আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০৪ মে ২০২৬, ১১:০৭ পিএম
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে সেই ইঙ্গিত একেবারে স্পষ্ট। এর ফলে ১৫ বছর ধরে একটানা ক্ষমতায় থাকার পর তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনের অবসান হচ্ছে।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় রাত পৌনে ১০টা নাগাদ বেসরকারি ফলাফলে বিজেপি ১৬৭টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস বিজয়ী হয়েছে ৫৯টি আসনে। এছাড়াও কংগ্রেস আর সিপিআই (এম) বিজয়ী হয়েছে দুইটি করে আসনে। অন্যদিকে অল ইন্ডিয়া সেক্যুলার ফ্রন্ট বিজয়ী হয়েছে একটি আসনে। আর যে ৬১টি আসনে ফলাফল ঘোষণা এখনো বাকি রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে বিজেপি ৪১টি আর তৃণমূল কংগ্রেস ২০টি এগিয়ে রয়েছে।
এদিকে দলের ভরাডুবির পর নিজ আসন ভবানীপুরেও হেরে গেছেন রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সর্বশেষ ও ২০তম রাউন্ড গণনার শেষে ১৫ হাজার ১১৪ ভোটে মমতাকে পরাজিত করছেন বিজেপি নেতা শুভেন্দু।
সোমবার (৪ মে) সকালে ফলাফল ঘোষণা শুরুর পর সারাদিন সেখানে এগিয়ে ছিলেন মমতা। কিন্তু বিকেলের পর উত্তপ্ত পরিস্থিতি হলে সাময়িক সময়ের জন্য ভোট গণনা বন্ধ থাকে। এরপর আবার ফলাফল ঘোষণা শুরু হলে দেখা যায় মমতা পিছিয়ে গেছেন।
এরআগে ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম আসনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মাত্র ১ হাজার ৯৫৬ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন শুভেন্দু। তবে ভবানীপুর কেন্দ্র থেকে উপনির্বাচনে জিতে টানা তৃতীয়বারের মতো মুখ্যমন্ত্রী হন মমতা। নন্দ্রিগ্রাম আসনে এবারও জয় পেয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। অর্থাৎ নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর এই দুই বিধানসভা কেন্দ্রেই জয়ী হলেন শুভেন্দু।
অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকার পর বিজেপির বিরুদ্ধে ‘ভোট চুরির’ অভিযোগ তুলেছেন মমতা।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিজেপি ১০০টিরও বেশি আসন চুরি করেছে। বিজেপি জালিয়াতি করেছে। নির্বাচন কমিশন এখন বিজেপি কমিশনে পরিণত হয়েছে। আমরা বারবার এ নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছি। কিন্তু কেউ শোনেনি।’
মমতা আরও বলেন, ‘বিজেপির এই জয় অনৈতিক। প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যোগসাজশে নির্বাচন কমিশন যা করেছে তা পুরোপুরি অনৈতিক। তারা জোরপূর্বক এসআইআর পরিচালনা করেছে। তারা অত্যাচার চালিয়েছে। তারা কাউন্টিং এজেন্টদের গ্রেপ্তার করেছে। আমরা লড়াই চালিয়ে যাব।’
১৫ বছর ধরে একটানা ক্ষমতায় থাকার পর তৃণমূল কংগ্রেসের এই নির্বাচনী বিপর্যয়ের কারণ কী হতে পারে?— এ পর্যন্ত যে ফলাফল বিশ্লেষণ করে বিবিসি বাংলার শুভজ্যোতি ঘোষ এর পেছনে মূল পাঁচটি কারণকে চিহ্নিত করেছেন।
এক, পশ্চিমবঙ্গের নারী ভোটের (যা ৫০ শতাংশেরও বেশি) বেশিটাই যে এতকাল মমতা ব্যানার্জীর দল পেয়ে এসেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। লক্ষ্মীর ভান্ডার, কন্যাশ্রী বা ‘সবুজ সাথী’র (ছাত্রীদের মধ্যে সাইকেল বিতরণ) মতো প্রকল্প তৃণমূল সরকারকে নারী ভোটারদের কাছে তুমুল জনপ্রিয় করে তুলেছিল।
