আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৭ জুন ২০২৬, ০৫:০৪ পিএম
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর প্রায় ৩২৪ ট্রিলিয়ন লিটার (৮৫.৬ ট্রিলিয়ন গ্যালন) মিঠা পানি শুকিয়ে যাচ্ছে, যা ২৮ কোটি মানুষের এক বছরের চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট। ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে মিঠা পানির এই ক্রমাগত হ্রাসকে ‘মহাদেশীয় শুষ্কতা’ নামে অভিহিত করে বিশ্বব্যাংক। ক্রমবর্ধমান খরা এবং অস্থিতিশীল ভূমি ও পানি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির ফলে এমন পরিবর্তন দেখা দিয়েছে।
এদিকে মরুকরণ ও খরা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে এবং ক্ষয়প্রাপ্ত ভূমি পুনরুদ্ধারের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণে উৎসাহিত করতে ১৭ জুনকে বিশ্ব মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধ দিবস ঘোষণা করেছে জাতিসংঘ।
স্যাটেলাইট চিত্রের বরাতে বুধবার এক প্রতিবেদনে বিশ্বজুড়ে সঙ্কুচিত হয়ে আসা ১০টি হ্রদ, নদী ও বাঁধের বর্তমান তথ্য তুলে ধরেছে কাতার-ভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরা।
প্রায় ৪,৯০০ কিলোমিটার (৩,০৩০ মাইল) দীর্ঘ পারানা নদী আমাজনের পর দক্ষিণ আমেরিকার দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী এবং এটি ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে ও আর্জেন্টিনাকে সংযোগকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথ হিসেবে কাজ করে।
কয়েক বছরের খরার কারণে, ১৯৯০ এবং ২০২৬ সালের স্যাটেলাইট চিত্রের তুলনা করলে দেখা যায়, রোজারিও বন্দরের জলস্তর মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এই ভয়াবহ সংকোচনের ফলে শস্য পরিবহন ব্যাহত হয়েছে, ইতাইপু বাঁধে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে এবং নদীর তলদেশের বিস্তীর্ণ সমতল ভূমি ও নতুন দ্বীপ সৃষ্টি হয়েছে।
বলিভিয়ার ৩,৭০০ মিটার (১২,০০০ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত পোপো লেক বা হ্রদ, বিলুপ্তপ্রায় উচ্চভূমির হ্রদের বিশ্বের অন্যতম চরম উদাহরণ।
১৯৮৪ এবং ২০২০ সালের স্যাটেলাইট চিত্রের তুলনা করলে দেখা যায়, একসময় বলিভিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম হ্রদটি, যা ১ হাজার বর্গ কিলোমিটার (৩৯০ বর্গ মাইল) এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল, তা প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। জলপ্রবাহের দিক পরিবর্তন, খরা এবং উষ্ণায়নের কারণে এটি অনেকাংশে শুকিয়ে গিয়ে একটি লবণাক্ত সমভূমিতে পরিণত হয়েছে এবং মৎস্য সম্পদ ও আদিবাসী উরু জনগোষ্ঠীর জীবিকা ধ্বংস করেছে।
বতসোয়ানার ওকাভাঙ্গো ডেল্টার দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত এনগামি লেকে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যায়, যা ওকাভাঙ্গো প্রণালি থেকে আসা পানির প্রবাহের উপর নির্ভরশীল।
১৯৮৪ এবং ২০২০ সালের স্যাটেলাইট চিত্রের তুলনা এর অত্যন্ত পরিবর্তনশীল ও জলবায়ু-সংবেদনশীল প্রকৃতিকে তুলে ধরে। তীব্র খরা এবং উজানের জলধারা থেকে আসা পানির ওঠানামার কারণে হ্রদটি প্রায় অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। এতে স্থানীয় মৎস্য চাষ এবং গবাদি পশুর চারণভূমি ধ্বংসের মুখে পড়ে, যদিও পরে এটি আংশিক পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
রাজধানী সান্তিয়াগোর কাছে পাইনে অবস্থিত আকুলেও লেগুন হলো এমন একটি হ্রদের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ, যা দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং পানির অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে এটি পুরোপুরি শুকিয়ে গেছে।
২০০৭ এবং ২০২৬ সালের স্যাটেলাইট চিত্রের তুলনা করলে দেখা যায়, একসময়ের জনপ্রিয় এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সহায়তাকারী বিনোদন কেন্দ্রটি কীভাবে বিলীন হয়ে গেছে।
