images

আন্তর্জাতিক

গৃহযুদ্ধের সূচনাকারী সামরিক নেতাই হচ্ছেন মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

০৩ এপ্রিল ২০২৬, ১০:২৮ এএম

মিয়ানমারে অং সান সূচির নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান করার মাত্র সাত দিন পর জেনারেল মিন অং লাইং প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে দেশটি এক বছরের মধ্যে বেসামরিক শাসনে ফিরে যাবে। দিনটি ছিল ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি।

কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে তার সময় লেগেছে পাঁচ বছর।

শুক্রবার (৩ এপ্রিল) নবনির্বাচিত সংসদ তাকে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নেবে। সংবিধান অনুযায়ী এই পদে বসার জন্য ইতোমধ্যেই তিনি সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।

তবে এটি কেবল নামমাত্র বেসামরিক শাসন। অভ্যুত্থানের পর প্রথমবারের মতো বসা সংসদ তার অনুগতদের দ্বারা পূর্ণ।

সশস্ত্র বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত এক-চতুর্থাংশ আসন এবং নির্বাচনের আগে সামরিক বাহিনীর নিজস্ব দল ইউএসডিপির সহায়তায় তাদের পক্ষে তৈরি পরিবেশে অবশিষ্ট আসনের প্রায় ৮০ শতাংশ জিতে নেওয়ায় ফলাফল মূলত পূর্বনির্ধারিত ছিল।

এটিকে নির্বাচনের চেয়ে বরং এক ধরনের অভিষেক বলা যায়।

নতুন সরকার গঠিত হলেও তাতেও সামরিক কর্মকর্তাদের প্রাধান্য থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্বে মিন অং লাইং-এর ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং কঠোরপন্থি ও নিষ্ঠুরতার জন্য পরিচিত জেনারেল ইয়ে উইন উ-এর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট।

তিনি একটি নতুন পরামর্শদাতা পরিষদও গঠন করেছেন। এই পরিষদের কাছে বেসামরিক ও সামরিক সব বিষয়ে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব প্রয়োগের ক্ষমতা থাকবে।

এক কথায়, সামরিক পোশাক খুললেও ক্ষমতা যেন কমে না, সে বিষয়ে সচেষ্ট ছিলেন মিন অং লাইং।

কিয়াও উইনের মতো তরুণ আন্দোলনকর্মীদের জন্য পরিবর্তনের আশা শেষ হয়ে গেছে। ছাত্রাবস্থায় ২০২২ সালের অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে এক বিক্ষোভে অংশ নেওয়ায় তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং জেলে পাঠানোর আগে এক সপ্তাহ ধরে নির্যাতন করা হয়। সম্প্রতি তিনি মুক্তি পেয়েছেন।

তিনি বলেন, লোহার রড দিয়ে তার পিঠে আঘাত করা হয়েছে, সিগারেটের ছ্যাঁকা লাগানো হয়েছে, ছুরি দিয়ে উরুতে আঘাত করা হয়েছে এবং যৌন নির্যাতন করা হয়েছে। তার ওপর নির্যাতন চললেও তারা কখনো স্পষ্ট জানায়নি যে কী শোনাতে চায়।

কিয়াও উইনের বিপ্লবের প্রতি অঙ্গীকার অপরিবর্তিত থাকলেও এখন মিয়ানমারের ভেতর থেকে তার কাজ করা সীমিত। তিনি দেশের বাইরে কাজ খোঁজার কথা ভাবছেন।

মিন অং লাইং-এর অভ্যুত্থানের পর পাঁচ বছর মিয়ানমারের জন্য বিপর্যয়কর ছিল।

২০২০ সালের নভেম্বরে নির্বাচনে অং সান সূচি এবং তার দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর যখন সংসদ তাদের আরও এক মেয়াদের অনুমোদন দিতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে ক্ষমতা দখল করা জনরোষ উসকে দেয়। মিন অং লাইং জনরোষ সামলাতে ব্যর্থ হন এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে গণবিক্ষোভের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার করেন।

এটি গৃহযুদ্ধের সূচনা করে, যা হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, লক্ষ লক্ষ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করেছে এবং দেশটির অর্থনীতি ধ্বংস করেছে।

সামরিক শাসন দেশের বিশাল এলাকা সশস্ত্র প্রতিরোধ বাহিনীর কাছে ছেড়ে দিয়েছে। এর জবাবে তারা বিরোধী পক্ষের নিয়ন্ত্রিত গ্রামগুলোতে নির্বিচার বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলা স্কুল, বাড়ি এবং হাসপাতাল ধ্বংস করেছে।

এটি মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের সামরিক কৌশল, যা "চার আঘাত" নামে পরিচিত। এর লক্ষ্য বিদ্রোহী গোষ্ঠী সমর্থনকারী সম্প্রদায়কে ধ্বংস করা। চীন ও রাশিয়ার সহায়তায় সামরিক বাহিনী গত দুই বছরে হারানো কিছু এলাকা পুনরুদ্ধার করেছে।

মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোয় জাঁকজমকপূর্ণ সামরিক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। অভ্যুত্থানের কারণে ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে সেখানে কোনো আত্মসমালোচনা বা অনুশোচনার ইঙ্গিত ছিল না। বরং পুরোনো, দ্বিধাহীন সামরিক হস্তক্ষেপের যুক্তি উচ্চারিত হয়।

তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর সাংবিধানিক ম্যান্ডেট রয়েছে যে তারা জাতীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করবে এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র টিকিয়ে রেখেছে। সামরিক শাসনের বিরোধীদের "সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী" হিসেবে আখ্যায়িত করে জানান, তাদের পেছনে "বিদেশি আগ্রাসী ও স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক সুবিধাবাদীরা" রয়েছে।

সশস্ত্র সংঘাত সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহকারী সংস্থা এসিএলইডি'র জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক সু মন বলেন, মিয়ানমারের সংঘাত অপরিবর্তিতই থাকবে। নতুন সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়ে উইন উ একজন অনুগত ব্যক্তি, যার পরিবার মিন অং লাইং-এর পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখে। প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো এখনও প্রায় ৯০টি শহরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। এর মানে হলো প্রতিরোধ-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় আরও বিমান ও ড্রোন হামলা এবং আরও ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম।

অভ্যুত্থানে উৎখাত হওয়া প্রশাসনের প্রতিনিধিত্বকারী ন্যাশনাল ইউনিটি গভার্নমেন্ট থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে পরিচালিত হচ্ছে। তারা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করছে না এবং নতুন সরকার, সংসদ ও নির্বাচনের পুরোপুরি অবৈধতা ঘোষণা করেছে। তারা রাজনীতি থেকে সেনাবাহিনী অপসারণ এবং নতুন ফেডারেল সংবিধান প্রণয়ের জন্য লড়াই চালিয়ে যাবে।

মুখপাত্র নে ফোন লাট বলেন, এটি সমঝোতার সময় নয়। সেনাবাহিনী আমাদের লক্ষ্য মেনে না নিলে আমাদের বিপ্লব চলবে। থেমে গেলে আগামী প্রজন্মের মানুষ আরও ভোগান্তিতে পড়বে।

মিন অং লাইং-এর অভ্যুত্থান অর্থনীতিতে মারাত্মক আঘাত হেনেছে। জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী, এক কোটি ৬০ লাখের বেশি মানুষ জরুরি সহায়তার প্রয়োজন। বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। মূল্যস্ফীতি জীবনযাত্রার মান ধ্বংস করেছে।

এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধজনিত জ্বালানি সংকট যুক্ত হয়েছে। মিয়ানমারের আমদানিকৃত ৯০ শতাংশ তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য প্রতিবেশী দেশ থেকে আসে। এখন রপ্তানি সীমিত, পেট্রোল ও ডিজেল রেশনিং করা হচ্ছে, এবং দাম আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

ইয়াঙ্গুনের শিল্প এলাকা লাইং থারইয়ারের মোটরবাইক ট্যাক্সিচালক টিন উ বলেন, এখন দিন-রাতের মতো পার্থক্য। ভাড়া ও খাবারের খরচ মেটানোর মতো আয় করা যাচ্ছে না। নতুন সরকারের ওপর আস্থা নেই, তাই নিজস্বভাবে চলতে হচ্ছে।

জ্বালানি সংকট ব্যবসার জন্য কঠিন, কারণ অনেক প্রতিষ্ঠান বিদ্যুতের জন্য জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল। ইয়াঙ্গুনে দিনের কয়েক ঘণ্টাই বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়।

মিয়ানমারের বহু বছর কারাগারে কাটানো রাজনৈতিক কর্মী মিয়া আয় এ সপ্তাহে একটি বিরল কণ্ঠ নিয়ে সামনে এসেছেন। তার যুক্তি, সংকট থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায় হলো সামরিক বাহিনী এবং বিরোধীদের মধ্যে সমঝোতা খোঁজা।

তিনি একটি নতুন কাউন্সিল গঠন করেছেন। সংলাপ আহ্বান এবং সব রাজনৈতিক বন্দির মুক্তি দাবি করে সবাইকে একত্রিত করার চেষ্টা করছেন।

তিনি বলেন, এই নির্বাচন কোনো সমাধান নয়। মিন অং লাইং জনগণের সঙ্গে খেলা খেলছেন। বর্তমান সংবিধান দিয়েও এগোতে পারব না। জনগণ ক্লান্ত, আর যদি কোনো পথ না খুঁজে পাই, দেশ ধসে পড়বে।

তার মতে, কারাবন্দি অং সান সূচি মুক্তি পেলে, ৮০ বছর বয়সেও তিনি সমঝোতা খুঁজতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। এ বছর কখনো এক সময় মিন অং লাইং তাকে মুক্তি দিতে পারেন।

তবে মিয়ানমারে শান্তির পথ থাকলেও তা অত্যন্ত সংকীর্ণ, এবং সামরিক শাসকরা আপাতত সেই পথে হাঁটতে আগ্রহী নয়।

সূত্র: বিবিসি

এআর