আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১১ এপ্রিল ২০২৬, ১১:১৭ এএম
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি এখনো স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরেনি। বৈশ্বিক তেল পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ এই সামুদ্রিক পথ দিয়ে পরিচালিত হয়। ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই প্রণালিটি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয় ইরান। এছাড়া দেশটি এই জলপথে মাইন স্থাপন করে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ফলে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হয়নি।
হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক হতে বাধা কোথায়?
গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরোয়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই জলপথ কার্যত অবরুদ্ধ করে রাখে তেহরান। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়।
হরমুজ খুলে না দিলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুতে বোমা হামলার হুমকি দিয়েছিলেন। তবে গত মঙ্গলবার রাতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি হওয়ার পর ট্রাম্প তার অবস্থান থেকে সরে আসেন।
যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে ইরান সীমিত পরিসরে বা নিয়ন্ত্রিতভাবে হরমুজ খুলে দেবে বলে আগেই জানিয়েছিল। সেই কথামতো দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি হওয়ার পর কিছু শর্ত অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি খুলতে রাজি হয় ইরান।
দেশটি জানায়, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হলেও অগণিত জাহাজকে এ পথে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে না। দিনে ১৫ টি জাহাজ এ পথ দিয়ে চলাচল করতে পারবে, এর বেশি নয়। এজন্য জাহাজগুলো টোল দিতে হবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, যুদ্ধবিরতির সময় জাহাজ চলাচল অবশ্যই ‘ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বয়’ এবং কারিগরি সীমাবদ্ধতা বিবেচনা সাপেক্ষে হতে হবে।
গত বুধবার ইরানের আইআরজিসি হরমুজ প্রণালির একটি নতুন মানচিত্র প্রকাশ করে। এই মানচিত্র অনুযায়ী, জাহাজগুলোকে ওমান উপকূলের কাছের ঐতিহ্যবাহী রুট ছেড়ে আরও উত্তর দিকে অর্থাৎ, ইরান উপকূলের কাছাকাছি দিয়ে চলতে হবে।
আইআরজিসি জানিয়েছে, প্রধান ট্রাফিক জোনে বিভিন্ন ধরনের জাহাজ বিধ্বংসী মাইন থাকার সম্ভাবনা থাকায় সব জাহাজকে নতুন এই মানচিত্র অনুসরণ করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, মাইন বিস্তারের কারণে সমুদ্রপথটি এখনো বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। কিছু মাইনের অবস্থান নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যায়নি, আবার সমুদ্রস্রোতের কারণে সেগুলো স্থানচ্যুত হতে পারে-এমন আশঙ্কাও রয়েছে। এ অবস্থায় সামান্য ভুলেও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ঝুঁকির কারণে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোও এখনো পূর্ণমাত্রায় কার্যক্রম শুরু করতে অনীহা প্রকাশ করছে।
সমুদ্র থেকে বিস্ফোরক মাইন সরানো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। এতে বিশেষায়িত প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল প্রয়োজন হয়, পাশাপাশি প্রতিটি ধাপে উচ্চ সতর্কতা বজায় রাখতে হয়।
ইরান এই ধরনের বৃহৎ পরিসরের অপসারণ কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করতে পারছে না বলেও জানা যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিরাপত্তা ঝুঁকি—ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র বা ছোট নৌযানের মাধ্যমে হামলার সম্ভাবনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
কূটনৈতিক টানাপোড়েন
হরমুজ প্রণালি নিয়ে এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, দ্রুত এবং সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এই জলপথ খুলে দিতে হবে।
অন্যদিকে ইরান বলছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিকভাবে পুরো প্রণালি স্বাভাবিক করা বাস্তবসম্মত নয়। বিষয়টি নিয়ে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বিভিন্ন আলোচনায় অবস্থান তুলে ধরছেন।
এ ছাড়া ইরান প্রণালি ব্যবহারের জন্য ট্রানজিট ফি আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে এবং বলছে, এটি একটি আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ, এখানে কোনো ধরনের টোল গ্রহণযোগ্য নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ বিষয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তার মতে, আন্তর্জাতিক জলপথে ফি আরোপ বৈশ্বিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং ইরান এই রুটকে রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালি এখনো পুরোপুরি সচল নয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে তেল ও গ্যাস সরবরাহে, যার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য ওঠানামা অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হলে এই অনিশ্চয়তা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও চাপ সৃষ্টি করবে।
এমআর