কিন্তু এবারে সেই ভোটব্যাঙ্কে অবধারিত ফাটল ধরেছে – যার একটা বড় কারণ হতে পারে নারী সুরক্ষার মতো ইস্যুতে তৃণমূল কংগ্রেসের চরম ব্যর্থতা। দু’বছর আগেকার আরজিকর আন্দোলন এবারের ভোটে অবশ্যই প্রভাব ফেলেছে – যার একটা বড় প্রমাণ পানিহাটির মতো তৃণমুলের শক্ত ঘাঁটিতেও আরজিকর নির্যাতিতার মা বিজেপি প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে এগিয়ে রয়েছেন।
দুই, এসআইআর বা ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের ফলে যে ৯০ লক্ষেরও বেশি নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাতে তৃণমূল কংগ্রেসই যে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তা এখন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। এই তালিকায় লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটার বাদ পড়েছেন সেটা যেমন ঠিক – কিন্তু বহু ভুয়া বা মৃত ভোটারেরও নাম যে বাদ পড়েছে তাতেও কোনো সন্দেহ নেই।
তিন, ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনে যে পরিমাণ দুর্নীতি, অপশাসন, দৈনন্দিন জীবনে কাটমানি ও ‘সিন্ডিকেট রাজে’র বাড়বাড়ন্ত এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগে উঠেছে, তা পশ্চিমবঙ্গে আর কোনো আমলে উঠেছে কি না সন্দেহ।
এবারেও এসআইআরের কারণে রাজ্য জুড়ে লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটারের যে অমানুষিক ভোগান্তি হয়েছে সেটাকে প্রচারের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জী, তার জন্য কোনো চেষ্টাই বাদ রাখেননি তিনি – কিন্তু দেখা গলে দুর্নীতি ও ব্যর্থতার অভিযোগকে ঢাকতে সেটা যথেষ্ঠ হল না।
চার, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন মমতা ব্যানার্জীর একটানা নির্বাচনী সাফল্যের পেছনে একটা বড় কারণ হল রাজ্যের মুসলিমদের প্রায় একচেটিয়া সমর্থন তিনি পেয়ে এসেছেন।
পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার মোটামুটি ৩০ শতাংশের কাছাকাছি মুসলিম – আর এর মধ্যে ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ ভোটই বরাবর তৃণমূল কংগ্রেস পেয়ে এসেছে। কিন্তু এবারে সেই প্রক্রিয়ার পাল্টা একটা হিন্দু ভোটের ‘কনসলিডেশন’ হয়েছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে – যার সুফল বিজেপি পেয়েছে, যে কারণে তারা মুসলিম-গরিষ্ঠ জেলা মালদা বা মুর্শিদাবাদেও বেশ কিছু আসন পেতে চলেছে।
পাঁচ, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাজ্যের শাসক দল ভোটের সময় কিছু বাড়তি সুবিধা পেয়েই থাকে – যেটা এবারে তৃণমূল কংগ্রেস পায়নি বলেলই চলে। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরের মুহূর্ত থেকেই জাতীয় নির্বাচন কমিশন রাজ্য প্রশাসনের হাত রাশে তুলে নিয়েছে, ঢালাওভাবে জেলা শাসক ও পুলিশ সুপারদের তারা বদলে দিয়েছে।
সেই সঙ্গে ভোটের বেশ ক’দিন আগে থেকেই রাজ্যে মোতায়েন করা হয়েছে ২ লক্ষ ৪০ হাজারের বেশি কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী – যে সংখ্যা ছিল অভূতপূর্ব। অনেকেই বলছেন, এই বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতির কারণেই ভোট এতো শান্তিপূর্ণ হয়েছে এবং মানুষ এতো নিশ্চিন্তে ও নিরুপদ্রবে ভোট দিতে পেরেছেন।
অন্যভাবে বললে, নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকাও তৃণমূল কংগ্রেসের বিপক্ষেই গেছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা, আনন্দবাজার
এমএইচআর