images

আন্তর্জাতিক

লেবাননের ৯০০ বছরের পুরোনো দুর্গ দখল করল ইসরায়েল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

০১ জুন ২০২৬, ০৩:৩৮ পিএম

দক্ষিণ লেবাননের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৯০০ বছরের প্রাচীন ‘বিউফোর্ট দুর্গ’ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। স্থানীয়ভাবে এটি ‘কালাত আল-শাকিফ’ নামেও পরিচিত। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ এই ঐতিহাসিক দুর্গটি দখলের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এই ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ইসরায়েলি সেনারা লিতানি নদীর মূল সীমারেখা পেরিয়ে লেবাননের ভূখণ্ডের আরো গভীরে অগ্রসর হচ্ছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং জার্মানি দখলদার ইসরায়েলের এই সর্বশেষ আগ্রাসনের সমালোচনা করেছে।

অন্যদিকে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) দক্ষিণ লেবাননের আরো বড় এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য সতর্ক করেছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোর মধ্যে এই নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো লেবাননের বাসিন্দাদের জাহরানি নদীর নিচের পুরো দক্ষিণ লেবানন ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিল ইসরায়েল।

আইডিএফের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ‘হিজবুল্লাহর সদস্য, স্থাপনা অথবা যুদ্ধের সরঞ্জামের কাছাকাছি থাকা যে কোনো ব্যক্তি নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন।

তিনি আরও জানান, ‘উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আইডিএফের স্থলসেনা এই অভিযানে অংশ নিয়েছে। যেটি বর্তমানে আরো নতুন নতুন এলাকায় সম্প্রসারিত হচ্ছে।’

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার রোববার ইউরোপীয় মিত্রদের সাথে যোগ দিয়ে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহকে এই ক্রমবর্ধমান সংঘাত বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স এ কুপার লিখেছেন, ‘লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসন বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা ও বাস্তুচ্যুত করেছে, অবকাঠামো ধ্বংস করেছে এবং কূটনীতির সুযোগ সংকুচিত করেছে। এটি অবশ্যই বন্ধ হতে হবে।’

তিনি আরেও লিখেছেন, ‘হিজবুল্লাহকেও অবশ্যই ইসরায়েলের ওপর হামলা বন্ধ করতে হবে এবং নিরস্ত্রীকরণ করতে হবে।’

এদিকে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দেশের দক্ষিণে ‘স্কর্চড-আর্থ পলিসি বা পোড়ামাটি নীতি এবং কালেকটিভ পানিশমেন্ট বা যৌথ শাস্তি’ দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন।

লেবাননের সঙে ঐতিহাসিক সম্পর্ক থাকা ফ্রান্সও ইসরায়েলি সামরিক অভিযান নিয়ে আলোচনার জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি জরুরি বৈঠক ডাকার অনুরোধ করেছে।

দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এক্স এ লিখেছেন, ‘এটা অত্যন্ত জরুরি যে, সবপক্ষের অস্ত্রগুলোই শান্ত হোক এবং চিরতরের জন্য। দক্ষিণ লেবাননে বর্তমানে যে বড় ধরনের আগ্রাসন চলছে, তার কোনো যৌক্তিকতা নেই।’

ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল ব্যারোট বলেছেন, ‘এই পরিস্থিতি ইসরায়েলের জন্য একটি বড় ভুল।’

জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াডেফুল বলেছেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দক্ষিণ লেবাননের আরো ভেতরে অগ্রসর হওয়া ‘গুরুতর উদ্বেগের কারণ। যে কোনো ধরনের আরো উত্তেজনা বৃদ্ধি এই পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করে তুলবে এবং লেবাননের ভেতরে নতুন করে বাস্তুচ্যুতির ঢেউ তৈরি করবে।’

image

প্রসঙ্গত, লিতানি উপত্যকার ওপর অবস্থিত বিউফোর্ট দুর্গটি প্রায় ৯০০ বছর আগে নির্মাণ করেছিল ক্রুসেডাররা। এরপর থেকেই এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে এই দূর্গ। ইসরায়েল সীমান্ত থেকে মাত্র ১৪ দশমিক পাঁচ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এটি।

৪৪ বছর আগে ১৯৮২ সালেও ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এই দূর্গটি দখল করেছিল। যে যুদ্ধ প্রথম লেবানন যুদ্ধ নামে পরিচিত। তবে ২০০০ সালে তারা যখন দক্ষিণ লেবাননে তাদের স্বঘোষিত বাফার জোন (নিরাপদ অঞ্চল) ছেড়ে চলে যায়, তখন তারা এই দূর্গ ছেড়ে চলে যায়।

লেবাননের মানুষের জন্য এটি হলো সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দখল হওয়া সর্বশেষ ঐতিহাসিক নিদর্শন, অন্যদিকে আরো উত্তরে অবস্থিত নাবাতিহ শহরটি ক্রমশ আইডিএফ এর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

এদিকে দূর্গটি দখলের পর রোববার এক বিবৃতিতে নেতানিয়াহু বলেন, ‘এটি ছিল আমাদের নীতির একটি নিষ্পত্তিমূলক স্টেজ বা ধাপ এবং নিষ্পত্তিমূলক পরিবর্তন। আমরা ভয়ের দেয়াল ভেঙে ফেলেছি। আমরা উদ্যোগ নিচ্ছি, আমরা সব ফ্রন্ট যেমন: সিরিয়া, গাজা এবং লেবাননে অভিযান চালাচ্ছি।’

তিনি আরও বলেন, তার লক্ষ্য হলো হিজবুল্লাহর নিয়ন্ত্রণে থাকা জায়গাগুলোর ওপর দখল আরো জোরদার করা এবং প্রসারিত করা। এর অংশ হিসেবে তিনি সেনাবাহিনীকে লেবাননের আরও গভীরে (জাহরানি নদীর দিকে) অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ ৪৪ বছর আগে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) এর বিরুদ্ধে যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেন, যেটি ছিল লেবাননের যুদ্ধের প্রথম যুদ্ধগুলোর একটি।

তিনি বলেন, গোলানি ব্রিগেড, যারা তখন এটি দখল করেছিল, তারা আবার ফিরে এসেছে এবং এই দূর্গের ওপর ইসরায়েলি পতাকা উত্তোলন করেছে। তাই, ইসরায়েলের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি কৌশলগত বিজয়ের পাশাপাশি অত্যন্ত প্রতীকী একটি বিজয়।

কাৎজ বলেন, এই দুর্গ এবং যে পাহাড়ের চূড়ায় এটি অবস্থিত তার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সীমান্তের ওপারে থাকা ইসরায়েলি জনবসতিগুলোকে রক্ষা করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

উল্লেখ্য, গত ২ মার্চ ইসরায়েলি এক হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর, পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে ইসরায়েলে রকেট হামলা চালায় হিজবুল্লাহ। ওই হামলার পাল্টা জবাবে ইসরায়েল পুরো লেবানন জুড়ে বিমান হামলা এবং স্থল হামলা শুরু করে। তখন থেকে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে লেবানন কর্তৃপক্ষ। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্ততায় যুদ্ধবিরতি হলেও এখনো হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল।

সূত্র: বিবিসি

এমএইচআর