উত্তর-পশ্চিম ইরানে অবস্থিত লেক উর্মিয়া একসময় মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম লবণাক্ত পানির হ্রদ ছিল, যা ১৯৯০-এর দশকে প্রায় ৬ হাজার বর্গ কিলোমিটার (২৩০০ বর্গ মাইল) এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল। এরপর থেকে এটি সংকুচিত হতে হতে মাত্র ৫৮১ বর্গ কিলোমিটার (২২৪ বর্গ মাইল) হয়েছে, যা এর পূর্বের আকারের ১০ শতাংশেরও কম।
ধারাবাহিক খরা, কৃষিকাজে পানির ব্যবহার, নদীর গতিপথ পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে উর্মিয়া হ্রদের বিস্তীর্ণ এলাকা উন্মুক্ত লবণাক্ত সমভূমিতে পরিণত হয়েছে।
দক্ষিণ ইরাকে অবস্থিত আল-চিবায়িশ জলাভূমি বৃহত্তর মেসোপটেমীয় জলাভূমির একটি অংশ, যা ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান। জলাভূমিটি ইরাকের প্রাচীন টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদী দ্বারা পুষ্ট এবং মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি বাস্তুতন্ত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম।
১৯৮৪ এবং ২০২০ সালের স্যাটেলাইট চিত্রের তুলনা করলে জলাভূমিটির বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। ১৯৯০-এর দশকে তীব্র পানি নিষ্কাশন এবং খরার কারণে ব্যাপক শুষ্কতা দেখা দিয়েছিল, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি এবং চলমান পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টার ফলে এর কিছু অংশ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে।
আম্বোভোম্বে হলো আফ্রিকার দ্বীপরাষ্ট্র মাদাগাস্কারের অন্যতম জলবায়ু-পীড়িত ও খরাপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর। মালাগাসি ভাষায় ‘আম্বোভোম্বে’ শব্দের অর্থ হলো ‘প্রচুর কূপের স্থান’।
১৯৮৫ এবং ২০২০ সালের স্যাটেলাইট চিত্রের তুলনা করলে দেখা যায়, বহু বছরের খরা এবং ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে দক্ষিণ মাদাগাস্কারে একটি গুরুতর পরিবেশগত সংকট বিরাজ করছে। প্রবল লাল বালুঝড় এবং বৃষ্টিপাতের ঘাটতি পানির উৎস ও কৃষিজমির ক্ষতি করেছে, জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় কৃষি ও পশুপালনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং ব্যাপক দুর্ভোগ ও স্থানচ্যুতির কারণ হয়েছে।
সাহারা মরুভূমির শেষ প্রান্তে অবস্থিত উত্তর মালির ফাগুইবাইন হ্রদটি সাম্প্রতিক দশকগুলোতে প্রায় বিলীন হয়ে গেছে।
ঐতিহাসিকভাবে নাইজার নদীর বন্যার পানিতে পুষ্ট হলেও ১৯৮৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত স্যাটেলাইট চিত্র থেকে দেখা যায়, বন্যার পরিমাণ কমে যাওয়া, খরা এবং পলি জমার কারণে হ্রদটি নাটকীয়ভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। যার ফলে এর অববাহিকার বেশিরভাগ অংশ শুষ্ক এবং ক্রমশ মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে।
নেভাডা-অ্যারিজোনা সীমান্তে অবস্থিত লেক মিড হলো ধারণক্ষমতার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম জলাধার। ১৯৩০-এর দশকে কলোরাডো নদীর উপর হুভার বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে এটি গঠিত হয় এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও মেক্সিকোর কিছু অংশের লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য সুপেয় পানির এক গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
১৯৮৪ এবং ২০২০ সালের স্যাটেলাইট চিত্রের তুলনা করলে জলাধারটির নাটকীয় অবনতি দেখা যায়। দীর্ঘস্থায়ী খরা, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এবং পানির ব্যাপক চাহিদার কারণে পানির স্তর তীব্রভাবে হ্রাস পেয়েছে, যা বিস্তীর্ণ তীরবর্তী এলাকা এবং পূর্বে জলমগ্ন ভূমিকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
উত্তর-পশ্চিম উজবেকিস্তানে অবস্থিত দক্ষিণ আরল সাগর বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবসৃষ্ট পরিবেশগত বিপর্যয়ের একটি অংশ।
১৯৮৪ এবং ২০২০ সালের স্যাটেলাইট চিত্রের তুলনা করলে হ্রদটির নাটকীয় বিলুপ্তি দেখা যায়; কয়েক দশক ধরে সেচের জন্য নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটে, যা এটিকে ৯০ শতাংশেরও বেশি সংকুচিত করে।
সূত্র: আলজাজিরা
এমএইচআর