আন্তর্জাতিক ডেস্ক
৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৩৮ পিএম
বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর নদী তীরবর্তী অঞ্চলে কুমির এবং বিষধর সাপের মতো শিকারী প্রাণী ছাড়ার একটি বিতর্কিত পরিকল্পনা পেশ করেছেন ভারতীয় কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, সীমান্তের যেসব স্থানে বেড়া নির্মাণ করা কঠিন, সেখানে অবৈধ অভিবাসন এবং চোরাচালানের বিরুদ্ধে এটি প্রাকৃতিক প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করবে।
মূলত, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার (২৫৪৫ মাইল) দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। দীর্ঘ এই সীমান্তের কিছু অংশ নদী এবং জলাভূমিও মতো দুর্গম ভূখণ্ডের মধ্যে দিয়ে গেছে, যেখানে বেড়া দেওয়া অসম্ভব বলে জানিয়েছে নয়াদিল্লি।
গত ২৬ মার্চ একটি অভ্যন্তরীণ বিজ্ঞপ্তিতে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সীমান্তে টহলরত পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব সীমান্তের সদর দপ্তরের কর্মীদের ‘ঝুঁকিপূর্ণ নদীপথের ফাঁকগুলোতে কুমির এবং বিষধর সাপের সরীসৃপ মোতায়েনের সম্ভাব্যতা’ খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছে।
তবে ভারতের এ ধরণের পদক্ষেপ মানবাধিকার কর্মী ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিদ উভয়কেই উদ্বিগ্ন করেছে। কারণ এতে সীমান্তের উভয় পাশের স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রের জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছে।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় এবং মিজোরাম রাজ্যগুলির উপর দিয়ে বিস্তৃত। এই অঞ্চলগুলোতে পাহাড়, নদী এবং উপত্যকার মধ্য দিয়ে দুর্গম ও প্রতিকূল ভূখণ্ড রয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার সীমান্ত বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলেছে ভারত। কিন্তু অবশিষ্ট অংশে রয়েছে জলাভূমি ও নদী তীরবর্তী এলাকা, যার উভয় পাশে স্থানীয় জনগোষ্ঠী বসবাস করে।
সাম্প্রতিক এক বিজ্ঞপ্তিতে বিএসএফ তার ইউনিটগুলোকে সীমান্তবর্তী নদীপথের ফাঁকফোকরগুলো সরীসৃপের ব্যবহারের জন্য কতখানি উপযোগী তা ‘নিবিড়ভাবে’ খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছে। কর্মকর্তাদের এই নির্দেশ পাওয়ার পর ‘গৃহীত পদক্ষেপ’ জানানোরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই খবরটি প্রথম প্রকাশ করে ভারতের আঞ্চলিক প্রকাশনা ‘নর্থইস্ট নিউজ’।
এদিকে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত বছরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, প্রতিকূল ভূখণ্ড সত্ত্বেও বিএসএফ বাংলাদেশ থেকে অবৈধ সীমান্ত পারাপার এবং নথিবিহীন অভিবাসন রোধে নিষ্ঠার সঙ্গে তাদের দায়িত্ব পালন করেছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ‘নদী তীরবর্তী ও নিচু এলাকা, সীমান্তের নিকটবর্তী বসতি, বিচারাধীন ভূমি অধিগ্রহণ মামলা এবং সীমান্তবাসীর প্রতিবাদের মতো কিছু সমস্যাপূর্ণ এলাকার কারণে এই সীমান্তের নির্দিষ্ট কিছু অংশে বেড়া স্থাপনের কাজ ধীর হয়ে গেছে।’
এদিকে শরণার্থী ও অভিবাসীদের নিরুৎসাহিত করতে কুমিরের মতো বিপজ্জনক প্রাণী ব্যবহারের সম্ভাবনায় বিশ্লেষক ও আন্দোলনকর্মীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
উত্তর-পূর্ব ও পূর্ব ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলো নিয়ে গবেষণা করেন এমন একজন গবেষক অংশুমান চৌধুরী বলেন, “বিষয়টা যদি অশুভ ও বিপজ্জনক না হতো, তবে বেশ মজার হতো, এটা উদ্ভট, তাই না?”
