আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১০ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৩৭ পিএম
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় মাত্র ৪০ দিনে ব্যাপক অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত ক্ষতির মুখে পড়েছে ইরান। হামলায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ এবং বেসামরিক অবকাঠামোসহ শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিমানবন্দর ও সেতুসহ বহু স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে, যার প্রভাবে বিপুলসংখ্যক ইরানি তাদের চাকরি হারিয়েছেন।
ইসরায়েলের জেরুজালেম পোস্টের বরাতে সৌদি সংবাদমাধ্যম আল-আরাবিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সংঘাতে ইরানের মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪০ থেকে ১৪৫ বিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৮ লাখ কোটি টাকা)।

ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রধান পিরহোসেন কোলিভান্দ জানিয়েছেন, যুদ্ধে ১ লাখ ২৫ হাজার ৬৩০টির বেশি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ আবাসিক ইউনিট রয়েছে, যার কিছু সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে এবং কিছু আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ২৩ হাজার ৫০০ বাণিজ্যিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ভয়াবহ এই যুদ্ধে ইরানজুড়ে হাসপাতাল, ফার্মেসি, ল্যাবরেটরি, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং জরুরি বিভাগসহ ৩৩৯টি চিকিৎসা কেন্দ্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নির্মম হামলায় স্বাস্থ্য খাতের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে উল্লেখ করে কোলিভান্দ বলেন, মার্কিন-ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তেহরানের খাতাম হাসপাতালের পাশে অবস্থিত রেড ক্রিসেন্ট পুনর্বাসন কমপ্লেক্সটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাছাকাছি বেশ কয়েকটি স্থাপনাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইরানি রেড ক্রিসেন্ট প্রধান বলেন, শিক্ষা খাতে ক্ষতির পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। অন্তত ৩২টি বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রায় ৮৫৭টি স্কুল ও শিক্ষাকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়াও ২০টি রেড ক্রিসেন্ট স্থাপনাকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।
অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে কোলিভান্দ বলেন, পাঁচটি জ্বালানি সংরক্ষণাগারসহ প্রায় ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রধান প্রধান বিমানবন্দর এবং বেসামরিক বিমানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এছাড়াও, ত্রাণ কার্যক্রম চলাকালে ৪৯টি উদ্ধারকারী যান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ৪৩টি অ্যাম্বুলেন্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটি সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিধ্বস্ত হয়।
একই সময়ে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়, যার মধ্যে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ও উৎক্ষেপণের সাথে যুক্ত কয়েক ডজন কেন্দ্রও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার দাবি করেছেন, ক্ষেপণাস্ত্র, নৌ ও বিমান সক্ষমতার পাশাপাশি প্রতিরক্ষা শিল্প ভিত্তি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তেহরান একটি “প্রজন্মগত সামরিক পরাজয়ের” শিকার হয়েছে।

দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের একটি পর্যালোচনা এবং বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণের উদ্ধৃতি দিয়ে আল আরাবিয়া জানিয়েছে, মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার প্রথম চার সপ্তাহে ইরানের চারটি প্রধান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র—খোজির, পারচিন, হাকিমিয়েহ এবং শাহরুদ—এবং অন্তত ২৯টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি ইরানের মূল সামরিক কৌশলকে উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করে দেয়।
স্যাটেলাইট চিত্র এবং ইরানি সামরিক ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে দেখা গেছে, এই হামলায় ভূপৃষ্ঠের ওপরের উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস হয়েছে, ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডারে প্রবেশাধিকার সাময়িকভাবে সীমিত হয়েছে এবং ইরানের তাৎক্ষণিকভাবে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের ক্ষমতা থেমে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই ক্ষতির ফলে সম্ভবত স্থাপনাগুলো পুনর্নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত ইরানের স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের ক্ষমতা স্থগিত হয়ে গেছে।
সূত্র: আল-আরাবিয়া
এমএইচআর