আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০২ জুন ২০২৬, ০৪:৩৩ পিএম
আধুনিক ইরাকের পবিত্র নাজাফ শহরে অবস্থিত ‘ওয়াদি আস-সালাম’ হলো পৃথিবীর বৃহত্তম ও প্রাচীনতম কবরস্থান, যা বাংলায় ‘শান্তির উপত্যকা’ নামে পরিচিত। এ কবরস্থানকে ঘিরে মানুষের আগ্রহের কমতি নেই। মুসলিম ছাড়াও প্রতিবছর অন্য ধর্মাবলম্বী লাখ লাখ পর্যটকও আসেন জায়গাটি দেখতে। তবে এই কবরস্থানটির ঐতিহাসিক গুরুত্বও অনেক। এর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের কারণে ২০১১ সালে এটিকে বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে ইউনেস্কো।
বর্তমানে এই কবরস্থানটি প্রায় ১ হাজার ৪৮৫ দশমিক ৫ একর (৬০১ হেক্টর বা ৬ বর্গকিলোমিটার) জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। সপ্তম শতাব্দী থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত, দীর্ঘ ১৪শ বছরেরও বেশি সময় ধরে সেখানে প্রায় ৬০ লাখ মৃতদেহ সমাহিত আছে বলে বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়।
এদিকে শুধু বিশ্বের বৃহত্তম কবরস্থান হিসেবেই নয়, ধর্মীয় গুরুত্ব বিবেচনায়ও এটি মুসলিমদের কাছে, বিশেষ করে শিয়া মতাবলম্বীদের কাছে আকর্ষণীয় একটি স্থান। এখানেই ইসলামের চতুর্থ খলিফা, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর চাচাতো ভাই ও জামাতা ইমাম হযরত আলী (রা.) এবং ইমাম জাফর আল সাদিক (রা.)-এর মাজারও এ কবরস্থানের পাশেই অবস্থিত। এ ছাড়াও আল্লাহর নবী হযরত হুদ (আ.) এবং হযরত সালেহ (আ.)-এর কবর আছে বলে বিশ্বাস করা হয়।

অন্যদিকে ধর্মীয় বিবরণ ও ঐতিহাসিক জনশ্রুতি অনুযায়ী, হযরত ইবরাহিম (আ.) তার পুত্র হযরত ইসহাক (আ.)-কে সঙ্গে নিয়ে একবার ইরাকের নাজাফে (তৎকালীন নাম বানিমিয়া বা বানিচিয়া) এসেছিলেন। সে সময় এ অঞ্চলে নিয়মিত ভূমিকম্প হতো। কিন্তু ইবরাহিম (আ.) যতদিন এখানে অবস্থান করেছিলেন, ততদিন ছোটবড় কোনো ভূমিকম্প হয়নি। পরে এক রাতে ইবরাহিম (আ.) পাশের একটি গ্রামে গেলে সেদিনই নাজাফে ভূমিকম্প হয়।
তখন এলাকাবাসী ইবরাহিম (আ.)-কে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য অনুরোধ করেন। তাদের অনুরোধ রক্ষা করতে না পারলেও হযরত ইবরাহিম (আ.) স্থানীয় অধিবাসীদের কাছ থেকে সেখানে নিজের নামে এক টুকরো জমি ক্রয় করেন। সেই জমির টুকরোটিই বর্তমানে ওয়াদি আসসালাম কবরস্থান।
শিয়া মুসলিমদের বিশ্বাস ও ঐতিহ্য অনুযায়ী, জমিটি কেনার সময় হযরত ইবরাহিম (আ.) ভবিষ্যদ্বাণী করেন, এই স্থানে এক সময় একটি মাজার এবং কবরস্থান গড়ে উঠবে। সেই কবরস্থানে শায়িতদের মধ্যে ৭০ হাজার মানুষ বিনা হিসাবে বেহেশত লাভ করবেন।

