আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০৬ জুন ২০২৬, ০২:৩৫ পিএম
ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাস জানিয়েছে, তারা এখনই নিজেদের অস্ত্র সমর্পণ করবে না। তবে গাজা উপত্যকায় ভবিষ্যতে কেবল আনুষ্ঠানিক ফিলিস্তিনি পুলিশের অস্ত্রই দৃশ্যমান থাকবে। তারা নিজেরা প্রকাশ্যে কোনো অস্ত্র প্রদর্শন করবে না।
সংগঠনটি বলেছে, তাদের সামরিক অস্ত্রভান্ডারের চূড়ান্ত ভবিষ্যৎ কী হবে, সে সিদ্ধান্ত অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার পর নেওয়া হবে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য হুসসাম বাদরান অচল হয়ে পড়া যুদ্ধবিরতি আলোচনা, নিরস্ত্রীকরণ বিতর্ক এবং গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে সংগঠনটির অবস্থান তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে তিনি দীর্ঘমেয়াদি ‘হুদনা’ বা যুদ্ধবিরতির ধারণাও সামনে আনেন।
হুসসাম বাদরান বলেন, ‘যখন ফিলিস্তিনি কমিটি (ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি)) গাজা উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে, তখন গাজার রাস্তা বা অলিগলিতে এই কমিটির সরকারি অস্ত্র ছাড়া অন্য কোনো দৃশ্যমান অস্ত্র থাকবে না। এই কমিটিই হবে আনুষ্ঠানিক ফিলিস্তিনি পুলিশ।’
তিনি আরও বলেন, ‘গাজা উপত্যকায় আমরা অতীতে যেসব সশস্ত্র উপস্থিতি দেখে অভ্যস্ত ছিলাম, সেগুলোর আর কোনো প্রকাশ্য অস্তিত্ব থাকবে না।’ তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন, এর অর্থ অস্ত্র হস্তান্তর নয়। তার ভাষায়, ‘আমরা অস্ত্র হস্তান্তরের কথা বলছি না। আমরা বলছি, অন্তত সরকারি ফিলিস্তিনি পুলিশের অস্ত্র ছাড়া অন্য কোনো অস্ত্র দৃশ্যমান থাকবে না। এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা একটি জাতীয় কাঠামোর মধ্যেই হবে।’
হামাসের এই অবস্থানের মধ্যেই অবগত একটি সূত্র আল জাজিরাকে জানিয়েছে, নতুন করে আলোচনা শুরু করতে সংগঠনটি তাদের প্রতিনিধি দলকে কায়রো পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। সপ্তাহান্তে এসব আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। হামাস শুরুতে আলোচনায় অংশগ্রহণ কিছু সময়ের জন্য স্থগিত রেখেছিল। তাদের দাবি ছিল, চলমান ইসরায়েলি হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে হবে। এর মধ্যে সামরিক কমান্ডার ইজ্জ আল-দীন আল-হাদ্দাদ ও মোহাম্মদ ওদেহর সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডও রয়েছে। হামাসের মতে, অনুকূল আলোচনার পরিবেশ নিশ্চিত করতেই এ দাবি জানানো হয়েছিল।
হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এখন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত অক্টোবর ২০২৫ সালের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় অচলাবস্থার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ অবস্থায় কায়রোতে ফিলিস্তিনের আটটি গুরুত্বপূর্ণ গোষ্ঠীর অংশগ্রহণে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে একটি অভিন্ন জাতীয় অবস্থান গড়ে তোলার চেষ্টা করা হবে। বাদরান জানিয়েছেন, বৈঠকে হামাস, ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ (পিআইজে), পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন (পিএফএলপি), ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন (ডিএফএলপি), পিএফএলপি-জিসি, ন্যাশনাল ইনিশিয়েটিভ, পপুলার রেজিস্ট্যান্স কমিটি (পিআরসি) এবং ফাতাহ আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডেমোক্রেটিক রিফর্ম কারেন্টের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।