তিনি যুক্তি দিয়েছেন, ‘একবার বিষধর সাপ ও কুমির ছেড়ে দিলে, তারা পার্থক্য করতে পারবে না কে বাংলাদেশি আর কে ভারতীয়।’
তিনি আরও বলেন, এটি নথিপত্রহীন অভিবাসীদের প্রতি চরম নিষ্ঠুরতা এবং অমানবিকীকরণ। মানুষের বিরুদ্ধে প্রকৃতি ও প্রাণীদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার এক সম্পূর্ণ নতুন পদ্ধতি। এটি এক নতুন ধরনের জৈব-রাজনৈতিক সহিংসতা।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতের হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার দীর্ঘদিন ধরে যুক্তি দিয়ে আসছে যে, নথিপত্রহীন অভিবাসীরা একটি হুমকি, কারণ তারা ভারতের জনসংখ্যার বিন্যাস পরিবর্তন করে দেয়।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, মোদি সরকার ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে দেশের পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাঙালি মুসলমানদের হয়রানি করতে এই ধরনের বক্তব্য ব্যবহার করেছে। যদিও ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের বিভাজন বাংলা অঞ্চলকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দেয়, কিন্তু সীমান্তের উভয় পারের মানুষেরা আজও একই সাংস্কৃতিক ও জাতিগত পরিচয়ে আবদ্ধ।
এদিকে সম্প্রতি বিএসএফের বন্দুকের নলের মুখে ভারতীয় মুসলিমদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা ব্যাপকহারে বেড়েছে।
মানবাধিকার কর্মী হর্ষ ম্যান্ডার বলেছেন, নথিবিহীন অভিবাসীর সংখ্যা বাড়লেও, ভারত বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে এবং বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাদের হস্তান্তর করার পরিবর্তে তাদের মোকাবিলায় ‘বিচারবহির্ভূত পদ্ধতি’ বেছে নিয়েছে।
এছাড়াও, আন্দোলনকর্মীরা বলছেন, ভারত সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে মুসলমানদের, অভিবাসীদের সঙ্গে এক করে দেখে তাদের প্রতি অন্যায় আচরণ করার জন্য এটিকে একটি অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে।
আল জাজিরাকে ম্যান্ডার বলেন, ‘যাকে তারা ‘বিতর্কিত নাগরিকত্ব’ বলে, সেই প্রশ্নে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি একাধারে নিষ্ঠুর এবং সংবিধান ও আন্তর্জাতিক নীতির লঙ্ঘন। মূলত তিনি সরকারের সেই অভিযানের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে অভিবাসীদের আটক করা হলেও বাস্তবে ভারতীয় মুসলিমদের সীমান্ত পার করে দিয়ে তাদের বাংলাদেশি হিসেবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ‘এই (মুসলিম ভারতীয়দের লক্ষ্যবস্তু করার) মাধ্যমে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে ক্রমাগত এই আতঙ্ক বজায় রাখা হয় যে, তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হতে পারে এবং তাদের রাষ্ট্রহীন করে দেওয়া হতে পারে। ’
যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রাণী সংরক্ষণ সংস্থা ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্টের ভারতীয় শাখার স্ট্র্যাটেজি ও যোগাযোগ বিভাগের প্রধান রথীন বর্মণ, সরকার যদি বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী নদী-জলাভূমিতে সাপ-কুমির ছাড়ে— তাহলে তা একই সঙ্গে এসব সরীসৃপের জীবন এবং সেসব এলাকার স্থানীয় বাস্তুসংস্থান গুরুতর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
আলজাজিরাকে রথীন বর্মণ বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণাঞ্চলে সুন্দরবনের নদী-খালগুলোতে এক প্রকার কুমির দেখা যায়, আসামের সংরক্ষিত জলাভূমিগুলোতেও মিঠা পানির কুমিরের একটি প্রজাতি রয়েছে। তবে এ দু’টি অঞ্চলই ভারত-বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে অনেক দূরে এবং এবং এসব কুমির সীমান্তবর্তী নদী-জলাভূমির পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত নয়। ফলে যদি এই পরিকল্পনা কার্যকর করা হয়— তাহলে প্রথম দিকেই এসব কুমির মারা পড়বে। বিষধর সাপের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।’
তিনি আরও বলেন, ‘আর যদি কোনো কারণে কিছু সাপ-কুমির বেঁচে যায়, তাহলে সেসব এলাকার স্বাভাবিক বাস্তুসংস্থানে গুরুতর বিশৃঙ্খলা ও ঝুঁকি সৃষ্টি হবে। অনেক প্রাণী হয়তো চিরতরে হারিয়ে যাবে।’
আন্তর্জাতিক সীমান্তে বেড়া দেওয়ার জন্য বিপজ্জনক প্রাণী ব্যবহারের কোনো আধুনিক নজির নেই। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে অভিবাসীদের নিরুৎসাহিত করার জন্য বিভিন্ন ধারণা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন, যার মধ্যে ছিল সাপ বা কুমির ভর্তি পরিখা তৈরি করা এবং মানুষের পায়ে গুলি করাও অর্ন্তভূক্ত ছিল বলে খবর প্রকাশ করেছিল বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম।
যদিও এই প্রতিবেদনগুলো অস্বীকার করে ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমি সীমান্ত সুরক্ষার ব্যাপারে কঠোর হতে পারি, কিন্তু এতটা কঠোর নই’, এবং এটিকে ‘ভুয়া খবর!’ বলে আখ্যা দেন।
সূত্র: আলজাজিরা
এমএইচআর