আন্তর্জাতিক ডেস্ক
৩০ মে ২০২৬, ১০:১২ পিএম
প্রত্যন্ত মরুভূমিতে বিশাল এক সামরিক স্থাপনা গড়ে তুলেছে চীন। দেশটির পূর্ব শিনচিয়াং অঞ্চলের হামি পারমাণবিক সাইলো (ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণাগার) এলাকাকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই সামরিক কমপ্লেক্সটি বিস্তৃত। এই নতুন স্থাপনাগুলোর মাধ্যমে চীন তাদের পারমাণবিক অস্ত্রাগারকে আরও সুরক্ষিত ও গতিশীল করছে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে– এটি এমনভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে যাতে যুক্তরাষ্ট্র যদি চীনের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর প্রথম হামলা চালালেও যেন বেইজিংয়ের পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা বজায় থাকে। যদিও চীনের পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো শহরে আঘাত হানতে সক্ষম।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের পর্যালোচনা করা স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, চীন তার দীর্ঘ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষিত পারমাণবিক সাইলোগুলোর কাছাকাছি এলাকায় বিস্তৃত উৎক্ষেপণ প্যাড, বাঙ্কার এবং যোগাযোগ কেন্দ্রের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করছে।
স্যাটেলাইট ছবিগুলোতে দেখা গেছে, পারমাণবিক সাইলোর কাছেই ৮০টির বেশি উৎক্ষেপন কেন্দ্র ও অষ্টভুজাকৃতির তিনটি স্থাপনা তৈরি করেছে চীন। যা ভবিষ্যতে চলমান ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যান, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিংবা অন্য সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। পাশাপাশি
রয়টার্সের জন্য ছবিগুলো মূল্যায়নকারী তিনজন নিরাপত্তা বিশ্লেষকের মতে, এমন কিছু স্থাপনাও তৈরি হয়েছে, যা বৈদ্যুতি যুদ্ধ ব্যবস্থা, উপগ্রহ যোগাযোগ এবং সামরিক কমান্ড পরিচালনার কাজে ব্যবহৃত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তাদের মতে, এই নির্মাণকাজের পরিধি অত্যন্ত বড়। হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই পরিকাঠামো চিনের স্থলভিত্তিক পরমাণু শক্তিকে আরও সুরক্ষিত করার উদ্দেশ্যেই তৈরি হচ্ছে। এর ফলে দেশটির তথাকথিত ‘দ্বিতীয় আঘাত’ বা পাল্টা পরমাণু হামলার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে এটি তাইওয়ান ইস্যুসহ বিভিন্ন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীন উত্তেজনার মধ্যে ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক প্রতিযোগিতারও প্রতিফলন।

চীন দীর্ঘদিন ধরেই ‘প্রথমে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার না করা’ নীতির ওপর নিজেদের অবস্থান বজায় রেখেছে। অর্থাৎ যে কোনও সংঘাতে প্রথমে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করবে না বেইজিং। তবে পশ্চিমা কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের সংঘাত তৈরি হলে পরিস্থিতি ভিন্ন মোড় নিতে পারে।
চলতি মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছেন, তাইওয়ান প্রশ্নে দুই দেশের মতপার্থক্য ভুলভাবে সামলানো হলে তা বিপজ্জনক পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে।
এছাড়াও চীনের পারমাণবিক শক্তি বৃদ্ধি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সামরিক আধুনিকায়ন কর্মসূচির সবচেয়ে বেশি পর্যবেক্ষিত দিকগুলোর একটি। কারণ, অনেক বিদেশি কূটনীতিকের মতে, বেইজিং তার পারমাণবিক সক্ষমতা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা দেখায় না এবং এ বিষয়ে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগও সফল হয়নি।
