আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৮ মে ২০২৬, ০২:০৬ এএম
সারা বিশ্বে এখন ঈদুল আজহার আনন্দ। সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশে বুধবার (২৭ মে) পালিত হয়েছে মুসলমানদের অন্যতম বড় এই উৎসব। রাত পোহালে বৃহস্পতিবার (২৮ মে) বাংলাদেশেও ঈদ। সারাদেশ ভাসবে আনন্দে। কিন্তু আনন্দের বদলে ভারতের মুসলিমদের মনে এখন শুধুই আতঙ্ক।
বুধবার (২৭ মে) সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ভারতের কয়েকটি রাজ্যে ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৮ মে) দেশটির অধিকাংশ রাজ্যে পালিত হওয়ার কথা এই ধর্মীয় উৎসব।
তবে কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন বলছে, ভারতে বিভিন্ন রাজ্যে ঈদগাহে বা খোলা জায়গায় নামাজের অনুমতি পাওয়া যাচ্ছে না। গত ঈদে খোলা মাঠে ঈদের নামাজ আদায় করতে গিয়ে পুলিশের ধাওয়া খেতে হয়েছিল তাদের। ফলে এবারের ঈদকে সামনে রেখে আতঙ্কে দেশটির মুসলিমরা।
আল জাজিরার প্রতিবেদন বলছে, ভারতের উত্তর প্রদেশের মিরাট জেলার মালিয়ানা গ্রামের একটি ছোট মসজিদে ঈদুল আজহার নামাজের প্রস্তুতি নিয়ে বৈঠক চলছে। তবে সেখানে উৎসবের আমেজের চেয়ে উদ্বেগই বেশি স্পষ্ট। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু কোরবানির পশু বা দান নয়; বরং রাস্তা, ব্যারিকেড, পুলিশি অনুমতি এবং কোথায় ও কীভাবে ঈদের নামাজ আদায় করা হবে— সেই প্রশ্ন।
দিল্লি থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরের এই গ্রামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্যরা মুসল্লিদের সতর্ক করে দিচ্ছেন— মসজিদের গেটের বাইরে জড়ো না হতে, ভিড় হলে পরবর্তী জামাতের জন্য অপেক্ষা করতে, কোনো ধরনের বিতর্কে না জড়াতে এবং উসকানিমূলক পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া না জানাতে।
উপস্থিত মুসল্লিদের কেউ কেউ মোবাইলে স্থানীয় পুলিশের পরামর্শসংবলিত বার্তা দেখছিলেন। সেখানে প্রকাশ্যে নামাজ না পড়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। অনেকে আবার উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছিলেন।
মালিয়ানা গ্রাম মুসলিমদের জন্য এক বেদনাদায়ক স্মৃতির জায়গা। ১৯৮৭ সালের মে মাসে সেখানে হিন্দু জনতা ও প্রাদেশিক আর্মড কনস্ট্যাবুলারির সদস্যদের হাতে ৭২ মুসলিম নিহত হন। দীর্ঘ ৩৬ বছরের বিচারপ্রক্রিয়ার পর ২০২৩ সালে প্রমাণের অভাবে অভিযুক্তদের খালাস দেয় আদালত। তবে এবারের উদ্বেগ সেই পুরনো ঘটনার কারণে নয়; বরং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঈদের নামাজকে ঘিরে বাড়তে থাকা বিধিনিষেধের কারণে।
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিভিন্ন ডানপন্থী হিন্দু সংগঠন প্রকাশ্যে মুসলিমদের নামাজের বিরোধিতা করে আসছে। তাদের দাবি, রাস্তা বা খোলা জায়গায় নামাজের কারণে যানজট ও নিরাপত্তা সমস্যা তৈরি হয়। বিভিন্ন সময় রাস্তা, পার্ক বা খালি জমিতে নামাজ আদায় বন্ধ করতে বাধা দেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খোলা স্থানে নামাজের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রেই প্রশাসন মুসলিমদের দেওয়া অনুমতিও বাতিল করেছে।
সম্প্রতি বিজেপির ঘনিষ্ঠ কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) সারাদেশে রাস্তার ওপর নামাজ নিষিদ্ধ করার দাবি জানায়। সংগঠনটির অভিযোগ, এটি মুসলিমদের ‘শক্তি প্রদর্শনের’ অংশ।
