images

আন্তর্জাতিক

স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছেছে হান্টা ভাইরাস সংক্রমিত জাহাজ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

১০ মে ২০২৬, ০৫:২৭ পিএম

মারাত্মক হান্টাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে আক্রান্ত ক্রুজ জাহাজটি ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের টেনেরিফে অবস্থিত গ্রানাদিলা বন্দরে পৌঁছেছে এবং স্পেন যাত্রীদের নামানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। জাহাজটিতে হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। জাহাজে থাকা প্রায় ১৫০ জন আরোহীর বেশিরভাগকে সরিয়ে নিজ নিজ দেশে পাঠানো হবে।

ডাচ পতাকাবাহী এমভি হন্ডিয়াস রোববার ভোরে স্প্যানিশ বন্দরে পৌঁছায়। সামুদ্রিক ট্র্যাকিং সেবা ভেসেলফাইন্ডারের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটিকে সিভিল গার্ডের একটি জাহাজ এসকর্ট করে নিয়ে আসে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন জাহাজে হান্টাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর যাত্রীদের সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব স্পেনকে নিতে বললে, জাহাজটি বুধবার কেপ ভার্দের উপকূল থেকে টেনেরিফের উদ্দেশে যাত্রা করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, জাহাজে অন্তত আটজন অসুস্থ হয়েছেন, মৃতদের মধ্যে রয়েছেন এক ডাচ দম্পতি ও এক জার্মান নারী। এদের মধ্যে ছয়জনের শরীরে ভাইরাসটি নিশ্চিত হয়েছে এবং আরো দুইজন সন্দেহভাজন রয়েছেন।

পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে, আক্রান্তদের মধ্যে ‘অ্যান্ডিস ভাইরাস’ রয়েছে, যা ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে ছড়াতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বেড়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহামারি প্রস্তুতি ও প্রতিরোধ বিষয়ক পরিচালক মারিয়া ভ্যান কেরখোভে শনিবার বলেন, জাহাজে থাকা সবাইকে আমরা উচ্চ ঝুঁকির সংস্পর্শে রয়েছে বলে বিবেচনা করছি।

টেনেরিফে পৌঁছানোর আগে স্পেনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জাহাজটিতে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, জাহাজে উঠে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে, স্বাস্থ্যবিধি ও পরিবেশগত পরিস্থিতি সন্তোষজনক এবং কোনো ইঁদুরের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। ফলে ইঁদুরের মাধ্যমে সংক্রমণের সম্ভাবনা কম।

রোববার দুপুরের আগে স্প্যানিশ স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জাহাজে উঠে চূড়ান্ত পরীক্ষা চালান এবং যাত্রী সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করেন।

প্রথমে স্প্যানিশ নাগরিকদের একটি দল ছোট নৌকায় করে জাহাজ থেকে নামতে শুরু করে।

তাদের সামরিক বাসে করে বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হবে এবং সেখান থেকে সরকারি বিমানে মাদ্রিদে পাঠানো হবে, যেখানে তাদের হাসপাতালে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হবে।

এরপর ডাচ যাত্রীরা জাহাজ ত্যাগ করবেন এবং তাদের বিমানে জার্মানি, বেলজিয়াম ও গ্রিসের যাত্রীরাও থাকবেন বলে স্পেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মনিকা গার্সিয়া জানান।

তিনি আরো জানান, এরপর তুরস্ক, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের যাত্রীদের সরিয়ে নেওয়া হবে।

মনিকা গার্সিয়া বলেন, এই অভিযানের শেষ ফ্লাইটটি অস্ট্রেলিয়া থেকে আসছে… এটি সবচেয়ে জটিল ফ্লাইট এবং আগামীকাল বিকেলে পৌঁছানোর কথা। এই ফ্লাইটে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং অন্যান্য এশীয় দেশের ছয়জন যাত্রীকে সরিয়ে নেওয়া হবে।

জাহাজের ৩০ জন ক্রু সদস্য জাহাজেই থাকবেন এবং তারা নেদারল্যান্ডসে যাবেন, যেখানে জাহাজটি জীবাণুমুক্ত করা হবে।

‘আরেকটি কোভিড নয়’