মরুভূমিতে অষ্টভুজ স্থাপনা
নতুন এই সামরিক অবকাঠামোর কেন্দ্রে আছে পূর্ব শিনজিয়াংয়ে গত ছয় বছরে নির্মিত দুটি অষ্টভুজাকৃতির (অক্টাগন) স্থাপনা। দুটি স্থাপনাই হামি অঞ্চলের পারমাণবিক সাইলো ক্ষেত্রের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত, একটি প্রায় ১৪০ কিলোমিটার এবং অন্যটি প্রায় ২৩০ কিলোমিটার দূরে।
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, এই অষ্টভুজ স্থাপনাগুলোর মধ্যে সেনা সদস্যদের আবাসন ও বড় সামরিক যানবাহন রাখার সুবিধা রয়েছে। এর পাশে রয়েছে সাঁজোয়া বাঙ্কার, সুরক্ষিত অস্ত্র সংরক্ষণাগার, বিমানঘাঁটি এবং রেল সংযোগ, যা হামি সাইলো ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত।

ছবিতে আরও দেখা যায়, চলতি মাস এবং গত এপ্রিলে উত্তরাঞ্চলের অষ্টভুজ স্থাপনাটির আশপাশে বড় সামরিক যানবাহন নিয়ে মহড়া পরিচালিত হয়েছে। সাম্প্রতিক ছবিতে বড় বড় তাঁবু এবং মরুভূমির ভেতরে ছদ্মবেশী উৎক্ষেপণস্থলও দেখা যায়, যেগুলোর কিছুতে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি রয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
অষ্টভুজ স্থাপনাগুলোর অস্তিত্ব আগে থেকেই জানা ছিল। তবে রয়টার্সের নতুন বিশ্লেষণে প্রথমবার এত বড় উৎক্ষেপণ নেটওয়ার্ক, সাম্প্রতিক সামরিক তৎপরতা এবং সম্ভাব্য বৈদ্যুতিক যুদ্ধ পরিচালনা ব্যবস্থার ইঙ্গিত সামনে এসেছে।
পাঁচজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক একমত হয়েছেন, এই অবকাঠামো শুধু পরমাণু কর্মসূচির জন্য নয়, অন্যান্য সামরিক উদ্দেশ্যেও কাজে লাগতে পারে। তবে এখনও স্পষ্ট নয়, ঠিক কোন ধরনের অস্ত্র সেখানে মোতায়েন করা হবে কিংবা ওই কেন্দ্রগুলিতে চলমান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রাখা হবে কি না।
গত সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির ৮০তম বার্ষিকী উপলক্ষে বেইজিংয়ে আয়োজিত সামরিক কুচকাওয়াজে পিএলএ পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন বিভিন্ন অস্ত্র প্রদর্শন করে। এর মধ্যে সাইলোভিত্তিক এবং ট্রাকে বহনযোগ্য আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) ছিল।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগনের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, চীন অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে দ্রুতগতিতে তার পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতা প্রসারিত ও উন্নত করছে। উৎপাদনের গতি মন্থর হলেও দেশটি ২০৩০ সালের মধ্যে ১ হাজার পারমাণবিক ওয়ারহেড মোতায়েনের পথে রয়েছে। ডিসেম্বরের ওই প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছে যে, চীন তার তিনটি প্রধান সাইলো ফিল্ডে শতাধিক আইসিবিএম মোতায়েন করতে পারে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, চীনও তার হুওইয়ান-১ স্যাটেলাইট-ভিত্তিক আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাও শক্তিশালী করছে। পেন্টাগনের তথ্যমতে, এই ব্যবস্থাটি উৎক্ষেপণের ৯০ সেকেন্ডের মধ্যে ধেয়ে আসা একটি আইসিবিএম শনাক্ত করতে পারে এবং তিন থেকে চার মিনিটের মধ্যে কমান্ড সেন্টারে সতর্কবার্তা পাঠাতে পারে, যা আঘাত হানার আগেই চীনের নিজস্ব সাইলো-ভিত্তিক অস্ত্র নিক্ষেপের জন্য যথেষ্ট সময়।
চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বা স্যাটেলাইট চিত্রে উঠে আসা নতুন স্থাপনাগুলো সম্পর্কে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে কোনো মন্তব্য করেনি। একইভাবে গোয়েন্দা-সংক্রান্ত বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে পেন্টাগনও।
সূত্র: এনডিটিভি
এমএইচআর