আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:২৩ পিএম
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী চালচিত্রে গত মাত্র সাত-আট বছরের মধ্যে একটি নীরব ও অভূতপূর্ব পরিবর্তন ঘটে গেছে। সেই পরিবর্তনটি আর কিছুই না, রাজ্যের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের ভার দলের নেতাদের হাত থেকে একেবারেই ছিটকে গেছে, পুরো জিনিসটা এখন পরিচালনা করছে দুটি তথাকথিত ‘বহিরাগত’ সংস্থা।
রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষেত্রে এই সংস্থাটি হলো ‘আই-প্যাক’ বা ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি। ৭ বছর আগে লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি রাজ্যে অভাবিত ভাল ফল করার প্রমাদ গুনেছিল তৃণমূল কংগ্রেস, এরপর নিজেদের দুর্গ সামলাতে ওই পরামর্শদাতা সংস্থাটিকে রাজ্যে ডেকে এনেছিলেন তৃণমূল নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
ভারতের সুপরিচিত নির্বাচনী স্ট্র্যাটেজিস্ট প্রশান্ত কিশোরের (যিনি নিজে এখন পুরনো পেশা ছেড়ে রাজনীতিবিদ) হাতে গড়া এই সংস্থাটির পরামর্শ মেনেই ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল বিপুল সাফল্য পেয়েছিল – এমন একটা ধারণা রাজনৈতিক মহলে বেশ গভীরভাবেই আছে।
এই ধারণা কতটা সত্যি, সেই আলোচনায় না গিয়েও বলা যায় জেলায় জেলায়, এমন কী গ্রামেগঞ্জেও তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক স্তরে এখন শেষ কথা দলের নেতারা বলেন না, বলেন আই-প্যাকের মাইনে করা পেশাদার কর্মীরা।
বস্তুত সংস্থাটি এখন আর ঠিক দলের পরামর্শদাতার ভূমিকায় নেই, তারাই স্ট্র্যাটেজি ঠিক করছেন এবং তারাই সেটা বাস্তবায়ন করাচ্ছেন। প্রার্থী বাছাই থেকে শুরু করে প্রচারের কায়দাকানুন, সবই স্থির হচ্ছে আই-প্যাকের ইশারায়।
উত্তরবঙ্গে দলের একজন এমএলএর কথায়, ‘আই-প্যাকের নির্দেশ ছাড়া তৃণমূলের ভেতরে এখন একটা গাছের পাতাও নড়ে না!’
গত জানুয়ারি মাসে কলকাতায় আই-প্যাকের সদর দফতরে ও সংস্থার কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টোরেটের তল্লাশির সময় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে তা ঠেকানোর জন্য ছুটে গিয়েছিলেন, যা থেকে বোঝা যায় দলের শীর্ষতম পর্যায়েও সংস্থাটির প্রভাব কতটা গভীর।
অন্যদিকে ভারতের কেন্দ্র সরকারে শাসক দল বিজেপি– নির্বাচনের সময় যারা পশ্চিমবঙ্গে স্থানীয় নেতাদের ওপর বিন্দুমাত্র ভরসা না রেখে ভোটের কৌশল স্থির করার মূল দায়িত্ব দিয়ে রেখেছে বাইরে থেকে আসা নেতাদের, যার প্রধান মুখ হলেন অমিত মালভিয়া।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির দায়িত্বপ্রাপ্ত অমিত মালভিয়া জাতীয় স্তরে দলের তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগেরও প্রধান, যে বিভাগটি লোকমুখে ‘আইটি সেল’ নামেই বেশি পরিচিত।
রাজনৈতিক ন্যারেটিভ তৈরি করা ও তার জন্য সফল প্রচার চালানোর ক্ষেত্রে এই আইটি সেলের সুনাম ও দুর্নামের পাল্লা দুটোই খুব ভারি, আর সেই আইটি সেলই এখন কলকাতার বুকে বসে প্রকারান্তরে বিজেপির হয়ে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী স্ট্র্যাটেজি তৈরি করে দিচ্ছে।
নরেন্দ্র মোদী রাজ্যে এসে ‘ঝালমুড়ি’ খাবেন নাকি গঙ্গায় নৌকাবিহার করবেন, অমিত শাহ পশ্চিমবঙ্গে প্রচারে এসে কবে কোথায় কী নিয়ে বলবেন, স্মৃতি ইরানিকে মাছ খাওয়া নিয়ে কী বলতে হবে বা যোগী আদিত্যনাথের সভায় কবে কোথায় বুলডোজার পাঠাতে হবে – এই সব ছোটবড় খুঁটিনাটি স্থির করে দিচ্ছে আইটি সেলের পেশাদার টিম, অমিত মালভিয়া নিজে যার তদারকি করছেন।
ফলে আই-প্যাক আর আইটি সেলের এই পাল্টাপাল্টি স্ট্র্যাটেজির লড়াইয়ে পশ্চিমবঙ্গে দুটো প্রধান দলের বড় বড় নেতারাও যেন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নেহাতই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছেন।
তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির এই সব বাঘা বাঘা নেতারা ভোটের লড়াইয়ে শুধু এই দুই সংস্থার নির্দেশ পালন করে যাচ্ছেন মাত্র। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে এই প্রবণতা একেবারেই হালের, এবং নজিরবিহীনও বটে।
কলকাতা শহরের পূর্বপ্রান্তে নিউটাউন রাজারহাট নামে যে আধুনিক সুবিন্যস্ত উপনগরী গড়ে উঠেছে, সেটাই এখন বিজেপির এই তথাকথিত আইটি সেলের অস্থায়ী ও অঘোষিত ঠিকানা।
নিউটাউনের দুটি পাঁচতারা হোটেল, দ্য ওয়েস্টিন আর নোভোটেলে বিজেপির নেতৃত্ব বিপুল সংখ্যক রুম বুক করে রেখেছেন, আর সেখানে ভিনরাজ্যের ছোট-বড়-মাঝারি নেতাদের নিত্য আনাগোনা লেগেই আছে গত প্রায় দু-আড়াই মাস ধরে।
আকাশচুম্বী দ্য ওয়েস্টিনের ৩০ তলায় একাধিক স্যুইট ভাড়া করে অমিত মালভিয়ার নেতৃত্বে ‘আইটি সেল’ তাদের কাজকর্ম পরিচালনা করে যাচ্ছে। মালভিয়া নিজেও মাসের পর মাস ধরে পড়ে আছেন এখানেই।
পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি আসনে বিজেপি প্রার্থীদের প্রচারে তারা কে কী বলবেন, কোথায় কোন তারকা ক্যম্পেনারকে পাঠাতে হবে, কোথায় উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী বা কোথায় মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রীকে পাঠালে সুবিধা হবে – সেগুলো সব ঠিক হচ্ছে এখান থেকেই।
যদিও মাঝে মাঝে ভুলচুকও যে হচ্ছে না তা নয়। যেমন কিছুদিন আগে হুগলীর একটি কেন্দ্রে প্রচারে পাঠানো হয়েছিল দলের ডাকসাইটে নেত্রী স্মৃতি ইরানিকে, কিন্তু স্থানীয় প্রার্থী তার বিন্দুবিসর্গও জানতেন না। ফলে স্মৃতি ইরানি নিজের কনভয় নিয়ে সেখানে পৌঁছে দেখেন জনসভায় কেউ কোথাও নেই! বাধ্য হয়ে ফিরে আসতে হয় সে দিন, দু'দিন পরে আবার একই কেন্দ্রে তার জনসভা আয়োজন করতে হয় সব প্রস্তুতি সেরে। তবে সবমিলিয়ে আইটি সেলের কুশলী পরিচালনায় গোটা রাজ্যে বিজেপির প্রচার অভিযান চলছে মসৃণ পেশাদারি দক্ষতাতেই।
দ্য ওয়েস্টিন থেকে অল্প দূরেই কলকাতায় বিজেপির আর একটি ঠিকানা নোভোটেল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ শহরে এলেই যে হোটেলে একবার ঢুকে ফ্রেশ হয়ে নিচ্ছেন। গত দু’মাসে বেশকয়েকবার কলকাতায় এসেছেন তিনি, প্রতিবারই ঢুঁ মেরেছেন বা রাতটা কাটিয়েছেন এই হোটেলে।
গত ১০ এপ্রিল এই হোটেলের ব্যাঙ্কোয়েট হল থেকেই অমিত শাহ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন বিজেপির নির্বাচনি ইশতেহার, দল যার নামকরণ করেছে ‘সঙ্কল্পপত্র’। সেই গোটা অনুষ্ঠানেও আইটি সেলের সিগনেচার ছিল স্পষ্ট।
এই সে দিনও নোভোটেলে কলকাতার সাংবাদিকদের সঙ্গে ‘প্রাতরাশ বৈঠক’ করলেন মহারাষ্ট্রের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফাডনবিশ, আর সেই অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণও পাঠাল – ঠিকই ধরেছেন আইটি সেল।
নোভোটেলের রিসেপশন লবি কেন্দ্রীয় বাহিনী আর পুলিশের উপস্থিতিতে সব সময় গিজগিজ করছে, আর তার মধ্যে অহরহ দেখা মিলছে বিজেপির ছোট-বড়-মাঝারি
নেতাদের।
এমনই একজন পরিচিত লোকসভা এমপি সেদিন জানালেন, ‘আসলে কী, রাজ্য সরকারের সঙ্গে আমাদের যা সম্পর্ক – কলকাতার অন্য কোনো জায়গায় কাজ করতে গেলে আমরা স্থানীয় প্রশাসনের কোনো সহযোগিতা পাব না।’ আর ঠিক সে কারণেই দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তথা আইটি সেল পাঁচতারা হোটেলের স্বাচ্ছন্দ্য আর স্বাধীন পরিবেশ থেকেই নির্বাচন পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যুক্তি দিচ্ছেন তিনি।
নিউটাউন উপ-নগরীর সীমা যেখানে কলকাতাকে ছুঁয়েছে, সেখান থেকে বড়জোর মাইলখানেক দূরেই শহরের তথ্যপ্রযুক্তি হাব ‘সেক্টর ফাইভ’। ঠিক সেখানেই মাছের সুবিশাল ভেড়ির ধারে ‘গোদরেজ ওয়াটারসাইড’ নামে একটি বহুতল ভবনে কলকাতায় আই-প্যাকের কার্যালয়।
