আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৪০ পিএম
পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিতীয় দফার আলোচনার জন্য এখনো কোনো ইরানি প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা হয়নি বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইরনা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমে ইরানের প্রতিনিধি দলের ইসলামাবাদে রওনা হওয়া, পৌঁছানো বা সম্ভাব্য আগমনের তারিখ নিয়ে যেসব খবর প্রকাশ হয়েছে, সেগুলোকে ‘গুজব’ আখ্যা দিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।
মঙ্গলবার টেলিগ্রাম চ্যানেলে পোস্ট করা এক বার্তায় ইরনা জানিয়েছে, ‘এখন পর্যন্ত ইরান থেকে কোনো প্রতিনিধি দল ইসলামাবাদে যায়নি। না মূল বা উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল, না গৌণ বা ছোট দল, না প্রাথমিক কোনো দল, না পরবর্তী বা ফলোআপ কোনো দল সেখানে গেছে’।
ইরানে পার্লামেন্টের স্পিকার ও দেশটির প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের অবস্থানকে পুনর্ব্যক্ত করে পোস্টে আর বলা হয়, ‘হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে তেহরান কোনো আলোচনা গ্রহণ করবে না’।
এদিকে সম্ভাব্য এই উচ্চ-পর্যায়ের আলোচনা ঘিরে পাকিস্তানের ব্যাপক প্রস্তুতি সত্ত্বেও ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম পাকিস্তানে কোনো কূটনৈতিক প্রতিনিধিদল পাঠানোর কথা অস্বীকার সম্ভাব্য আলোচনা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এরমধ্যেই আগামীকাল বুধবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরনের মধ্যে ১৪ দিনের যুদ্ধ বিরতি শেষ হচ্ছে এবং এরআগে দুই পক্ষ যদি কেনো চুক্তি করতে না পারে, তাহলে আবারও যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে ইরানি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, যুদ্ধের অবসানের লক্ষ্যে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিতব্য শান্তি আলোচনার পরবর্তী পর্বে যোগ দেবে কি না, সে বিষয়ে তেহরান এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।
আর পাকিস্তানি কর্মকর্তারা বলেছেন, দুই পক্ষের প্রতিনিধিদলগুলো যদি আলোচনায় যোগ দেয়ও, তারা বুধবারের আগে পৌঁছাবে না। ফলে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার আগে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য হাতে মাত্র কয়েক ঘণ্টা সময় থাকবে।
অন্যদিকে, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমানে যে যুদ্ধবিরতি চলছে, নতুন করে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত না হলে তার মেয়াদ বৃদ্ধির সম্ভাবনা ‘খুবই কম’ বলে উল্লেখ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তিনি হুমকি দিয়েছেন, ইরান তার শর্ত মেনে না নিলে তিনি যুদ্ধ পুনরায় শুরু করবেন এবং দেশটির বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালাবেন, যা বুধবার সন্ধ্যা থেকেই শুরু হবে।
তবে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে চললেও তেহরানের অনাগ্রহ পুরো আলোচনা প্রক্রিয়াকে অনিশ্চয়তায় ফেলেছে।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উচ্চপর্যায়ের আলোচনা নতুন করে কূটনৈতিক গতি পেলেও মূল কয়েকটি ইস্যুতে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে। পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, এমনকি যুদ্ধ ক্ষতিপূরণ বিভিন্ন বিষয়ে উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফা আলোচনাকে ঘিরে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার ও ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে পাকিস্তান। এরই অংশ হিসেবে গতকাল সোমবার পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি ইসলামাবাদে মার্কিন এবং ইরানি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে পৃথকভাবে বৈঠক করেছেন।
দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ইসলামাবাদের ডিপ্লোম্যাটিক এনক্লেভে মার্কিন দূতাবাসে রাষ্ট্রদূত নাটালি বেকারের সঙ্গে সাক্ষাতকালে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আসন্ন দ্বিতীয় দফার আলোচনার নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে অবহিত করেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোগাদামের সঙ্গে দেখা করে ইসলামাবাদ আলোচনার দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রস্তুতি পর্যালোচনা করেছেন নকভী।
পাক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ইরান এই আলোচনায় অংশ নেওয়ার বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত না করলেও নকভি জানিয়েছেন, সব আয়োজন চূড়ান্ত এবং প্রতিনিধিদলের জন্য নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা” করা হয়েছে। বৈঠকে তিনি তার সাম্প্রতিক ইরান সফর সম্পর্কেও রাষ্ট্রদূতকে অবহিত করেন।
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো জরুরি।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মোগাদাম উত্তেজনা নিরসনে পাকিস্তানের ‘ইতিবাচক ও গঠনমূলক ভূমিকার’ প্রশংসা করেছেন।
এদিকে দুটি পাকিস্তানি সূত্রে বরাতে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক সংঘাত সত্ত্বেও ইরান ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা আলোচনায় অংশগ্রহণ করবে বলে জানা গেছে।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রথম দফার আলোচনায় অংশ নেওয়া ইরানের সংসদ স্পিকার বাঘের কালিবাফের নেতৃত্বে সেই একই প্রতিনিধিদল এবারও আসছে বলে আশা করা হচ্ছে, যেখানে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও রয়েছেন।
অপরদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে মার্কিন প্রতিনিধিদল- যেখানে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনারও থাকবেন, সোমবার গভীর রাতে বা মঙ্গলবার ভোরে ইসলামাবাদে পৌঁছাবেন। ভ্যান্স আলাদা বিমানেও আসতে পারেন বলে জানিয়েছে সূত্রগুলো।
একাধিক পাকিস্তানি সূত্র আনাদোলুকে জানিয়েছে, গত রোববার ও সোমবার ইসলামাবাদে অবতরণ করেছে অন্তত ৬টি মার্কিন বিমান। এসব বিমানে অগ্রিম প্রতিনিধিদল ও নিরাপত্তা কর্মী ছিলেন বলে জানা গেছে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে পিটিভি জানিয়েছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের আগমনকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যেই ইসলামাবাদের বিলাশবহুল সেরেনা হোটেল ও এর পাশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে সাধারণ মানুষ ও যানবাহন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গত ১১ এপ্রিল এই হোটেলেই প্রথম দফায় শান্তি আলোচনা হয়েছিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে। যদিও ওই আলোচনা সফল হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইসলামাবাদের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী শহর রাওয়ালপিন্ডিও নিরাপত্তা কড়াকড়ির আওতায় রয়েছে। দুই শহরেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে এবং আসন্ন উচ্চপর্যায়ের আলোচনা চলাকালীন শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হাজার হাজার নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।
এমএইচআর