আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৬ জুন ২০২৬, ০৭:৫৯ এএম
ইরানের সঙ্গে একটি প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে হওয়া এই চুক্তির বিস্তারিত শিগগিরই প্রকাশ করা হবে। একই সঙ্গে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চুক্তির অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কারিগরি আলোচনা শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সোমবার জি-৭ সম্মেলনে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোর সঙ্গে বৈঠকের সময় ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছে। সবকিছুই সম্পন্ন হয়েছে।’
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও চুক্তির কিছু বিষয় প্রকাশ করেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। ওই দিনই জেনেভায় আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিতে স্বাক্ষর হবে।
তারা জানান, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে এ সপ্তাহেই কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা শুরু হবে। তবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করার বিষয়টি নির্ভর করবে ইরান চুক্তির শর্ত পূরণ করছে কি না তার ওপর।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স সোমবার সিএনএনকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) প্রায় দেড় পৃষ্ঠার একটি সাধারণ নথি। এর অনেক বিস্তারিত বিষয় ভবিষ্যৎ আলোচনায় নির্ধারিত হবে।
ভ্যান্স বলেন, ‘বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের কারিগরি আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। তবে এই সমঝোতা স্মারক এমন একটি কাঠামো তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে ইরান নিজেদের দায়বদ্ধতা পূরণ করলে চুক্তির সুবিধা পাবে।’
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জানান, নথির প্রথম অনুচ্ছেদে ইরান ‘আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা’ বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর’ অর্থায়ন বন্ধ করাও অন্তর্ভুক্ত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরান যাচাইযোগ্যভাবে প্রতিশ্রুতি দেবে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না।’
মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, ট্রাম্প, ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ডিজিটাল পদ্ধতিতে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন।
তাদের মতে, বুধবারের মধ্যেই চুক্তির আরো বিস্তারিত প্রকাশ করা হতে পারে। তবে ট্রাম্প বলেছেন, শুক্রবারের আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানের পর পুরো চুক্তিপত্র ‘খুব শিগগির’ প্রকাশ করা হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘এটি অত্যন্ত শক্তিশালী একটি দলিল। আমি চাই এটি প্রকাশ করা হোক। সম্ভবত খুব শিগগিরই তা হবে।’
চুক্তির আওতায় যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানো হবে। এ সময়ের মধ্যে উভয় পক্ষ একটি চূড়ান্ত চুক্তির বিস্তারিত নিয়ে আলোচনা করবে।
রোববার এই অগ্রগতির ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেন, এতে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, লেবানন যুদ্ধবিরতি কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত হলেও লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার চুক্তির শর্ত নয়। তাদের মতে, ইসরায়েল আত্মরক্ষার অধিকার বজায় রাখবে।
সোমবার সন্ধ্যায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, লেবানন, সিরিয়া ও গাজায় নিরাপত্তা অঞ্চলগুলোতে ইসরায়েলি বাহিনী ‘যতদিন প্রয়োজন’ অবস্থান করবে এবং হামলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার স্বাধীনতা বজায় রাখবে।
তিনি আরো বলেন, চুক্তি হোক বা না হোক, ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না।
নেতানিয়াহুর এই বক্তব্যের আগে লেবাননের গণমাধ্যম দক্ষিণ লেবাননে একটি গাড়িতে ইসরায়েলি হামলায় প্রাণহানির খবর দেয়। শান্তিচুক্তির ঘোষণা দেওয়ার পর এটিই ছিল প্রথম হামলা। এর জবাবে ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো তথ্য জানায় লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ।
এর আগে গত রোববার ট্রাম্প বলেন, তিনি ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ অবিলম্বে তুলে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরের পর হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার কথা জানান।
সোমবার সামাজিক মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, ‘হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। অনেক জাহাজ তেল বোঝাই অবস্থায় সেখান থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।’
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক সাক্ষাৎকারে সামরিক অভিযান বন্ধ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। ইরানি গণমাধ্যম এই চুক্তিকে ইরানের বিজয় হিসেবে তুলে ধরেছে।
গারিবাবাদি বলেন, প্রাথমিক চুক্তিতে পৌঁছাতে কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা তেহরানে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা দীর্ঘ আলোচনা চালিয়েছেন।
ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ড খাতাম আল-আম্বিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার দাবি করেছে, ইরানি জনগণ, সশস্ত্র বাহিনী এবং আঞ্চলিক মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দেখিয়ে দিয়েছে যে ‘তাদের (যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল) ‘পরাজয় মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।’
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাদের ‘গভীর অবিশ্বাস’ এখনো রয়েছে এবং এই চুক্তি ‘উত্তেজনা কমানোর পথে কেবল একটি পদক্ষেপ’ মাত্র।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, তিনি আশা করেন এই সমঝোতা বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেবে এবং সহিংসতার চক্রের স্থায়ী অবসান ঘটাবে। সূত্র: বিবিসি।
এমআর