আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২৮ এএম
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষ্যাপাটে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির বিষয়ে যে দাবি করেছেন, তা আবারও নাকচ করে দিল ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সাফ জানালেন, এমন কোনো প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া হয়নি।
বুধবারই (১ এপ্রিল) ট্রুথ সোশালে দেওয়া এক বিবৃতিতে ট্রাম্প দাবি করেন, চলমান যুদ্ধ বন্ধে ‘ইরানের নতুন শাসনব্যবস্থার প্রেসিডেন্ট’ তার কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন।
যদিও ইরানের ওই শীর্ষ কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে তাকে বর্ণনা করেছেন ‘তার পূর্বসূরিদের তুলনায় অনেক কম উগ্র এবং অনেক বেশি বুদ্ধিমান’ হিসেবে।
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি যখন খোলা, অবাধ ও নিরাপদ হবে, তখন আমরা বিষয়টি বিবেচনা করব। তার আগে পর্যন্ত আমরা ইরানকে ভুলিয়ে দেওয়ার মতো করে ধ্বংস করে দিচ্ছি, অথবা যেমন বলা হয়, পাথর যুগে ফিরিয়ে দিচ্ছি!!’
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন দাবির পরপরই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ‘দেশটির পক্ষ থেকে কোনো যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেওয়াই হয়নি।’
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার কেন্দ্র আইআরআইবির বরাতে আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রচারিত পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনাকে ‘মিডিয়ার কল্পনা’ বলে উল্লেখ করেছেন আরাগচি।
তিনি বলেন, ‘চলমান সংঘাত তখনই থামবে, যখন আগ্রাসী পক্ষকে শাস্তি দেওয়া হবে এবং ইরানকে পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।’
এর আগেও একাধিকবার ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান তার কাছে যুদ্ধ বন্ধের জন্য অনুরোধ জানিয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি উড়িয়ে দিয়েছে তেহরান। বরং ইরান বারবার বলছে, অন্তত ছয় মাসের একটি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে তারা।
এদিকে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ বলছে, চলমান ইরান যুদ্ধ ঘিরে ক্রমেই অনিশ্চয়তার দিকে যাচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতি। এই যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ইতোমধ্যেই তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন বলেও বলা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংঘাত দীর্ঘ হলে শুধু জ্বালানি সংকটই নয়, বড় অর্থনীতির দেশগুলোও মুদ্রাস্ফীতিসহ মন্দার মুখে পড়তে পারে। এমনকি যুদ্ধ শেষ হলেও প্রভাব কাটতে লাগতে পারে অনেক সময়।
এছাড়া ‘ইরান যুদ্ধের পরিস্থিতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে’— এমন আশঙ্কার মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার দিকে ধাবিত হতে পারে বলে সতর্ক করেছে লন্ডনভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যাংক পিল হান্ট।
অন্যদিকে দ্য টেলিগ্রাফকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরান যুদ্ধে যোগ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় তিনি পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার বিষয় চিন্তা-ভাবনা করছেন।
সাক্ষাৎকারে পশ্চিমা ওই সামরিক জোটকে ‘কাগুজে বাঘ’ হিসেবে অভিহিত করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, প্রতিরক্ষা চুক্তি থেকে আমেরিকাকে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি এখন পুনর্বিবেচনায় রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর যে দাবি ট্রাম্প করেছিলেন, তা মিত্র দেশগুলো প্রত্যাখ্যান করার পর ইউরোপকে আর নির্ভরযোগ্য প্রতিরক্ষা অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে না যুক্তরাষ্ট্র- এমনটাই জানান ট্রাম্প।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে একযোগে হামলা চালাচ্ছে দখলদার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। এরইমধ্যে তারা দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ শীর্ষ অনেক কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে। প্রাণ হারিয়েছে অনেক বেসামরিক মানুষও। ধ্বংস হয়ে গেছে বহু স্থাপনা।
তবে পাল্টা জবাব দিয়ে চলেছে ইরানও। গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে তারা, যেখান দিয়ে একটা উল্লেখযোগ্য হারে জ্বালানি তেল বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হয়। ফলে বিশ্বের জ্বালানি তেলের বাজারে চলছে চরম অস্থিরতা।
এছাড়া ইসরায়েলে স্মরণকালের ভয়াবহ হামলা করেছে ইরান। ধ্বংস করে দিয়েছে দেশটির অসংখ্য স্থাপনা। ভেঙে দিয়েছে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ইরান হামলা চলমান রেখেছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতেও।
সর্বোপরি চলমান এই যুদ্ধে খুব একটা স্বস্তিতে নেই ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র।
তারই মধ্যে গত কয়েকদিন ধরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অপসারণ এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে আন্দোলন করছেন হাজার হাজার মার্কিনি। এই ঘটনা আরও বেশি অস্বস্তিতে ফেলেছে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্টকে।
এএইচ