গত জানুয়ারি মাসে যখন এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টোরেটের (ইডি) গোয়েন্দারা আই-প্যাকের কার্যালয়ে আর মধ্য কলকাতায় সংস্থার কর্ণধারের বাড়িতে একযোগে হানা দেন, তখন খবর পেয়ে এই ওয়াটারসাইড বিল্ডিং-এই ছুটে এসেছিলেন খোদ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
সঙ্গী আমলাদের নিয়ে কার্যালয়ের ভেতরে সটান ঢুকে পড়ে তিনি সে দিন একগাদা ফাইলপত্র হাতে নিয়ে ক্যামেরার সামনে দিয়েই গটগট করে বেরিয়ে এসেছিলেন, যে ঘটনা নিয়ে জলঘোলা কম হয়নি। মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় এজেন্সির কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে মামলাও হয়েছে, যা এখনো সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন।
কিন্তু আই-প্যাকের হাতেই যে আসলে তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী কৌশল রচনার প্রাণভোমরা, সেদিনের ঘটনা থেকে তা অনেকের কাছেই স্পষ্ট হয়ে গেছে। নাহলে কেনই বা মুখ্যমন্ত্রী নিজে সেখান থেকে কাগজপত্র তুলে আনতে ছুটে যাবেন!
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে দিল্লিতে আই-প্যাকের অন্যতম একজন প্রতিষ্ঠাতা আটক হয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে সংস্থার কর্মীরা ছুটিতে যাওয়ার নির্দেশ পেয়েছেন এবং ওয়াটারসাইড কার্যালয়ে তালা ঝুলেছে। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস দাবি করছে, আই-প্যাকের কাজকর্ম মোটেই থেমে যায়নি।
আসলে দলের বিভিন্ন স্তরের নেতারাই একান্ত আলোচনায় স্বীকার করছেন, এই বেসরকারি কনসালটেন্সি সংস্থাটি গত কয়েক বছর দলীয় সংগঠনের ভেতরে এমনভাবে শিকড় বিছিয়েছে যে আচমকা তাদের কজন কর্মী ছুটিতে গেলেও আই-প্যাকের পরিচালনায় ভোটের কাজ যেমন চলছিল, তেমনই চলবে।
তা ছাড়া গ্রামবাংলা বা মফস্বলের প্রতিটি কেন্দ্রেই প্রতিটি তৃণমূল প্রার্থীর সঙ্গে জেলা স্তরে প্রায় আঠার মতো সেঁটে আছেন আই-প্যাক কর্মীরা, যারা নির্বাচনী প্রচারণায় তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ মনিটর করছেন, নির্দেশনা দিচ্ছেন এবং ফিডব্যাক পাঠাচ্ছেন সরাসরি কলকাতায়।
উত্তরবঙ্গের একজন তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়ক (যিনি এবারেও লড়ছেন) বলছিলেন, ‘ওরা আসলে পুরো চিত্রনাট্যটা পাঠিয়ে দিচ্ছেন। আমাদের বেশি মাথা ঘামাতে হচ্ছে না, ওই স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী আমরা যা যা করার তাই করে যাচ্ছি শুধু!’
ভারতের রাজনীতিতে তরুণ প্রজন্মের বহু রাজনীতিবিদই আজকাল পেশাদার কনসালট্যান্টদের কাজে লাগান, তাদের পরামর্শ মেনেই প্রতিটি পদক্ষেপ নেন। কোথায় কোন ইস্যুতে বিবৃতি দেবেন, কী বলবেন, কাকে সাক্ষাৎকার দেবেন বা কাকে দেবেন না – সেগুলোও এরাই ঠিক করে দেন।
পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়র অঘোষিত রাজনৈতিক উত্তরসূরী যিনি, সেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়র ক্ষেত্রেও রাজ্যে ঠিক এই কাজটাই এখন করছে আই-প্যাক।
ঘটনাচক্রে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর এই অভিষেকই রাজ্যে আই-প্যাককে নিয়ে এসেছিলেন, যে সিদ্ধান্তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়র খুব একটা সায় ছিল না। কিন্তু পরে তিনিও মেনে নিয়েছেন আই-প্যাক তৃণমূল কংগ্রেসের ভাবমূর্তি ফেরাতে সাহায্য করেছে। বিশেষ করে ২০২১ সালের নির্বাচনে প্রশান্ত কিশোরের বেঁধে দেওয়া স্লোগান ‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’ দলকে দারুণ ডিভিডেন্ডও দিয়েছে, এটা পর্যবেক্ষকরাও স্বীকার করেন। বিবিসি বাংলা
এমএইচআর