এই আলোচনা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনাকে এগিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে বাদরানের দাবি, প্রথম ধাপের অধীনে ইসরায়েল তার দায়িত্বের ৩০ শতাংশও বাস্তবায়ন করেনি। ফলে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার কোনো সুযোগ তৈরি হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমরা মানবিক সহায়তা, রাফাহ সীমান্ত পারাপারের ব্যবস্থা, অবকাঠামো এবং হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে কথা বলছি। ধারণাটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি। কিন্তু প্রায় এক হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। ইসরায়েল ৩০ শতাংশও বাস্তবায়ন করেছে বলা বাড়াবাড়ি হবে।’
বাদরানের মতে, চুক্তি অনুযায়ী প্রতিদিন ৬০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশ করার কথা থাকলেও বর্তমানে মাত্র ১৫০ থেকে ২৫০টি ট্রাক প্রবেশ করছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ, হাসপাতাল ও জ্বালানির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।
ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলো যখন যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপের মানবিক প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছে, তখন ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এবং ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিসে’ গাজার উচ্চ প্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভ দ্বিতীয় ধাপে অগ্রসর হওয়ার শর্ত হিসেবে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিরস্ত্রীকরণের দাবি তুলছেন। এই অচলাবস্থা কাটাতে সম্প্রতি ম্লাদেনভ যুদ্ধবিরতির গ্যারান্টিদাতা পক্ষগুলোর তৈরি ১৫ দফার একটি রোডম্যাপ উপস্থাপন করেন। ২০২৬ সালের মে মাসে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে দেওয়া এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, পুরো পরিকল্পনাটি পারস্পরিকতা ও যাচাই-বাছাইয়ের কঠোর নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা হয়েছে।
ফিলিস্তিনিদের উদ্বেগের জবাবে ম্লাদেনভ ব্যাখ্যা করেন, রোডম্যাপে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, ‘কোনো ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে তাদের অস্ত্র ইসরায়েলের কাছে হস্তান্তর করতে হবে না।’ তার মতে, অস্ত্র নিষ্ক্রিয়করণের প্রক্রিয়া হবে ধাপে ধাপে, নির্দিষ্ট ক্রমানুসারে এবং ফিলিস্তিনিদের নেতৃত্বে। সব অস্ত্র শেষ পর্যন্ত এনসিএজির কাছে হস্তান্তর করা হবে।
ম্লাদেনভ আরও জানান, এই নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকবে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, অস্ত্র নিষ্ক্রিয়করণে যাচাইকৃত অগ্রগতি এবং একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের শর্তে ইসরায়েল ধাপে ধাপে তাদের সেনাদের গাজার সীমান্তবর্তী এলাকায় সরিয়ে নেবে।
তিনি নিরাপত্তা পরিষদকে সতর্ক করে বলেন, এই রোডম্যাপ প্রত্যাখ্যান করা হলে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। তার মতে, গাজার ৮৫ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘অস্ত্র পরিত্যাগ না করা হলে পুনর্গঠনের অর্থায়নও আসবে না।’
চুক্তি না হলে গাজা বিভক্তই থেকে যাবে এবং হামাস ভূখণ্ডের অর্ধেকেরও কম অংশে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
তবে ফিলিস্তিনিরা এই ১৫ দফা কাঠামোকে একটি সময়ক্ষেপণ কৌশল হিসেবে দেখছেন। তাদের অভিযোগ, ইসরায়েল এভাবে ছাড় আদায় করছে এবং একই সঙ্গে নিজেদের দখল আরও গভীর করছে। ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক উইসাম আফিফা আল জাজিরাকে বলেন, ‘ইসরায়েল ‘আলোচনার সময়’ কাজে লাগিয়ে ধারাবাহিক উত্তেজনা সৃষ্টি করে জনগণকে ক্লান্ত করে তুলছে।’
