আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০৪ জুন ২০২৬, ০১:০৯ পিএম
চলতি বছরের মে মাসে চীন সফর করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক সেরে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ক্ষয়িষ্ণু শক্তি’র তকমা দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং।
কখনও ‘ক্ষয়িষ্ণু শক্তি’। কখনও আবার ‘নির্জীব দৈত্য’। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক হওয়া পর্যন্ত এই চোখেই আমেরিকাকে দেখছেন চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) চেয়ারম্যান তথা দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং।
তার দাবি, অচিরেই সব দিক থেকে ওয়াশিংটনকে পিছনে ফেলবে বেইজিং। যদিও ‘দিল্লি বহু দূর’ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
কোনও দেশের শক্তির বিচারে মূলত দু’টি বিষয়কেই গুরুত্ব দিয়ে থাকে দুনিয়ার সব থিঙ্ক ট্যাঙ্ক। সেগুলি হলো- অর্থনীতি এবং সেনাবাহিনী। তথ্য বলছে, দু’টি ক্ষেত্রেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের থেকে পিছিয়ে আছে চীন।
শুধু তা-ই নয়, ওয়াশিংটনের পতন আসন্ন, এ কথা মানতেও নারাজ তারা। উল্টে আগামী চার থেকে পাঁচ দশক ‘সুপার পাওয়ার’ হিসাবেই আমেরিকা থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার বা আইএমএফের দেওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি আর্থিক বছরে (২০২৬-’২৭) মার্কিন অর্থনীতির আকার দাঁড়াবে প্রায় ৩২.৩৮ লাখ কোটি ডলার।
সেখানে ২০.৮৫ লাখ কোটি ডলারে পৌঁছোতে পারে চীনের অর্থনীতির সূচক। অর্থাৎ দুই দেশের বিনিময় হারের তুলনায় আমেরিকার অর্থনীতি এখনও প্রায় ১.৫৪ গুণ বড়।
নাগরিকদের ক্রয়ক্ষমতার নিরিখে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অবশ্য বেশ কিছুটা এগিয়ে আছে চীন। তবে এখনও সারা বিশ্বের মূল লেনদেনকারী মুদ্রাটি হল ডলার।
দীর্ঘ দিন ধরেই ডলারকে সরিয়ে নিজেদের মুদ্রা ইউয়ানকে তুলে ধরার চেষ্টা করছে বেইজিং। কিন্তু, ভারত বা অধিকাংশ ইউরোপীয় রাষ্ট্রের কাছে চীন তেমন বিশ্বাসযোগ্য নয়।
বিশ্লেষকদের দাবি, চীনা অর্থনীতির বেশ কিছু অদ্ভুত সমস্যা রয়েছে। সস্তা শ্রমিক সরবরাহের সুযোগ থাকায় বেইজিং মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় দেশগুলির বহুজাতিক সংস্থাগুলির পণ্য উৎপাদন করছে।
আগামী দিনে তারা ধীরে ধীরে ভারত বা অন্য কোনও রাষ্ট্রের দিকে মুখ ফেরালে বিপদে পড়বে চীন। ভূ-রাজনৈতিক কারণে সেটা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে।
উদাহরণ হিসাবে মার্কিন টেক জায়ান্ট অ্যাপলের কথা বলা যেতে পারে। এতদিন তাদের জনপ্রিয় পণ্য আইফোন কেবলমাত্র তৈরি হচ্ছিল চীনে।
কিন্তু, সম্প্রতি ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছে সেই ছবি। আইফোন নির্মাণের কাজে নেমেছে ভারতও। শুধু তা-ই নয়, গত জানুয়ারিতে মার্কিন বাজারে দিল্লির রফতানি করা আইফোনের সংখ্যা ছিল অনেকটাই বেশি।
আরও পড়ুন:
দ্বিতীয়ত, চীনের অর্থনীতি অনেকটাই দাঁড়িয়ে আছে বিরল খনিজের উপর। এই ধাতুগুলির উৎপাদন এবং পরিশোধন প্রক্রিয়ার উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বেইজিংয়ের। এই ছবি বদলাতে কোমর বেঁধে লেগে পড়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত এবং একাধিক ইউরোপীয় দেশ।
নতুন নতুন এলাকায় বিরল খনিজের সন্ধান চালাচ্ছে তারা। পাশাপাশি, পরিশোধনকেন্দ্র নির্মাণেও জোর দিচ্ছে সরকার।