তবে মুসলিমদের বক্তব্য, বাস্তবতা ভিন্ন। জনবহুল এলাকায় অধিকাংশ মসজিদ বা ঈদগাহে একসঙ্গে সব মুসল্লির জায়গা হয় না। ফলে ঈদ বা জুমার সময় সাময়িকভাবে রাস্তার কিছু অংশ ব্যবহার করা ছাড়া বিকল্প থাকে না।
ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশে প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ মুসলিম বাস করেন। ২০১৭ সাল থেকে সেখানে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন যোগী আদিত্যনাথ, যিনি মুসলিমবিরোধী বক্তব্যের জন্য পরিচিত। তাঁর সরকারের আমলে রাস্তা ও খোলা জায়গায় মুসলিমদের নামাজ আদায়ের ওপর কঠোরতা বেড়েছে।
গত ১৮ মে যোগী আদিত্যনাথ বলেন, মুসলিমদের ‘শিফটে’ ঈদের নামাজ আদায় করা উচিত। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, ‘শান্তিপূর্ণভাবে মেনে নিলে ভালো, না মানলে অন্য পদ্ধতি নেওয়া হবে।’ এই ‘অন্য পদ্ধতি’ কী হতে পারে, সে বিষয়ে মুসলিমদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
মিরাটের এক মুসলিম বাসিন্দা জানান, গত বছর খোলা জায়গায় নামাজ পড়ার অভিযোগে অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। কোথাও কোথাও বাড়িঘর ভাঙার ঘটনাও ঘটে। এমনকি ড্রাইভিং লাইসেন্স ও পাসপোর্ট যাচাই আটকে দেওয়ার অভিযোগও ছিল। এসব কারণে মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি হয়েছে।
আলিগড় জেলার দোকানদার আরিফ মালিক বলেন, গত ঈদে তাদের এলাকার মুসল্লিরা কয়েক মিনিটের জন্য খোলা মাঠে নামাজ পড়লেও পরে পুলিশ তাদের ধাওয়া করে। এবার পরিবারগুলো মানুষকে ভিড় এড়িয়ে চলতে বলছে।
উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় এখন মসজিদ কমিটিগুলো ঈদের আয়োজন নতুনভাবে সাজাচ্ছে। কোথাও জামাত ছোট করা হচ্ছে, কোথাও মুসল্লিদের ছোট ছোট দলে আসতে বলা হচ্ছে। নামাজ শেষে দ্রুত সরে যাওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। স্বেচ্ছাসেবকদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যেন কেউ সাময়িকভাবেও রাস্তার ওপর চলে না যান।
মিরাটের মসজিদ কমিটির সদস্য মোহাম্মদ আরিফ বলেন, এখন মানুষের উদ্বেগ শুধু নামাজ কোথায় হবে তা নয়; বরং ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসেবে প্রকাশ্যে একত্র হওয়াকেই সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। এখন মানুষকে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে কোথায় জায়নামাজ বিছাবে, কীভাবে চলাফেরা করবে।
মিরাটের এক ব্যবসায়ী আরশাদ বলেন, আগে ঈদের সকাল আনন্দের ছিল। এখন আগের রাত থেকেই দুশ্চিন্তা শুরু হয়। মানুষ ভাবতে থাকে পুলিশ আসবে কি না, কেউ ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেবে কি না।
এই পরিস্থিতির মানসিক প্রভাবও বাড়ছে। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নোমান খান বলেন, অনেকে অপমানিত হওয়ার আশঙ্কায় থাকেন। শারীরিকভাবে কিছু না ঘটলেও ভিডিও ধারণ, অনলাইনে টার্গেট করা বা মিথ্যা অভিযোগের ভয় কাজ করে। অনেক পরিবার তরুণদের মসজিদের বাইরে দাঁড়াতেও নিরুৎসাহিত করছে।
পশ্চিম উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলার এক ইমাম বলেন, ঈদের প্রস্তুতির চেয়ে এখন বেশি সময় ব্যয় হচ্ছে বিধিনিষেধ এড়ানোর কৌশল নিয়ে। তার ভাষায়, ‘বিতর্ক এড়ানোই এখন প্রধান অগ্রাধিকার।’
লখনউর আরেক ইমাম বলেন, জায়গার অভাবে নামাজের সময় অল্প সময়ের জন্য রাস্তার কিছু অংশ ব্যবহার করা হতো, কিন্তু আগে এটি বড় কোনো সমস্যা হিসেবে দেখা হয়নি। এখন এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যেন মুসলিমরা ইচ্ছাকৃতভাবে জনপরিসর দখল করতে চাইছে।
