আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০৮ মে ২০২৬, ১১:৪২ এএম
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলাকে ‘ছেলেখেলা’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ‘এরপরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এখনো বহাল তবিয়তেই আছে। তবে কে প্রথম গুলি ছুড়েছিল, তা স্পষ্ট নয়।’ সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ সামরিক কমান্ড খাতামুল আম্বিয়া অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র একটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার এবং হরমুজ প্রণালির দিকে অগ্রসর হওয়া আরেকটি জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। একই সঙ্গে উপকূলীয় কয়েকটি এলাকায় ‘আকাশপথে হামলা’ চালানো হয়েছে বলেও তারা দাবি করেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌবাহিনীর গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ারগুলোর ওপর ইরানের হামলার জবাবে তারা ‘আত্মরক্ষামূলক হামলা’ চালিয়েছে। এ বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করে ট্রাম্প বলেন, ‘আজ ইরান আমাদের সঙ্গে ছেলেখেলা করতে গিয়েছিল।’
এই উত্তেজনা এমন এক সময় বাড়ল, যখন মাত্র এক দিন আগেই ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া একটি প্রস্তাব তারা বিবেচনা করছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রথমে হরমুজ প্রণালিতে ‘বিস্ফোরণের’ খবর দেয়। সেখানে ‘শত্রুপক্ষের’ সঙ্গে ‘গুলিবিনিময়’ হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। একই সময়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, রাজধানী তেহরানেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
এর কিছুক্ষণ পর ইরানের সর্বোচ্চ সামরিক কমান্ডের এক বিবৃতিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ‘আকাশপথের হামলা’ বন্দর খামির, সিরিক এবং কেশম দ্বীপের উপকূলে আঘাত হেনেছে। বিবৃতিতে আরো বলা হয়, এর জবাবে তারা দ্রুত মার্কিন সামরিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে এবং ‘উল্লেখযোগ্য ক্ষতি’ করেছে। একই সঙ্গে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগও আনা হয় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম বলেছে, ইরানের হামলা ছিল ‘উসকানিবিহীন’। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সময় মার্কিন নৌবাহিনীর গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ারগুলোর দিকে ইরান ‘একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও ছোট নৌকা’ পাঠিয়েছিল।
সেন্টকম আরো জানায়, তারা ‘আসন্ন হুমকি ধ্বংস করেছে’ এবং মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলার জন্য দায়ী ইরানি সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। এর মধ্যে ছিল ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ স্থাপনা এবং গোয়েন্দা, নজরদারি ও রিকনাইস্যান্স নোড। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সেন্টকম উত্তেজনা বাড়াতে চায় না, তবে মার্কিন বাহিনীকে রক্ষা করতে তারা প্রস্তুত ও অবস্থান ধরে রেখেছে।’
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প দাবি করেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র একাধিক ছোট নৌকা ধ্বংস করেছে, যেগুলো অত্যন্ত সুন্দরভাবে সমুদ্রে ডুবে গেছে, যেন কবরের দিকে ঝরে পড়া প্রজাপতি।’
তিনি আরো বলেন, ‘ইরানি হামলাকারীদের ব্যাপক ক্ষতি করা হয়েছে।’
শান্তিচুক্তি নিয়ে ট্রাম্প আবারো হুঁশিয়ারি দেন। তিনি লেখেন, ‘আজ যেমন আমরা তাদের আবার থামিয়েছি, ভবিষ্যতেও তাদের আরো কঠোরভাবে, আরো সহিংসভাবে থামাব, যদি তারা দ্রুত চুক্তিতে সই না করে।’
এদিকে, একটি ইসরায়েলি সূত্র বিবিসিকে জানিয়েছে, সাম্প্রতিক হামলায় ‘ইসরায়েলের কোনো সম্পৃক্ততা নেই’। টানাপোড়েন বেড়েছে এমন সময়ে, যখন সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ট্রাম্প বারবার বলছিলেন যে ইরানের যুদ্ধ ‘খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাবে’।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছিল, হোয়াইট হাউস বিশ্বাস করে যে তারা ইরানের সঙ্গে ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এই সমঝোতা ভবিষ্যতের বিস্তারিত পারমাণবিক আলোচনার কাঠামো তৈরি করতে পারে।
বুধবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রস্তাবটি বিবেচনা করা হচ্ছে এবং পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তেহরান তাদের মতামত জানাবে।’
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেন, ‘ইরান এই যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী যুদ্ধসমাপ্তিতে রূপ দিতে চেষ্টা করছে।’ তবে ইরানের পার্লামেন্টের এক জ্যেষ্ঠ সদস্য ১৪ দফার সমঝোতা স্মারককে মার্কিন ‘ইচ্ছার তালিকা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই হুঁশিয়ারি দিয়েছে, শান্তিচুক্তির জন্য তাদের নিজ নিজ শর্ত পূরণ না হলে সহিংসতা আরো বাড়তে পারে। ৬ মে ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছিলেন, ‘যদি ইরান কোনো চুক্তিতে রাজি না হয়, তাহলে বোমাবর্ষণ শুরু হবে এবং তা আগের চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় ও তীব্রতায় হবে।’
এর কিছুক্ষণ পর ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, ‘ইরানের আঙুল ট্রিগারে রয়েছে।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি আত্মসমর্পণ না করে এবং প্রয়োজনীয় শর্ত মেনে না নেয়, তাহলে ইরান কঠোর ও অনুতাপজনক জবাব দেবে।’
এফএ