তৃতীয়ত, টানা চার বছর ধরে হ্রাস পাচ্ছে চীনের জনসংখ্যা। ফলে ‘এক সন্তান নীতি’ পাল্টাতে বাধ্য হয়েছেন প্রেসিডেন্ট শি। তার প্রশাসনের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চীনে প্রতি ১,০০০ জনে জন্মহার দাঁড়িয়েছে ৫.৬৩ জন, যেটা ১৯৪৯ সালের পর সর্বনিম্ন।
অন্য দিকে বেইজিংয়ের মৃত্যুহার বেড়েছে প্রতি ১,০০০ জনে ৮.০৪, যা আবার ১৯৬৮ সালের পর সর্বোচ্চ।
২০২৫ সালের শেষে চীনের মোট জনসংখ্যা দাঁড়ায় ১৪০ কোটি। ওই সময় এর সূচক হ্রাস পেয়েছিল ৩৩.৯ লাখ। জাতিসংঘের দাবি, এই প্রবণতা বজায় থাকলে ২,১০০ সাল নাগাদ বর্তমানের অর্ধেক হয়ে যাবে চীনের লোকসংখ্যা।
সেটা অর্থনীতির উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ তাই সতর্ক করে বলছেন, ধনী হওয়ার আগেই বুড়ো হয়ে যাচ্ছে চীন।
অন্য দিকে অভিবাসন নীতির জন্য আমেরিকার জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম। মুক্ত গণতন্ত্রের দেশ হওয়ার কারণে গত শতাব্দী থেকেই বিশ্বের বহু মেধাবী থেকে শুরু করে ধনকুবের শিল্পপতিদের বুকে টেনে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ওয়াশিংটনের শ্রীবৃদ্ধিতে তাদের অবদান অপরিসীম। কিন্তু, কমিউনিস্ট শাসিত চীনে এই সুবিধা নেই। বিদেশিদের প্রবেশের ক্ষেত্রে কড়া নিষেধাজ্ঞা রয়েছে সেখানে।
২০২১ সালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে ব্রিটিশ থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর ইকোনমিক্স অ্যান্ড বিজ়নেস রিসার্চ’ (সিইবিআর) জানায়, ২০৩০ সালের মধ্যে আর্থিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাপিয়ে যাবে বেইজিং।
তখন বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে চীন। পরবর্তী কালে একই কথা বলতে শোনা যায় পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জাস্টিন ইফু লিনকেও।
কিন্তু, সম্পূর্ণ উল্টো কথা বলতে শোনা গিয়েছে লন্ডনের ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সকে। এই ব্রিটিশ থিঙ্ক ট্যাঙ্কটির দাবি, চীন কখনওই যুক্তরাষ্ট্রকে ছাপিয়ে যেতে পারবে না।
২০৬০-’৭০ সাল নাগাদ আর্থিক দিক থেকে আমেরিকার কাছাকাছি পৌঁছোতে পারে তারা। কারণ, বেইজিংয়ের নিজস্ব আবিষ্কার কিছু নেই। পাশাপাশি, হু-হু করে হ্রাস পাচ্ছে তাদের কর্মশক্তিও।
বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন সিঙ্গাপুরের সাবেক শীর্ষ কূটনীতিক কিশোর মাহবুবানি। তার কথায়, যারা ভাবছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়েছে, তাদের মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজন।
২০২০ সালে আমেরিকার মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপি ছিল ২১ লাখ কোটি ডলার। ওই সময় ১৫ লাখ কোটি ডলার ছিল চীনের জিডিপি। অর্থাৎ ছয় লাখ কোটি ডলারের ব্যবধান ছিল তাদের।
মাহবুবানি জানান, বর্তমান বৃদ্ধির সূচক বজায় থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির পরিমাণ দাঁড়াবে ৩৭.৬ লাখ কোটি ডলার। ওই সময় ২৬ লাখ কোটি ডলারে পৌঁছোতে পারে চীনা অর্থনীতি। অর্থাৎ ছয় লাখ কোটি থেকে ব্যবধান বেড়ে দাঁড়াবে ১১ লাখ কোটি ডলার। কারণ, অর্থনীতির বহু হিসাবই পরিবর্তিত ভূ-রাজনীতির উপর নির্ভরশীল।
সামরিক ক্ষেত্রেও ছবিটা প্রায় একই রকম। বর্তমানে প্রতিরক্ষা খাতে ৯০,০০০ কোটি ডলারের বেশি খরচ করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
চলতি অর্থবর্ষে (২০২৬-’২৭) সেটা বেড়ে ১.৫ লাখ কোটি ডলারে পৌঁছোবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সেখানে সামরিক খাতে ৩০,০০০ ডলার খরচ করছে চীন। তা ছাড়া অস্ত্র তৈরিতে এখনও পুরোপুরি স্বনির্ভর নয় বেইজিং।
-এমএমএস