ভারতের রাজধানী দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা মসজিদের বাইরের ময়দানে ঈদের জামাত। এখন আর এভাবে দিল্লিতে বাইরে নামাজ আদায়ের অনুমতি দেয় না হিন্দুত্ববাদী নরেন্দ্র মোদির সরকার।
এই উদ্বেগ শুধু উত্তর প্রদেশে সীমাবদ্ধ নয়। দিল্লি ও পশ্চিমবঙ্গসহ বিজেপিশাসিত অন্যান্য এলাকাতেও একই ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পুরনো দিল্লির ঐতিহাসিক জামে মসজিদের আশপাশের ব্যবসায়ীরাও বলছেন, এখন ঈদ এলেই নতুন নিয়ম নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। মানুষ শুধু শান্তিতে নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরতে চায়। কিন্তু এখন প্রত্যেক ঈদের সঙ্গে নতুন কোনো বিধিনিষেধের আশঙ্কা জড়িয়ে থাকে।
তবু ঈদের প্রস্তুতি থেমে নেই। রাত পর্যন্ত বাজারে ভিড়, দর্জিদের ব্যস্ততা, শিশুদের নতুন জুতা ও মিষ্টির আবদার— সবই চলছে আগের মতো। মসজিদে স্বেচ্ছাসেবকেরা কার্পেট পরিষ্কার করছেন, মুসল্লিদের জন্য পানির ব্যবস্থা করছেন। কিন্তু উৎসবের সেই পরিচিত পরিবেশের নিচে চাপা উদ্বেগ স্পষ্ট।
কোরবানিকেও এবার বাড়তি নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে। পশুর রক্ত বা বর্জ্য যেন রাস্তায় বা ড্রেনে না যায়, তা নিয়ে কড়া সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। নিয়ম ভাঙলে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও রয়েছে।
একই সময়ে টেলিভিশন বিতর্ক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুসলিম ধর্মীয় চর্চাকে কেন্দ্র করে বিদ্বেষমূলক প্রচার বাড়ছে। হিজাব, হালাল খাবার, আজানের লাউডস্পিকার— বিভিন্ন বিষয় ঘিরে ধারাবাহিক বিতর্ক মুসলিমদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।
উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদে ঈদের জামাতের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে ভারতীয় পুলিশ। নয়ডার সফটওয়্যার প্রকৌশলী ফাইজান আলি বলেন, ধীরে ধীরে এমন অনুভূতি তৈরি হয় যেন পরিচয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত সবকিছুই প্রশ্নবিদ্ধ। এমনকি নামাজ পড়ার আগেও এখন মানুষ দুবার ভাবছে।
ধর্ম ও জনপরিসর নিয়ে কাজ করা গবেষক নাদিম খান বলেন, একটি সম্প্রদায় যদি তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উপলক্ষে প্রকাশ্যে একত্র হতে ভয় পায়, তাহলে তা বোঝায় জনপরিসর কার জন্য এবং কে সেখানে নিজের উপস্থিতি বৈধ মনে করবে— সেই প্রশ্নে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে।
ভারত সরকারের দাবি, এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে জনশৃঙ্খলা ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণের জন্য। তবে সমালোচকরা বলছেন, একই সময়ে বড় হিন্দু ধর্মীয় শোভাযাত্রা ও উৎসবের জন্য প্রশাসনিক সহায়তা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও পুলিশি নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে। ফলে মুসলিমদের মধ্যে আইন প্রয়োগে বৈষম্যের ধারণা আরও জোরালো হচ্ছে।
দিল্লির এক আইনজীবী বলেন, সংবিধান জনশৃঙ্খলার শর্তে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। কিন্তু যদি একটি সম্প্রদায় ধারাবাহিকভাবে কঠোর নজরদারির মুখে পড়ে, আর অন্যরা প্রশাসনিক সহায়তা পায়, তাহলে আইনের দৃষ্টিতে সমতার প্রশ্ন উঠবেই।
এএইচ