স্থানীয় শিক্ষাবিদ হুসেইন আলী হায়দার বার্তা সংস্থা আনাদুলুকে জানান, এখানে হজরত আদম, নূহ, হুদ এবং সালেহ আলাইহিমুস সালামের মতো অনেক নবী এখানে শায়িত আছেন।
ওয়াদি আসসালাম কবরস্থানের প্রধান বিশেষত্ব হলো এটি দেখতে কোনো গোরস্থানের মতো নয়, বরং উপর থেকে একে মৃতদের এক বিশাল শহর বলে মনে হয়। হাজার বছর ধরে অপরিবর্তিত ধর্মীয় রীতি এবং অনন্য স্থাপত্যশৈলীর কারণে এটি পৃথিবীর অন্য সব কবরস্থান থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
ওয়াদি আসসালামের অধিকাংশ কবরই মূলত পোড়ামাটির ইটের তৈরি। অধিকাংশ কবরের ইটের ওপর প্লাস্টার করা এবং তার ওপর পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের ক্যালিগ্রাফি খোদাই করা। কবরগুলো বিভিন্ন আকার, আকৃতির এবং উচ্চতার। ব্যক্তিগত একক কবরের বাইরে কিছু আছে পারিবারিক সমাধিকক্ষ, যেগুলোর ওপর সাধারণত গম্বুজ থাকে।

ভূমির সংকুলান না হওয়ায় এখানে মাটির নিচে বিশেষ সুড়ঙ্গ এবং গোপন কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। সিঁড়ি দিয়ে নামা যায় এমন প্রতিটি ভূগর্ভস্থ সমাধিকক্ষে বা একই কবরে স্তরে স্তরে ৩০ থেকে ৫০টি পর্যন্ত মৃতদেহ দাফন করা যায়।
১৯৩০ এবং ১৯৪০-এর দশকে নির্মিত কবরগুলোর আবার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। সেগুলোর অধিকাংশ ৩ মিটার উঁচু এবং গোলাকার চূড়া বিশিষ্ট, যেন পাশের লোকালয়ের উঁচু ভবনগুলোর ছাদ থেকেও সেগুলোকে চিহ্নিত করা যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে নির্মিত কবরগুলোর নির্মাণশৈলীতে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। আগে যেখানে শুধু পোড়া ইট এবং প্লাস্টার ব্যবহার করা হতো, এখন সেখানে ইরান ও বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানিকৃত দামি মার্বেল পাথর এবং গ্রানাইটের ব্যবহার ব্যাপক বেড়েছে। এছাড়াও হাতে খোদাই করার বদলে এখন অত্যাধুনিক লেজার মেশিনের সাহায্যে পাথরের ওপর নিখুঁতভাবে কুরআনের আয়াত, মৃত ব্যক্তির নাম ও ছবি ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে।
শিয়া মুসলমানদের বিশ্বাস অনুযায়ী, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে কোনো বিশ্বাসী মারা গেলে তার আত্মাকে এই ওয়াদি আস-সালামে নিয়ে আসা হয়, কারণ তারা এটিকে জান্নাতের অংশ মনে করেন। এই বিশ্বাসের কারণে বিশ্বজুড়ে শিয়াদের কাছে এখানে সমাহিত হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকে। কিয়ামত পর্যন্ত কবরের আজাব থেকে রেহাই পাওয়ার উদ্দেশ্যে ইরাকের প্রায় ৯০ শতাংশ শিয়া মতাবলম্বীর কবর এখানে দেওয়া হয়েছে।
তবে কবরস্থানটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সেখানে ধনী-গরিব, রাজনৈতিক অথবা ধর্মীয় নেতাসহ সমাজের সব শ্রেণির লোকের কবর দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। এ ছাড়া ইরাকের বাইরের অনেক দেশ যেমন- ভারত, দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া, লেবাননসহ বেশকিছু দেশের লোকেদেরও কবর দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল।
তথ্যসূত্র: আনাদোলু, উইকিপিডিয়া
এমএইচআর