আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১০ জুন ২০২৬, ০৬:০৪ পিএম
হোয়াইট হাউসের প্রস্তাবিত বলরুমের নিচে একটি ছয়তলা বিশিষ্ট্য ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা করছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন— এমন খবরকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছে।
আনুমানিক ৪০ কোটি ডলার (প্রায় ৪,৯১৫ কোটি টাকা) ব্যয়ের এই প্রকল্পে একটি সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ নিরাপত্তা ব্যবস্থা, একটি সামরিক হাসপাতাল, অত্যন্ত গোপনীয় গবেষণা কেন্দ্র এবং একটি ড্রোন ঘাঁটি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানা গেছে।
গত ১৬ এপ্রিল জেলা জজ রিচার্ড লিওন পরিকল্পিত ৯০ হাজার বর্গফুটের বলরুমটির ভূপৃষ্ঠস্থ নির্মাণকাজের কিছু অংশ স্থগিত করার পর প্রস্তাবটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে। হোয়াইট হাউসের ভেঙে ফেলা ইস্ট উইং-এর জায়গায় বলরুমটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে এবং এটিতে ১ হাজার জন পর্যন্ত মানুষের বড় অনুষ্ঠান আয়োজনের ব্যবস্থা থাকবে, যা বর্তমান বিনোদন কেন্দ্রগুলোর ধারণক্ষমতার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
ট্রাম্প প্রশাসন এই প্রকল্পের একটি প্রধান কারণ হিসেবে জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের কথা উল্লেখ করেছে এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও বারবার নিরাপত্তা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। গত এপ্রিলে হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের অনুষ্ঠানে হওয়া ব্যর্থ গুপ্তহত্যার চেষ্টার কথা উল্লেখ করে তিনি যুক্তি দেন, একটি সুরক্ষিত স্থান ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য’।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বলরুমটি ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ ডিজাইন করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে একটি কাঠামো যার শক্ত ছাদ সরাসরি আক্রমণ প্রতিরোধ করতে সক্ষম, এতে টাইটানিয়ামের শক্তিশালী বেড়া থাকবে, যা একটি বুলডোজারও ভেঙে ফেলতে পারবে না। এছাড়াও কাঠামোটির ভূপৃষ্ঠস্থ অংশের ছাদে একটি ‘ড্রোন ঘাঁটি’ থাকার কথা রয়েছে, যা ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী পুরো ওয়াশিংটনকে সুরক্ষিত রাখার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।
তবে কথিত গবেষণা কেন্দ্রগুলো সম্পর্কে হোয়াইট হাউস আরও কোনো বিস্তারিত তথ্য দেয়নি।
হোয়াইট হাউসে ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্সিয়াল ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার (পিইওসি) নামে একটি সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ স্থাপনা রয়েছে।
পিইওসি মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান বোমারু বিমানের আকস্মিক আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য নির্মিত হয়েছিল। পরবর্তীতে, ১৯৪৮ সালে শুরু হওয়া হোয়াইট হাউসের একটি বড় সংস্কার কাজের অংশ হিসেবে, স্নায়ু যুদ্ধের শুরুর দিকে প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের অধীনে এটিকে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত ও পুনর্নির্মাণ করা হয়।
আক্রমণের সময় উদ্ধার অভিযান চালানো না হওয়া পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য এই স্থাপনাটি নির্মাণ করা হয়েছিল।
হোয়াইট হাউস হিস্টোরিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের মতে, এই গোপন স্থাপনাটিতে পুরু কংক্রিটের দেয়াল, ইস্পাতের আবরণে মোড়া ছাদ এবং প্রেসিডেন্টের জন্য একটি ছোট শয়নকক্ষ ও বাথরুমের পাশাপাশি বায়ুচলাচল মাস্ক, খাদ্য সংরক্ষণাগার এবং যোগাযোগ সরঞ্জাম রাখার কক্ষ ছিল।
বড় ধরনের সংকটকালে বাঙ্কারটি ব্যবহৃত হয়েছে। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর, তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনিসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে এই স্থাপনায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ, যিনি সে সময় ফ্লোরিডায় ছিলেন, তাকেও সেই সন্ধ্যায় বাঙ্কারটিতে নিয়ে যাওয়া হয়।
২০২০ সালের মে মাসে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর প্রতিবাদে হোয়াইট হাউসের বাইরে বিক্ষোভ চলাকালে খোদ ট্রাম্পকেও কিছু সময়ের জন্য বাঙ্কারে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র পশ্চিমা দেশ নয় যারা তাদের নেতাদের জন্য ভূগর্ভস্থ স্থাপনা নির্মাণ করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল লন্ডনের ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের কাছে ট্রেজারি ভবনের নিচে অবস্থিত একটি সুবিশাল ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার কমপ্লেক্স— ‘চার্চিল ওয়ার রুমস’ থেকে সামরিক অভিযান পরিচালনা করতেন।
কানাডায় সরকারও স্নায়ু যুদ্ধের সময় ডিফেনবাঙ্কার নির্মাণ করেছিল। প্রধানমন্ত্রী জন ডিফেনবেকারের নামে নামকরণ করা এই চারতলা ও ১ লাখ বর্গফুটের ভূগর্ভস্থ স্থাপনাটি রাজধানী অটোয়ার কাছে অবস্থিত। এটি মূলত পারমাণবিক হামলা থেকে প্রধানমন্ত্রী এবং ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
বেশ কিছু স্বৈরাচারী শাসক বিস্তৃত ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও পরিচিত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অ্যাডলফ হিটলার জার্মানির পূর্ব প্রুশিয়ার উলফ'স লেয়ারসহ বেশ কয়েকটি গোপন স্থাপনা থেকে তার কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। বার্লিনের ফ্যুয়েরারবাঙ্কারের সঙ্গেই তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, যেখানে তিনি তার জীবনের শেষ ১০৫ দিন কাটান এবং ১৯৪৫ সালে আত্মহত্যা করেন।
লিবিয়ার সাবেক নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি দেশজুড়ে গোপন বাঙ্কার ও সুড়ঙ্গের এক বিশাল নেটওয়ার্ক বজায় রেখেছিলেন। এই ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলো অত্যন্ত সুরক্ষিত ছিল এবং পারমাণবিক ও রাসায়নিক হামলাসহ সামরিক হামলা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পরিকল্পিত ছিল।
ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন সারা ইরাক জুড়ে একাধিক বাঙ্কার ও ভূগর্ভস্থ নিরাপদ আশ্রয়স্থল নির্মাণ করেছিলেন; যার মধ্যে প্রেসিডেন্ট ভবনের নিচে অবস্থিত অত্যন্ত সুরক্ষিত স্থাপনা থেকে শুরু করে সেই ছোট ভূগর্ভস্থ গোপন আস্তানাটিও ছিল, যেখানে তিনি অবশেষে ধরা পড়েন।
ধারণা করা হয়, উত্তর কোরিয়ার শাসক কিম পরিবার সামরিক সংঘাত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা পারমাণবিক যুদ্ধের সময় দেশের নেতৃত্বের টিকে থাকা নিশ্চিত করার জন্য ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার, সুড়ঙ্গ এবং কমান্ড সেন্টারের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্কও রক্ষণাবেক্ষণ করে।
এদিকে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত হোয়াইট হাউস প্রকল্পটি যুদ্ধ, সংকট ও নিরাপত্তা হুমকির সময় জাতীয় নেতাদের সুরক্ষায় ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারগুলোর ভূমিকার দিকে আবারও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
সূত্র: রয়টার্স, এনডিটিভি
এমএইচআর