images

আন্তর্জাতিক

ইরানের বন্দর অবরোধ প্রত্যাহারে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিচ্ছে সৌদি 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৪০ পিএম

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে কয়েক দশকের স্থিতাবস্থা ভেঙে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানি বন্দর অবরোধের পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলতে পারে বলে সতর্ক করেছে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্র সৌদি আরব।  

মার্কিন সংবাদ মাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, রিয়াদ ট্রাম্প প্রশাসনকে হরমুজ প্রণালির অবরোধ তুলে নিতে এবং আলোচনার টেবিলে ফিরে আসতে চাপ দিচ্ছে। 

আরব কর্মকর্তারাদের বরাতে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সৌদি আরব আশঙ্কা করছে, ইরানের বন্দরগুলো বন্ধ করে দেওয়ার ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ তেহরানকে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করতে এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ব্যাহত করতে প্ররোচিত করতে পারে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানের সমস্ত পণ্য চলাচল বা নির্গমনের উপর অবরোধ আরোপের মার্কিন সিদ্ধান্তের লক্ষ্য হলো ইরানের আগে থেকেই পঙ্গু হয়ে থাকা অর্থনীতির উপর চাপ বাড়ানো। কিন্তু সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে যে, ইরান এর প্রতিশোধ হিসেবে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম বাণিজ্যিক নৌপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে—যা লোহিত সাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ পথ এবং বর্তমানে সৌদি তেল রফতানির জন্য অপরিহার্য। 

সৌদি আরবের উদ্বেগ

৪০ দিনের যুদ্ধের পর তেহরান এখনো গুরুত্বপূর্ণ জলপথ অবরুদ্ধ করতে এবং অঞ্চলজুড়ে অত্যাবশ্যকীয় অবকাঠামোতে আঘাত হানতে তার সক্ষমতা ও ইচ্ছা উভয়ই প্রদর্শন করেছে। এতে এই অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য ঝুঁকির হিসাবকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করে দিয়েছে এবং দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদী তেল ও গ্যাস রফতানিকে বিপন্ন করেছে।

অন্যদিকে ইরানের হরমুজ প্রণালি অবরোধ অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরব মরুভূমির ওপর দিয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে বাব আল-মান্দেব দিয়ে লোহিত সাগরের মাধমে দৈনিক প্রায় ৭০ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করছে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিয়াদ উদ্বিগ্ন যে বাব আল-মান্দেব বন্ধ হয়ে গেলে এই সরবরাহ ঝুঁকির মুখে পড়বে। 

প্রসঙ্গত, ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের কাছে অবস্থিত এই সংকীর্ণ জলপথটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং সুয়েজ খালে নৌযানের চলাচল অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণও করে। বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় ১২ শতাংশই বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়, যা এটিকে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম নৌপথ করে তুলেছে। 

ইরানের আধা-সরকারি ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীও মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে চলমান লড়াইয়ে যোগ দেবে এবং তেহরানকে ইয়েমেনের কাছে আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত বাব আল-মান্দেব নিয়ন্ত্রণ নিতে সাহায্য করবে।

ওয়াশিংটনের একটি নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিউ আমেরিকার ফেলো এবং ইয়েমেন বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম ব্যারন ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেন, ‘যদি ইরান সত্যিই বাব আল-মানদেবকে বন্ধ করে দিতে চায়, তবে হুথিরাই তা করার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সহযোগী, এবং গাজা সংঘাতের প্রতি তাদের প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে যে, এটি করার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।’  

ইরানের বাব আল-মান্দেব সতর্কতা

ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধের কারণে দেশটি লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বন্ধ করে দিতে পারে।

রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি নিউজে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বলেছে, ‘যদি পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরে অবস্থিত ইরানের বন্দরগুলোর নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে, তাহলে সেখানকার কোনো বন্দরই নিরাপদ থাকবে না।’

এরআগে গত ৫ এপ্রিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক পোস্টে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা আলী আকবর ভেলায়তি বলেছেন, ‘তেহরান বাব আল-মানদেবকে ঠিক সেভাবেই দেখে, যেভাবে তারা হরমুজকে দেখে। আর হোয়াইট হাউস যদি তাদের এই নির্বোধ ভুলের পুনরাবৃত্তি করার কথা ভাবে, তবে তারা দ্রুতই বুঝতে পারবে যে একটিমাত্র সংকেতেই বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্যের প্রবাহ ব্যাহত করা সম্ভব।’

আইআরজিসির সূত্রের বরাতে তাসনিম নিউজ আরও জানিয়েছে, মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর বিপদ বাড়াতে এবং এই জলপথে একটি ‘বিশ্বাসযোগ্য হুমকি’ তৈরি করার জন্য দক্ষ ভূমিকা পালনে পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে হুথিরা। ইরান ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে সমর্থন ও অস্ত্র সরবরাহ করে, যারা গাজায় ইসরায়েলের বোমাবর্ষণের প্রতিশোধ হিসেবে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ আক্রমণ শুরু চালিয়ে আসছে। 

বিশ্লেষকরা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের জেরে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহনের সমুদ্র পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে ইরান, যা তেলের বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এবার বাব আল-মান্দেবে যেকোনো ধরনের অচলাবস্থা মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

সূত্র: এনডিটিভি

এমএইচআর