images

আন্তর্জাতিক

ইরান যুদ্ধ: মধ্যপ্রাচ্যে বহুমুখী প্রভাব ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ

০৩ এপ্রিল ২০২৬, ১১:২৬ পিএম

ইরান এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সংঘাত কেবল সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নয়, এটি মধ্যপ্রাচ্যের গত কয়েক দশকের অর্থনৈতিক অর্জনকে ধূলিসাৎ করার পাশাপাশি বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে খাদের কিনারে ঠেলে দিচ্ছে। এই ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার আঁচ সরাসরি এসে পড়ছে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ওপর; বিশেষ করে রেমিট্যান্স প্রবাহ ও শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে।

অর্থনৈতিক মহাবিপর্যয়: ধূলিসাৎ হতে পারে বহু বছরের অর্জন

সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এমন এক যুদ্ধের অর্থনৈতিক মাসুল দিতে বাধ্য হচ্ছে, যা তারা শুরু করেনি। মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরানের পাল্টা হামলায় তাদের জ্বালানি অবকাঠামো, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, যার পরিমাণ ১২০ থেকে ১৯৪ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। 

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি- ইউএনডিপির সাম্প্রতিক প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই সংঘাতের ফলে আরব বিশ্বের সম্মিলিত জিডিপি ৩.৭ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। আর্থিক অংকে এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১২০ থেকে ১৯৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

যুদ্ধের ফলে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের কবলে পড়তে পারে এবং ৩৬ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারাতে পারে। এছাড়াও সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে মধ্যপ্রাচ্যের মানব উন্নয়ন সূচক (এইচডিআই) অন্তত এক বছর পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা গত কয়েক বছরের কঠোর শ্রমের ফসলকে নষ্ট করে দেবে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করেছে ইউএনডিপি।

চাপের মুখে বাংলাদেশের অর্থনীতি

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আমদানিনির্ভর জ্বালানি, প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল বৈদেশিক মুদ্রা এবং তৈরি পোশাক রফতানি—এই তিন প্রধান খাত এখন বড় ধরনের চাপে রয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণশক্তি হলো মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার। কিন্তু যুদ্ধের ডামাডোল এই ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে।

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট অভিবাসীদের বড় একটি অংশ জিসিসি দেশগুলোতে কর্মরত। তবে ভূ-রাজনৈতিক সংকটের সময় রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষাকে গৌণ করে ফেলে।  

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৪৬ শতাংশই আসে এই অঞ্চল থেকে। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে রেমিট্যান্স প্রবাহে ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে। 

অন্যদিকে যুদ্ধে প্রভাবে রফতানি আদেশ হ্রাস, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটার মতো বহুমুখী চাপের মুখে দাঁড়িয়ে আছে দেশের রফতানিমুখী শিল্প। 

রপ্তানিকারক ও অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির অস্থিরতা এবং শিপিং রুটে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের প্রধান রফতানি বাজারগুলোতে ভোক্তা চাহিদা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৩৫০ কোটি ডলার, যা গত বছরের তুলনায় কিছুটা কম। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে সামগ্রিক পণ্য রপ্তানিতেও কিছুটা নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

এদিকে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি থাকায় জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানি ব্যাহত হচ্ছে, যা দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস, দীর্ঘ ফিলিং স্টেশনে লাইন এবং ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের তৈরি পোশাক শিল্পসহ অন্যান্য উৎপাদনমুখী শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংকট থেকে উত্তরণ: বাংলাদেশের করণীয়

ইরান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যকে এক সর্বগ্রাসী সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে কোনো পক্ষই প্রকৃত বিজয়ী হবে না। গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অভিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন এখন এক সুতোয় ঝুলে আছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য এই সংকটকে কেবল হুমকি হিসেবে না দেখে, নতুন শ্রমবাজার ও আধুনিক অভিবাসন নীতি তৈরির সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করাই হবে সময়ের দাবি।

এই মহাসংকট বাংলাদেশের জন্য নতুন শ্রমবাজার ও টেকসই অভিবাসন নীতি পুনর্মূল্যায়নের তাগিদ দিচ্ছে। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের প্রথাগত বাজারের বাইরে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’, রাশিয়া, মধ্য এশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের উদীয়মান শ্রমবাজারে নজর দিতে হবে। এক্ষেত্রে রুশ, জার্মান বা জাপানি ভাষায় দক্ষ জনশক্তি তৈরি করলে বাজার পরিবর্তন সহজ হবে। পাশাপাশি ঘরে বসে আইটি ও ফ্রিল্যান্সিং সেবার মাধ্যমে ‘ভার্চুয়াল অভিবাসন’ উৎসাহিত করলে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

অন্যদিকে সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির চেষ্টা করছে। তবে পরিস্থিতি মোকাবেলায় দ্রুত এবং কার্যকর কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সংকটকালীন উদ্ধার ও আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া একটি ‘আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম’ বা আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

তথ্যসূত্র: ইউএনডিপি, ইপিবি, বিএমইটি ও বাংলাদেশ ব্যাংক পরিসংখ্যান


এমএইচআর