হান্টাভাইরাস সাধারণত ইঁদুরের মাধ্যমে ছড়ায়, তবে বিরল ক্ষেত্রে এটি মানুষের মধ্যেও সংক্রমিত হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে, প্রতি বছর বিশ্বে ১০ হাজার থেকে ১ লাখ পর্যন্ত হান্টাভাইরাস সংক্রমণের ঘটনা ঘটে। আমেরিকা অঞ্চলে আর্জেন্টিনায় এ রোগের হার সবচেয়ে বেশি, যেখানে মৃত্যুহার প্রায় ৩২ শতাংশ, যা অন্যান্য ধরনের তুলনায় বেশি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম ঘেব্রেইসাস শনিবার সন্ধ্যায় জাহাজটির আগমন সমন্বয়ের জন্য স্পেনের স্বরাষ্ট্র, স্বাস্থ্য ও আঞ্চলিক নীতিমন্ত্রীর সঙ্গে টেনেরিফে পৌঁছান।

টেনেরিফের বাসিন্দাদের সংহতির জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, জাহাজটি থেকে তাদের ঝুঁকি কম।

তিনি খোলা চিঠিতে লেখেন, ‘আমি চাই আপনারা স্পষ্টভাবে শুনুন— এটি আরেকটি কোভিড নয়।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহামারি প্রস্তুতি ও প্রতিরোধ বিভাগের পরিচালক মারিয়া ভ্যান কেরখোভে বলেন, জাহাজের সবাইকে উচ্চ-ঝুঁকির সংস্পর্শে থাকা হিসেবে ধরা হলেও সাধারণ জনগণের জন্য ঝুঁকি কম।

গ্রানাদিলা দে আবোনা শহরে রোববার সকালে জীবনযাত্রা প্রায় স্বাভাবিক ছিল। কেউ সাঁতার কাটছিলেন, কেউ বাজারে কেনাকাটা করছিলেন, আবার কেউ ক্যাফেতে বসেছিলেন।

এক লটারি বিক্রেতা ডেভিড পারাদা বলেন, কিছুটা উদ্বেগ আছে, তবে মানুষকে খুব বেশি চিন্তিত মনে হচ্ছে না।

বিশ্বজুড়ে অনুসন্ধান ও নজরদারি

এমভি হন্ডিয়াস ১ এপ্রিল আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া থেকে কেপ ভার্দের উদ্দেশে আটলান্টিক পাড়ি দিতে যাত্রা শুরু করে।

আর্জেন্টিনার এক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানান, ভাইরাসটির ইনকিউবেশন পিরিয়ড বিবেচনায় ওই ডাচ ব্যক্তি উশুয়াইয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য।

বেলজিয়াম, ফ্রান্স, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও নেদারল্যান্ডস তাদের নাগরিকদের সরিয়ে নিতে বিমান পাঠিয়েছে।

তবে সব বিমান এখনো পৌঁছায়নি বলে জানিয়েছে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ কর্তৃপক্ষ।

এরই মধ্যে অনেক দেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জাহাজ থেকে আগে নামা যাত্রী এবং তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করছে।

ফ্রান্স সরকার পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে বলে জানিয়েছে।

ডাচ বিমান সংস্থা কেএলএম’র এক ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট, যিনি আক্রান্ত এক যাত্রীর সংস্পর্শে এসেছিলেন এবং পরে হালকা উপসর্গ দেখা দিয়েছিল, তার পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এসেছে।

এদিকে, ওই জাহাজের এক যাত্রীর স্ত্রী— যিনি প্রথম মৃত ব্যক্তির স্ত্রী— জোহানেসবার্গ থেকে নেদারল্যান্ডসগামী বিমানে উঠলেও উড্ডয়নের আগে তাকে নামিয়ে দেওয়া হয়। পরদিন তিনি হাসপাতালে মারা যান।

স্পেনের পূর্বাঞ্চলে বসবাসকারী এক নারী, যিনি ওই ফ্লাইটে ছিলেন এবং পরে উপসর্গ দেখা দেয়, তাকেও পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং তিনি হাসপাতালের আইসোলেশনে আছেন।

সিঙ্গাপুরের দুই বাসিন্দা, যারা ওই জাহাজে ছিলেন, তাদের ফল নেগেটিভ এলেও সতর্কতামূলক কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে।

ব্রিটিশ স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দক্ষিণ আটলান্টিকের ট্রিস্টান দা কুনহা দ্বীপে একজন সন্দেহভাজন রোগী পাওয়া গেছে। জাহাজটি ১৫ এপ্রিল সেখানে থেমেছিল।

সূত্র: আল জাজিরা

এফএ