নিজস্ব প্রতিবেদক
১৬ জুন ২০২৬, ০৩:৩৪ পিএম
ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) নির্মমতায় কুড়িগ্রাম সীমান্তে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে। বিএসএফের পুশইন করা পরিবারের শিশুসহ ৬ জন গত তিনদিন ধরে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
তাদের সঙ্গে থাকা দুই শিশু অনাহার-অর্ধাহারে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। শিশুদের প্রাণ বাঁচাতে মায়ের আকুতিতে এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে পুশ ইনের চেষ্টার শিকার গৃহবধূ সুমি আক্তার (২৫) গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, ‘আমার শিশুসন্তানরা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাদের চিকিৎসা করা দরকার। ঠিকমতো খাবার খাওয়াতেও পারছি না। তাদের কীভাবে বাঁচাবো? আমরা বাঁচতে চাই।’
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের শূন্যরেখার কাছে ছয় মাস আর চার বছরের দুই শিশুসন্তান নিয়ে এভাবেই আকুতি জানালেন সুমি আক্তার। চোখে অসহায়ত্ব, মুখে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ছাপ।
খোলা আকাশের নিচে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটানো সুমি আক্তার আকুতি জানিয়ে বলেন, ‘ভাই, আমগোর জীবন গেলে যাক, আমগোর বাচ্চা দুইডারে বাঁচাইন। এভাবে আর দুইডা দিন ফালায় রাখলে বাচ্চাগুলো মরে যাবে।’
আজ মঙ্গলবার (১৬ জুন) বেলা ১১টার দিকে রৌমারী উপজেলার শৌলমারী ইউনিয়নের গয়টাপাড়া সীমান্তের আন্তর্জাতিক ১০৬০ নম্বর মেইন পিলারের ১ নম্বর সাব-পিলার এলাকার শূন্যরেখায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ৬ জন অবস্থান করছেন।
তাদের চারপাশে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে আছেন।
নারী-শিশুসহ ভুক্তভোগীরা সীমান্তের শূন্যরেখার কাছে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন। ভারত কিংবা বাংলাদেশ কোনও দেশেই ঠাঁই হয়নি তাদের।
কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার গয়টাপাড়া সীমান্তের শূন্যরেখার কাছে খোলা আকাশের নিচে নিরুপায় বসে আছেন সুমি আক্তার-বেলাল হোসেন দম্পতি ও তাদের দুই শিশুসন্তানসহ ছয় জন।
ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পুশইন চেষ্টা আর বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও গ্রামবাসীর পুশব্যাক প্রতিরোধে সীমান্তের শূন্যরেখায় আটকে আছে সুমি-বেলাল ও তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ।
গত রবিবার (১৪ জুন) ভোর ৬টার দিকে উপজেলার গয়টাপাড়া সীমান্তপথে নারী-শিশুসহ ছয় জন এবং ইজলামারী সীমান্তপথে আরও তিন জনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করে বিএসএফ।
কাঁটাতারের এপারে বাংলাদেশ প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হলেও বিজিবি এবং স্থানীয় গ্রামবাসীর বাধায় তাদের বাংলাদেশ ভূখণ্ডে পাঠাতে পারেনি তারা।
গয়টাপাড়া সীমান্তে দেখা গেছে, শূন্যরেখার একদিকে বিএসএফ, অরেক দিকে বিজিবি। মাঝখানে দুই শিশুসন্তান নিয়ে অসহায় বসে আছেন সুমি আক্তার-বেলাল হোসেন দম্পতি। সুমির কোলে ছয় মাসের শিশুসন্তান ফাইমা আর বেলালের কোলে চার বছরের ফাতেমা। খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টি সয়ে তিনদিন ধরে এভাবে বসে আছেন তারা।
সুমি আক্তার ও বেলালের দাবি, তারা বাংলাদেশের ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার বিরুনিয়া ইউনিয়নের কংশেরকুল গ্রামের বাসিন্দা। কয়েক মাস আগে সিলেট সীমান্তপথে তারা ভারতে পাড়ি জমান।
পরে বিএসএফ তাদের ধরে নিয়ে গত রোববার ভোরে সীমান্তের কাঁটাতার পার করে দেয়। কিন্তু বিজিবি ও স্থানীয়দের বাধায় তারা বাংলাদেশের ভূ-খণ্ডে প্রবেশ করতে পারেননি।
শূন্যরেখায় ওই দম্পতির কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলে বিজিবি ও বিএসএফের বাধায় সামান্য দূরে অবস্থান করতে হয়। সাংবাদিক দেখতে পেয়ে সুমি বলেন, ‘আমাদের বাঁচান। কোন দেশে নেবেন নেন, কিন্তু এভাবে ফেলায় রাখিয়েন না। বাচ্চাগুলা মরে যাবে। আমরা বাঁচতে চাই।’ এ সময় সন্তানদের কষ্টে কাঁদছিলেন অসহায় এই মা।
তারা শূন্যরেখার কাছে ভারতের প্রান্তে রয়েছেন, ওই প্রান্তে বিএসএফ এবং এই প্রান্তে বিজিবি দাঁড়িয়ে আছেতারা শূন্যরেখার কাছে ভারতের প্রান্তে রয়েছেন, ওই প্রান্তে বিএসএফ এবং এই প্রান্তে বিজিবি দাঁড়িয়ে আছে।
বিজিবি জানায়, বিএসএফ সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে রৌমারীর দুই সীমান্তপথে নয় জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। ঠেলে দেওয়া ব্যক্তিরা কাঁটাতারের এপারে শূন্যরেখার কাছে ভারতীয় ভূখণ্ডে অবস্থান করলেও তাদের ফেরত নেয়নি বিএসএফ। বিজিবিও তাদের বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ঢুকতে দেয়নি।
বিজিবি আরও জানায়, পুশইন চেষ্টার পর রোববার দুপুরে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক হয়। তবে কোনও সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়।
বৈঠকে সীমান্তে জড়ো করা ব্যক্তিদের বাংলাদেশের নাগরিক দাবি করেছে বিএসএফ। ভুক্তভোগী নারী-পুরুষরাও নিজেদের বাংলাদেশি নাগরিক দাবি করেছে। তবে অবৈধ অনুপ্রবেশ করায় তাদের গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায় বিজিবি। একইসঙ্গে তাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছেন তারা।
-এমএমএস