আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৩ জুন ২০২৬, ০৪:১০ পিএম
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলায় এক মুসলিম ফেরিওয়ালাকে পিটিয়ে এবং কুড়াল দিয়ে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করার ঘটনায় জেলাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
গত মঙ্গলবার (৯ জুন) পুরুলিয়ার বান্দোয়ান থানার সাগা সুপুরী (সুপুরডিহি) গ্রামে এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডটি ঘটে।
নিহত আকবর মণ্ডলের (৪৭) বাড়ি বাঁকুড়া জেলার পুনিশোল গ্রামে। তিনি পুরুলিয়ায় অস্থায়ীভাবে থেকে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ভ্যানে করে স্টিলের বাসনপত্র বিক্রি করতেন। মঙ্গলবার সকালে ফেরি করার সময় সুপুরী গ্রামে আকবরকে হঠাৎ টেনেহিঁচড়ে বিশ্বনাথ মাহাতো নামের এক ব্যক্তির বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে লাঠি এবং কুড়াল দিয়ে নির্মমভাবে আঘাত করা হয়। তার বাড়ি থেকেই আকবরের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। ইতিমধ্যেই এই ঘটনায় বিশ্বনাথ মাহাতোকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে ওই এলাকায় তীব্র মুসলিম-বিদ্বেষী ও ভীতিমূলক পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।
আকবর মণ্ডলের ২০ বছর বয়সী ছেলে জুলফিকার বলেন, মুসলিম-বিদ্বেষী এই ভয়ের পরিবেশের কারণেই আমার বাবাকে হত্যা করা হয়েছে। দারিদ্র্যের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন জুলফিকার এবং বাবার মতোই তিনি পুরুলিয়ার বান্দোয়ান এলাকায় ফেরিওয়ালার কাজ করেন।
তিনি জানান, ৯ জুন সকালে আকবর মণ্ডল ভ্যানে করে স্টিলের বাসনপত্র বিক্রি করছিলেন। সুপুরডিহি গ্রামে তাকে হঠাৎ টেনেহিঁচড়ে একটি বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় সেখানে অপরিচিত এক ব্যক্তি তার ওপর হামলা চালায়।
জুলফিকার বলেন, ‘ওই ব্যক্তি প্রথমে আমার বাবাকে লাঠি দিয়ে পেটায়, বাবা আত্মরক্ষা করার চেষ্টা করলে তাকে কুড়াল দিয়ে আঘাত করা হয়।
তিনি আরও জানান, পরে তিনি জানতে পেরেছেন, আকবরকে একটি ছোরা দিয়েও আঘাত করা হয়েছিল।
জুলফিকার বলেন, ‘দুপুর নাগাদ বান্দোয়ান থানা থেকে এক পুলিশ কর্মকর্তা আমাকে ফোন করে বলেন, আপনার বাবা খুন হয়েছেন। এখনই বান্দোয়ান হাসপাতালে চলে আসুন। যখন আমি হাসপাতালে পৌঁছালাম, আমি আমার বাবার মৃতদেহ দেখলাম। তাঁর মাথাটা থেঁতলে দেওয়া হয়েছিল। দৃশ্যটা ছিল ভয়াবহ। তাঁর প্রায় পুরো শরীর রক্তে ভেসে গিয়েছিল। ডাক্তাররা আমাকে বলেছিলেন যে আকবর মণ্ডলকে হাসপাতালে আনার অনেক আগেই তিনি মারা গিয়েছিলেন।’
এসময় তিনি অভিযোগ করেন, “শুধু দাড়ি থাকার কারণে কিছু লোক আমাদের জোর করে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করত। তারা বলত, এখানে আর আমাদের ফেরি করতে দেওয়া হবে না। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আমরা প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যে থাকতাম এবং কাজ করতাম।”
তার বাবার হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এই যুবক।
আকবরের স্ত্রী নাজিমা বিবি, কন্যা জুম্মাতুন খাতুন, পরিবারের অন্যান্য সদস্য এবং পুনিসোল গ্রামের বাসিন্দারা উল্লেখ করেছেন, আকবর একটি পরিচিত পথেই তার পণ্য ফেরি করতেন এবং সেখানকার বাসিন্দাদের কাছে তিনি অপরিচিত ছিলেন না।
জুলফিকার আরও বলেন, আকবর নিশ্চয়ই সাহায্যের জন্য চিৎকার করেছিলেন, কিন্তু স্পষ্টতই তাকে উদ্ধার করতে কেউ এগিয়ে আসেনি।
পুনিশোল গ্রামের মণ্ডলপাড়ার প্রবীণ বাসিন্দা খেলাফত হোসেন মণ্ডল বলেন, ‘আমাদের গ্রামের মানুষ প্রায় ১৪ বছর ধরে সেখানে কোনো ঝামেলা ছাড়াই ফেরি করেছে। কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর মুসলিমদের ওপর হামলা বেড়েছে। পুনিশোলের অধিকাংশ মানুষ গরিব ও শ্রমজীবী। আমরা সব সময় দুশ্চিন্তা নিয়ে কাজে বের হই।
পুরুলিয়ার পুলিশ সুপার বৈভব তিওয়ারি বলেন, ‘এ ঘটনায় অভিযুক্ত বিশ্বনাথ মাহাতোকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মাহাতোর বাড়ির ভেতরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। খুনটি কেন হয়েছে তা নিয়ে আমরা এখনো নিশ্চিত নই। ঝগড়া থেকে এমনটা হয়ে থাকতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা থেকে বোঝা যায় যে এই ঘটনার সঙ্গে ধর্মীয় বা কোনো সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছিল।
এদিকে আকবরের মরদেহ পুনিসোলের মণ্ডল পাড়ায় পৌঁছালে বাসিন্দারা স্মরণ করেন যে, কয়েক মাস আগে বাঁকুড়া শহরের কঙ্কটা মহল্লায় ‘জয় শ্রী রাম’ বলতে অস্বীকার করায় এই গ্রামেরই আরেকজন হকারকে ছুরি দিয়ে আক্রমণ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। সেই ঘটনাটি স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল এবং আকবরের হত্যাকাণ্ড সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সূত্র: দ্য ওয়্যার
এমএইচআর