আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০৪ জুন ২০২৬, ০৩:৩৪ পিএম
সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক, যা স্থানীয়ভাবে আশ-শাম নামেও পরিচিত— বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন, আভিজাত্য ও জনবসতিপূর্ণ নগরী। এটি খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দ থেকে বিভিন্ন সভ্যতার এবং গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল। আফ্রিকা, এশিয়ার মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমের সংযোগ স্থলে অবস্থিত এই প্রাচীন শহরটির সরু রাস্তা, মোজাইক করা প্রাচীন ভবন এবং জমজমাট বাজার এখনো এক বিচিত্র অনুভূতির জন্ম দেয়। তবে ইসলাম ধর্মসহ খ্রিস্ট ধর্ম ও ইহুদি ধর্মে এই শহরটির গভীর ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব রয়েছে। ইসলামের বহু নবীর স্মৃতি বুকে ধারণ করে আছে আজকের দামেস্ক।
প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, বর্তমানে সিরিয়ার বৃহত্তম শহর দামেস্ক বিশ্বের প্রাচীনতম ধারাবাহিক জনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর একটি এবং অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী রাজধানী শহর। অর্থাৎ, একটানা সর্বাধিক সময় ধরে এই শহরটিতে মানবজাতি বসবাস করে আসছে। এ ছাড়াও বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রাজধানী শহর হিসেবেও দামেস্ককে ধরা হয়।
পুরাতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, এই অঞ্চলে ৮ থেকে ১০ হাজার খিষ্ট্রপূর্বাব্দেও জনবসতি ছিল। তবে আরামিয়ানদের আগমণের আগ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসেবে দামেস্কের নাম ইতিহাসের কোথাও নথিভুক্ত ছিল না। মধ্যযুগে শহরটি ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-সংস্কৃতি এবং বিশেষত কারুশিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল।
দামেস্ককে কাব্যিকভাবে ‘জেসমিনের শহর’ বলেও ডাকা হয়। প্রাচীনকাল থেকেই শহরের ঘরবাড়ির উঠোন, বাগানের দেয়াল, রাস্তাঘাট এবং ঐতিহ্যবাহী দালানকোঠা সাদা জেসমিন (জুঁই) ফুলে ছেয়ে থাকে। শহরের বাতাসে সবসময় এই ফুলের সুবাস ভেসে বেড়ায়।

সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই শহরটির আয়তন ১০৫ বর্গকিলোমিটার যার মধ্যে ৭৭ বর্গকিলোমিটার শহুরে অঞ্চল এবং বাকি ২৮ বর্গকিলোমিটার অঞ্চল জাবাল কাসিউন নামক পর্বতটির দখলে। অপরদিকে শহরের জনসংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ। পুরাতন দামেস্ক শহরটি বারাদা নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত এবং প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত।
বিভিন্ন সাম্রাজ্য এবং রাজবংশ দ্বারা দামেস্ক বহুবার বিজিত ও শাসিত হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে- অ্যাসিরিয়ান, ব্যাবিলনীয়, পার্সিয়ান, গ্রিক, রোমান এবং আরবরা অন্যতম। প্রতিটি বিজয়ী তার অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং স্থাপত্যে অবদান রেখে শহরে তার চিহ্ন রেখে গেছেন। তাই, এই শহরটিতে বিভিন্ন সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া যায়।
মূলত, ৬৬১ সালে উমাইয়া খেলাফতের সময় ‘দামেস্ক’ সর্বপ্রথম রাজধানী শহর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে দামেস্ক তার সমৃদ্ধির চূড়ায় পৌছাতে থাকে।
ইসলামিক ঐতিহ্য অনুযায়ী, এই প্রাচীন শহরের সাথে মহান নবীদের নামও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
কিছু ইসলামি ঐতিহ্য ও লোকবর্ণনা অনুযায়ী, মহাপ্লাবনের পর হযরত নূহ (আ.) যখন নৌকা থেকে অবতরণ করে হিসমা পর্বত থেকে নিচের দিকে তাকালেন, তখন তার দৃষ্টি জালাব ও দিসান নামক দুটি নদীর মাঝখানে অবস্থিত পাহাড়ে পড়ে। তখন তিনি একে শহর হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি দামেস্ক শহরকে গড়ে তোলেন।
পরবর্তীতে মেসোপটেমিয়ার ‘উর’ (বর্তমান ইরাক) থেকে সিরিয়ায় হিজরত করার পথে হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তার সঙ্গীরা এই অঞ্চলে এসেছিলেন। তিনি ফোরাত নদী পার হয়ে হারান এলাকায় কিছুকাল অবস্থান করেছিলেন। সেখানে পৌঁছানোর পর তিনি সেখানকার নক্ষত্র পূজারী সম্প্রদায়ের লোকদের এক আল্লাহর ইবাদতের দাওয়াত দিয়েছিলেন। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী সারাহ এবং ভাতিজা হজরত লুত (আ.)। ফলে ঐতিহাসিক এই শহরটিতে আজও ইব্রাহিম (আ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন নিদর্শন রয়েছে।

ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনুযায়ী, দামেস্ক শহরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আছে ইসলামের আরও দুই নবী হজরত ইদরিস (আ.) এবং হজরত হুদ (আ.)-এর নাম। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় এই দুই নবীর স্মৃতিবিজড়িত নানা নিদর্শন ও স্থানের কথা দামেস্কে উল্লেখ পাওয়া যায়।
৭১৫ খিষ্টাব্দে নির্মিত উমাইয়া মসজিদ, যাকে গ্রেট মসজিদ অব দামেস্কও বলা হয়, ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য স্থাপত্য। অনেকের বিশ্বাস অনুযায়ী, এই মসজিদে হজরত ইদরিস (আ.)-এর মাকাম বা অবস্থান এবং হজরত হুদ (আ.)-এর নামে একটি কূপ রয়েছে, যা ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে।

এই উমাইয়া মসজিদের অভ্যন্তরে হজরত ইয়াহিয়া (আ.)-এর পবিত্র মাজার অবস্থিত বলে বিশ্বাস করেন মুসলিম ও খ্রিস্টান উভয় ধর্মের মানুষ।
অন্যদিকে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর ভবিষ্যৎবাণী অনুযায়ী, শেষ জামানায় হজরত ঈসা (আ.) দামেস্কের পূর্ব দিকের সাদা মিনারে অবতরণ করবেন।
ইসলামি বিশ্বাস ও ঐতিহ্য অনুযায়ী, উমাইয়া মসজিদের পূর্ব দিকের মিনারটিকে সাধারণত এই ভবিষ্যৎবাণীর স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
সূত্র: ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টার, ইনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা
এমএইচআর