আফিফা আরও বলেন, ‘তারা ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনা থেকে সরে এসে নতুন ১৫ দফা কাঠামোতে গেছে, যার পুরোটা ঘুরপাক খাচ্ছে একটি মাত্র বিষয়কে কেন্দ্র করে— নিরস্ত্রীকরণ।’ তার মতে, ফিলিস্তিনি প্রতিরোধকে এমন এক কোণঠাসা অবস্থায় নেওয়া হয়েছে, যেখানে তাদের বড় ধরনের ছাড় দিতে বলা হচ্ছে, অথচ কোনো বাস্তব নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে না। এদিকে ইসরায়েলি সরকার আলোচনাকে ব্যবহার করছে নিজেদের ভূখণ্ডগত লক্ষ্যসমূহ এগিয়ে নিতে।
আফিফার দাবি, দখলদার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অভ্যন্তরীণ নির্বাচনি সুবিধার জন্য আলোচনাকে ব্যবহার করছেন। এর মাধ্যমে গাজার ৬০ শতাংশ এলাকা থেকে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ ৭০ শতাংশ বা তারও বেশি এলাকায় সম্প্রসারিত করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ‘সিভিল-মিলিটারি কো-অর্ডিনেশন সেন্টারের (সিএমসিসি) মতো তদারকি ব্যবস্থাগুলো পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে এবং পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়া কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।’
আফিফা বলেন, ‘আমরা এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে দখলদার শক্তি নিজেদের শর্তে যুদ্ধবিরতির কাঠামো নতুনভাবে সাজিয়ে নিয়েছে।’ তার অভিযোগ, ‘আগামী দিনের’ জন্য কোনো স্পষ্ট রাজনৈতিক রূপরেখা না দিয়েই ম্লাদেনভ কার্যত ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছেন এবং নিরস্ত্রীকরণের দাবি তুলেছেন।
এদিকে হামাস ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে আছে এমন অভিযোগের মধ্যেই সংগঠনটির মুখপাত্র হাজেম কাসেম পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে হামাস কায়রোভিত্তিক জাতীয় কমিটির কাছে প্রশাসন ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সব দায়িত্ব হস্তান্তর করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। বাদরানও নিশ্চিত করেছেন, ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা নথি হামাস প্রস্তুত করেছে।
তবে এনসিএজি নিজেই বড় ধরনের কার্যকরী বাধার মুখে রয়েছে এবং আফিফার ভাষায়, এটি এখন ইসরায়েলি চাপের কাছে এক ধরনের ‘জিম্মি’ হয়ে আছে। কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে আল জাজিরাকে জানান, তিনি গাজায় শিগগিরই কমিটি প্রবেশের খবর নাকচ করে দিয়েছেন। একই সঙ্গে ক্ষমতা গ্রহণের জন্য কয়েকটি কঠোর শর্তের কথাও তুলে ধরেছেন।
সূত্রটি জানায়, কমিটি কোনোভাবেই ইসরায়েল-নিয়ন্ত্রিত ‘ইয়েলো লাইন’ এর পেছনে কাজ করবে না। একই সঙ্গে গাজায় বর্তমানে সক্রিয় ইসরায়েল-সমর্থিত সশস্ত্র মিলিশিয়াদের সঙ্গেও তারা সহযোগিতা করবে না। এ ছাড়া সূত্রটি জোর দিয়ে বলেছে, ইসরায়েলি বাহিনী ও ফিলিস্তিনি এলাকার মধ্যবর্তী বাফার জোনগুলোতে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন না হওয়া পর্যন্ত কমিটি গাজায় প্রবেশ করবে না।
রাজনৈতিক অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলেও মানবিক মূল্য ক্রমেই বাড়ছে। জাতিসংঘে দেওয়া তার ব্রিফিংয়ে ম্লাদেনভ স্বীকার করেছেন, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা এখনো বেসামরিক মানুষকে হত্যা করছে এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছে।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে চলমান ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে অন্তত ৯৩৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং প্রায় ২ হাজার ৮৬৮ জন আহত হয়েছেন। এর ফলে অক্টোবর ২০২৩ থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭২ হাজার ৯৪২ জনে। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭২ হাজার ৯৬৭ জন।
এফএ