আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৭ জুন ২০২৬, ০৩:৩৭ পিএম
ভারতে গাড়ির জ্বালানিতে ইথানল মেশানো নিয়ে বিতর্কের মাঝেই দেশাটির কেন্দ্রীয় পরিবহনমন্ত্রী নিতিন গডকরি এবার ই১০০ বা সম্পূর্ণ ইথানল জ্বালানির অনুমোদন দিয়েছেন। কিছুদিন আগেই তিনি ই৮৫ বা ১৫ শতাংশ পেট্রোলের সঙ্গে ৮৫ শতাংশ ইথানল মেশানোর অনুমোদন দিয়েছিলেন।
তবে ভারতে তেলের দাম বৃদ্ধি ও গাড়ি চালকদের জোর করে ইথানলযুক্ত পেট্রোল কিনতে বলায় অসন্তুষ্ট হতে দেখা গিয়েছে বহু মানুষকে।
গত ৫ জুন কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী দিল্লিতে ই৮৫ ফুয়েল স্টেশন উদ্বোধন করলেও দেখা যাচ্ছে যে বর্তমানে ভারতে ৮৫ শতাংশ ইথানল-সমর্থিত গাড়ি খুবই কম রয়েছে।
ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন যে ইথানল শক্তি উৎপাদনের দিক থেকে পেট্রোলের সমকক্ষ নয়। তবে ইথানল মিশ্রিত জ্বালানির দাম কম। তাই তিনি আশা করেন যে ভবিষ্যতে গ্রাহকদের এই জ্বালানি সাশ্রয় দেবে।
বর্তমানে ভারতে সাধারণত ২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রিত পেট্রোল দেওয়া হয়। তবে সরকার ১০ জুন ঘোষণা করেছিল যে ২২ থেকে ৩০ শতাংশ ইথানল মিশ্রিত জ্বালানিতে সরকার কর ছাড় দিচ্ছে যা এই জ্বালানির দাম ই২০-এর দামের সমান করে দিয়েছে ইতোমধ্যেই।
এর থেকে স্পষ্ট যে, সরকার চাইছে পেট্রোলে আরও বেশি করে ইথানল মেশানো হোক। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তে খুশি নন ক্রেতারা। এমনকি ইথানল মিশ্রিত জ্বালানিতে গাড়ির উপর বিভিন্ন খারাপ প্রভাব হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন তারা।
ভারত সরকার ২০২৩ সালে যানবাহনের মান নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিএস৬-২ নামে একটি ব্যবস্থা চালু করেছে। এর অধীনে, যানবাহন নির্মাতাদের তাদের ইঞ্জিন এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশগুলোকে ই২০ জ্বালানির উপযোগী করে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
তবে এর আগের বছরগুলোতে তৈরি যানবাহনগুলো বেশিরভাগই নন-ইথানল পেট্রোল বা ই১০ পেট্রোলের জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল। ফলে, যারা ২০২৩ সালের আগে গাড়ি কিনেছেন, তাদের মনে আরও বেশি সংশয় রয়েছে। এবং জোর করে এই ই২০ জ্বালানির বিষয়টি চাপিয়ে দেওয়ার জন্য তাদের মনে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
পুদুচেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক এবং দুই-চাকার যানবাহনের বিশেষজ্ঞ ড. কুমারান বলেন, "পেট্রোল-ভিত্তিক ইঞ্জিন সিস্টেম এবং যন্ত্রাংশগুলো উচ্চ মাত্রার ইথানলযুক্ত জ্বালানিতে সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। তাই, পুরোনো যানবাহনগুলোর পেট্রোল ট্যাংক, গ্যাসকেট এবং ফুয়েল পাইপের মতো যন্ত্রাংশগুলো ইথানল-উপযোগী যন্ত্রাংশ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা প্রয়োজন।"
কিন্তু যে ক্রেতারা ২০২৩-এর আগে গাড়ি কিনেছেন, তারা বলছেন যে তাদের গাড়ির যন্ত্রাংশ আপগ্রেড বা প্রতিস্থাপন করার জন্য কোনো সুযোগই তাদের দেওয়া হয়নি। বরং উল্টে তারা ই২০ জ্বালানি কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। যার ফলে ক্ষতি হচ্ছে তাদের গাড়ির ইঞ্জিনে।
এই প্রশ্নের উত্তরে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ নরেন্দ্র তানেজা বলেন, ‘পেট্রোলের তুলনায় ইথানলে শক্তি কম থাকে, তাই ই২০ জ্বালানি ব্যবহার করলে মাইলেজ কমে যেতে পারে। তবে, ইঞ্জিনের কিছু যন্ত্রাংশ পরিবর্তন করে এবং সেগুলোকে সঠিকভাবে সমন্বয় করার মাধ্যমে মাইলেজের এই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব।’
নরেন্দ্র তানেজা আরও উল্লেখ করেন যে, ই২০ জ্বালানি একটি জৈব-জ্বালানি, তাই এটি কম দূষণ ঘটায়। একারণে এটি বেশিরভাগ দেশেই ব্যবহৃত হচ্ছে।
তিনি বলেন যে, ভারতে বর্তমানে শুধু পেট্রোলের সাথেই ইথানল মেশানো হচ্ছে। বেশিরভাগ বড় SUV (স্পোর্ট ইউটিলিটি ভেহিক্যাল) ডিজেলে চলে। তাতে কিন্তু অন্য কিছু মেশানো হচ্ছে না। অন্যান্য দেশে ডিজেলের সাথেও ইথানল মেশানো হচ্ছে।
