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, চীনে বিয়ের উপযুক্ত পুরুষের সংখ্যা নারীর তুলনায় প্রায় ১ কোটি ৭৫ লাখ বেশি। এই পরিস্থিতিতে বিদেশি নারীদের বৈবাহিক পাচার থেকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি নিজেদের নাগরিকেরা যাতে আন্তর্জাতিক প্রতারণা চক্রের ফাঁদে পড়ে বিপুল অর্থের ক্ষতির শিকার না হন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে বেইজিং।
এর আগে ভিয়েতনাম, মিয়ানমার, লাওস, পাকিস্তান ও নেপালে অবস্থিত চীনের দূতাবাস ও কনস্যুলেটও বিয়ে–সংক্রান্ত প্রতারণা নিয়ে একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছিল।
এদিকে বেইজিং নিজস্ব দমন অভিযান জোরদার করেছে। দেশটির প্রধান আইন সংস্থা- পিপলস প্রকিউরেটরেটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত মানবপাচার ও প্রতারণামূলক ম্যাচমেকিং চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ১ হাজার ৫৪৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কিছু ঘটনায় বিদেশি স্ত্রী খুঁজতে গিয়ে হাজার হাজার ইউয়ান পরিশোধ করার পর চীনা পুরুষেরা প্রতারণার শিকার হয়েছেন। আবার কিছু ক্ষেত্রে বিদেশি নারীদের অপহরণ বা প্রতারণার মাধ্যমে চীনে নিয়ে জোরপূর্বক বিয়ে দিতে বাধ্য করা হয়েছে।
গত বছরের মার্চে মাদাগাস্কারে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তরুণীদের চীনে পাচারের অভিযোগে আটজন চীনা নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়।
এছাড়াও সম্প্রতি হুনান, আনহুই ও শানডং প্রদেশে পরিচালিত এক যৌথ অভিযানে তিন মিয়ানমারের নারী স্বীকার করেন, তারা বিয়ের নামে প্রতারণার উদ্দেশ্যেই চীনে এসেছিলেন। ওই অভিযানে ৬৩ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হয়, ৩৩ জনকে প্রশাসনিক শাস্তি দেওয়া হয় এবং ৫০ লাখ ইউয়ানের বেশি সম্পদ জব্দ করা হয়।
সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট
এমএইচআর