images

আন্তর্জাতিক

গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলকে অস্ত্রের যোগান দেয় যুক্তরাষ্ট্র-ভারতসহ ৫১ দেশ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

২৩ মে ২০২৬, ১০:৩৪ পিএম

গাজা যুদ্ধ চলাকালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) গণহত্যার সতর্কবার্তা সত্ত্বেও বিশ্বের অন্তত ৫১টি দেশ ও স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল থেকে ইসরায়েলে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ অব্যাহত ছিল। কাতার-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক মাসব্যাপী অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

ইসরায়েলি কর কর্তৃপক্ষের (আইটিএ) আমদানি তথ্য, শুল্ক রেকর্ড ও তথ্য অধিকার আইনের আওতায় পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে ইউরোপ, এশিয়া, উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর সাথে যুক্ত সামরিক সরবরাহ শৃঙ্খলের খোঁজ পেয়েছে আল-জাজিরা। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এই সরবরাহ শৃঙ্খল সক্রিয় ছিল। এমনকি আইসিজের রায়ের পর অস্ত্র আমদানি আরও বৃদ্ধি পায়; যার মধ্যে বড় অংশই ছিল গোলাবারুদ শ্রেণির অস্ত্র। এই দুই বছরে ইসরায়েলে সামরিক-সম্পর্কিত ২,৬০৩টি চালান প্রবেশ করেছে।

আল-জাজিরার অনুসন্ধানে ইসরায়েলে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের শীর্ষ পাঁচটি উৎস দেশ শনাক্ত করা হয়েছে। এগুলো হলো: যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রোমানিয়া, তাইওয়ান এবং চেক প্রজাতন্ত্র। এর মধ্যে যৌথভাবে শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও রোমানিয়া থেকেই এসেছে প্রায় ৬৭ কোটি ৩৫ লাখ ডলার মূল্যের সামরিক সামগ্রী, যারমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র একাই মোট আমদানির ৪২ শতাংশের বেশি জুগিয়েছে। ভারত দ্বিতীয় স্থানে ২৬ শতাংশ। 

আলজাজিরার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এসব অস্ত্রের মধ্যে ৯১ শতাংশই আইসিজের রায়ের পর। অর্থাৎ গণহত্যার ঝুঁকির কথা জানার পরও অনেক দেশ শুধু নীরব থাকেনি, বরং সক্রিয়ভাবে সহায়তা করেছে।

অন্যদিকে অনেক দেশ জনসমক্ষে বা আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি কিংবা আংশিক স্থগিতাদেশ দিলেও, তাদের তৈরি সামরিক যন্ত্রাংশ বা সরঞ্জাম গোপন সরবরাহ শৃঙ্খলের মাধ্যমে ইসরায়েলে প্রবেশ সচল রেখেছিল। এরমধ্যে অন্যতম দেশ হলো চীন, তুরস্ক, ব্রাজিল। 

আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইসিজের রায় জানার পরও যেসব দেশ অস্ত্র সরবরাহ চালিয়ে গেছে, তারা গণহত্যায় সহযোগিতার দায় এড়াতে পারবে না। 

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের অধ্যাপক স্টিফেন হামফ্রেস এবং ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব ইংল্যান্ডের অধ্যাপক গেরহার্ড কেম্পের মতে, গণহত্যা প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু চূড়ান্ত রায়ের পর নয়, ঝুঁকি দেখামাত্রই শুরু হয়। 

কেম্প বলেন, গাজা এখনও একটি চলমান গণহত্যামূলক অভিযানের বিষয়বস্তু হয়ে রয়েছে। চলতি সামরিক অভিযান, বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা এবং এমন জীবনযাত্রা চাপিয়ে দেওয়া; যা কোনও গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ কিংবা আংশিকভাবে ধ্বংস করতে পারে—সেসবের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, সবচেয়ে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতিতেও এটি পরিবর্তন হয়নি। গণহত্যা কনভেনশনের আওতায়, রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব কেবল গণহত্যার শাস্তি দেওয়া নয়, বরং এটি প্রতিরোধ করাও। 

তিনি আরও বলেন, এই বাধ্যবাধকতা আদালতের চূড়ান্ত রায়ের মাধ্যমে নয়, বরং মারাত্মক ঝুঁকির কথা জানার পর থেকেই কার্যকর হয়। জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনও ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বলেছে যে ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালিয়েছে।

হামফ্রেস আল-জাজিরাকে বলেন, রায়ের আগেই প্রচুর প্রমাণ ছিল যে ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহকারী দেশগুলো যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধসহ আন্তর্জাতিক অপরাধে জড়িত থাকতে পারে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের গবেষক প্যাট্রিক উইলকেন বলেন, ইসরায়েল একা এত বড় মাপের বোমাবর্ষণ চালাতে পারত না। এর জন্য বৈশ্বিক অস্ত্র সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। আইসিজের রায়ের পরও যেসব দেশের সরকার ইসরায়েলকে অস্ত্র দেওয়া অব্যাহত রেখেছে, তারা গণহত্যায় সহযোগিতার জন্য দায়ী হতে পারে।

উল্লেখ্য, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলি হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত গাজা উপত্যকায় ৭২ হাজার ৭৮৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার ৭৭৯ জন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর সরাসরি সংঘাতের তীব্রতা কমলেও, এখনো উপত্যকায় ইসরায়েলের বিচ্ছিন্ন হামলায় হতাহতের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। 

সূত্র: আল জাজিরা 


এমএইআর