ই২০ থেকে ই৩০ পর্যন্ত জ্বালানি মিশ্রণ মূলত অধিকাংশ পেট্রোল-চালিত গাড়ির জন্য প্রযোজ্য। অনেক ক্রেতা বলছেন, তারা ইথানল ব্যবহারের ফলে মাইলেজে পাঁচ থেকে ১২ শতাংশ ঘাটতি লক্ষ্য করছেন। তবে এই অভিযোগকে স্বীকার করেও জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ‘ই২০ জ্বালানিতে যে মাইলেজ কমে তা অতি নগণ্য।’
এছাড়াও ইথানল মেশানোর ফলে গাড়িগুলোর ইঞ্জিনে খারাপ প্রভাব পড়ার অভিযোগকে একাধিকবার খারিজ করা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।
সরকারের দাবি, ইথানল একটি জৈব জ্বালানি বা বায়ো ফুয়েল। যা পরিবেশের জন্য কম ক্ষতিকর।
সাম্প্রতিক পদক্ষেপটি, অর্থাৎ ই৮৫ ও তার চেয়ে উচ্চতর অনুপাতে মিশ্রণের জ্বালানিকে স্বীকৃতি দেওয়ার লক্ষ্যে যে খসড়া সংশোধনী আনা হয়েছে, তা শুধু ‘ফ্লেক্স ফুয়েল ভেহিকেল’-এর নতুন একটি শ্রেণির বাহনকে লক্ষ্য করে নেওয়া হয়েছে।
এই ধরনের গাড়িগুলো পেট্রোল ও ইথানলের বিভিন্ন মিশ্রণে চলার উপযোগী করে তৈরি করা হলেও ভারতীয় বাজারে এদের ব্যাপক প্রচলন হতে এখনো কিছুটা সময় লাগবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
সম্প্রতি ভারতের একটি ইংরেজি দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, গাড়ি নির্মাতা সংস্থাগুলো মনে করছে যে, ই২০ থেকে ই২৫ মিশ্রণের জ্বালানির জন্য ইঞ্জিন আপগ্রেড করতেই গাড়িগুলির ইঞ্জিনে বহু পরিবর্তন করতে হবে। যার জেরে অতিরিক্ত খরচ চাপবে ক্রেতাদের উপরেই। তবে এই ক্ষেত্রে সরকারের তরফ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
নীতিন গডকরি একাধিকবার বলেছেন যে ইথানলের ব্যবহার বাড়লে দেশের চাষিদের উপকার হবে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তরফে প্রকাশিত একটি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে যে গত পাঁচ বছর ধরে ভারতে আখের ফলন বাড়ছে। ২০২৫-২০২৬ সালে এই ফলন ৪৭ কোটি টন পার করে যাবে বলে অনুমান করছে সরকার।
রয়টার্সে প্রকাশিত একটি রিপোর্ট বলছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ভারতে আখ চাষ হয়েছে চাহিদার থেকে বহু গুণ বেশি। যার ফলে এত আখ বাজারে বিক্রি করা নিয়ে চিন্তায় পড়েছিলেন কৃষকরা। ইথানল তৈরি করতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো আখ। ফলে মহারাষ্ট্র ও উত্তরপ্রদেশের অনেক চাষিই এখন দাম পাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের উপর নির্ভরশীল।
এ ছাড়াও ভারত বর্তমানে দেশের চাহিদার ৮৮.৫ শতাংশ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। সম্প্রতি ইরান ও পশ্চিম এশিয়ার কয়েকটি দেশে যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে ভারতের তেল আমদানি প্রভাবিত হয়েছে। তবে ভারতে জ্বালানিতে ইথানল মেশানোর সিদ্ধান্তের সঙ্গে এই বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটকে যুক্ত করেনি সরকার।
অবশ্য বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ সমস্যার জন্য গত কয়েক মাসে বিমানের জ্বালানির দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। ইন্ডিগো, এয়ার ইন্ডিয়ার মতো বিমান সংস্থাগুলো এই নিয়ে নিজেদের উদ্বেগও প্রকাশ করেছিল সরকারের কাছে।
এই ঘটনার পরেই ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি বিমানেও ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছে সরকার।
ব্রাজিলে জ্বালানিতে ইথানল মেশানোর কাজ শুরু হয়েছিল ১৯৭০ সালের গোড়া থেকেই। তারা ধাপে ধাপে ইথানল ব্লেন্ডের অনুপাত বৃদ্ধি করেছে। প্রতিবার যখন তারা ইথানলের অনুপাত বাড়িয়েছে, সেই মতো সময় দেওয়া হয়েছে গাড়ি প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলোকে।
১৯৮০ সালের শেষের দিকে এসে তারা ই১০০ জ্বালানি চালিত গাড়ি বাজারে এনেছে। জনগণের মধ্যে প্রায় ২০ বছর ধরে ধীরে ধীরে সচেতনতা বৃদ্ধি করার ফলে ব্রাজিলে এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছিলেন সে দেশের মানুষরা।
সময়ের হিসেবে দেখতে গেলে, ভারত মাত্র দুই বছরে ই২০, ই৮৫ ও ই১০০ জ্বালানি বাজারে শুধু নিয়েই আসেনি, এক বছরের মাথায় ক্রেতাদের বাধ্য করা হয়েছে ই২০ জ্বালানি কেনার জন্য। ফলে ভারতে যারা সদ্য নতুন গাড়ি কিনেছেন, তাদের হঠাৎ করে নতুন ধরনের এক জ্বালানি কিনতে বাধ্য করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে বিক্ষুব্ধ হচ্ছেন তারা। বিবিসি বাংলা
এমএইচআর