images

আন্তর্জাতিক

খারগ দ্বীপ কোথায়, কেন এই দ্বীপ এত গুরুত্বপূর্ণ?

ঢাকা মেইল ডেস্ক

৩০ মার্চ ২০২৬, ০১:১১ পিএম

পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশির ওপর ভাসমান ছোট্ট এক টুকরো ভূমি, যা বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতির ভাগ্য নির্ধারণ করছে। নাম তার খারগ দ্বীপ। গত কয়েক সপ্তাহে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনার জেরে এই প্রবাল দ্বীপটি এখন আন্তর্জাতিক সংবাদ শিরোনামের শীর্ষে।

কোথায় এই দ্বীপ

ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে বুশেহর প্রদেশ-এর অন্তর্গত খারগ দ্বীপ মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। আকারে ছোট হলেও এর কৌশলগত অবস্থান একে বিশ্ব জ্বালানি মানচিত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। 

খারগ দ্বীপের অবস্থান হরমুজ প্রণালি-এর কাছাকাছি হওয়ায় এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের তেল পরিবহন হয়। ফলে এ অঞ্চলে যেকোনো উত্তেজনা বা সংঘাতের প্রভাব সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে পড়ে।

দ্বীপটি তার তেল স্থাপনা ছাড়াও সেখানে অবাধে বিচরণকারী বিপুল সংখ্যক হরিণের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।

অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’ যখন রণক্ষেত্র

ইরানের মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ৯২ শতাংশই সম্পন্ন হয় এই দ্বীপের টার্মিনালগুলো দিয়ে। প্রতিদিন প্রায় ১৬ থেকে ২০ লাখ ব্যারেল তেল এখান থেকে বিশ্ববাজারে যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাতের জেরে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ এখন হুমকির মুখে। গত ১৩ মার্চ মার্কিন বিমান বাহিনী দ্বীপটির ৯টি সামরিক স্থাপনায় বড় ধরনের হামলা চালায়, যার লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নৌ-প্রতিরক্ষাকে দুর্বল করা।

চলতি মাসের মাঝামাঝিতে মার্কিন হামলায় দ্বীপের জোশান নৌ-ঘাঁটি এবং হেলিকপ্টার হ্যাঙ্গার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, তেলের মূল অবকাঠামো এখনো অক্ষত রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে খারগ দ্বীপটি সামরিকভাবে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী করার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

5

ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, খারগ দ্বীপের তেল অবকাঠামোতে সামান্যতম আঘাত এলেও তারা পুরো পারস্য উপসাগর জুড়ে পাল্টা আঘাত হানবে। দ্বীপটিতে বর্তমানে হাজার হাজার তেল শ্রমিক এবং সামরিক কর্মী সতর্ক অবস্থায় রয়েছেন।

কেন খারগ দ্বীপ এত গুরুত্বপূর্ণ?

বিশেষজ্ঞদের মতে, খারগ দ্বীপ কেবল একটি বন্দর নয়, এটি ইরানের টিকে থাকার রসদ। দ্বীপের চারপাশের সমুদ্র অত্যন্ত গভীর হওয়ায় এখানে বিশ্বের বৃহত্তম তেলবাহী ট্যাঙ্কার বা ভিএলসিসি (VLCC) অনায়াসেই নোঙর করতে পারে। মূল ভূখণ্ডের বন্দরগুলো এই সুবিধার অভাবে খারগের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল।

যুদ্ধের ডামাডোলে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে দ্বীপটির অনন্য জীববৈচিত্র্য। এখানে থাকা বিরল প্রজাতির হরিণ (Gazelles) এবং সমুদ্রের প্রবাল প্রাচীরগুলো বোমাবর্ষণ ও তেলের সম্ভাব্য নিঃসরণের কারণে চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।

বিশ্লেষকরা জানান, খারগ দ্বীপ যার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, পারস্য উপসাগরের জ্বালানি রাজনীতির চাবিকাঠি থাকবে তারই হাতে। এটি এখন আর কেবল ইরানের সম্পদ নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার এক স্পর্শকাতর বিন্দু।

দীর্ঘ ইতিহাস

১৯৬০-এর দশক থেকে ইরানের তেল রপ্তানিতে খারগ দ্বীপ কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে আসছে, যখন মার্কিন তেল কোম্পানি অ্যামোকো-র অংশগ্রহণে এর অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছিল।

অতীতেও এই দ্বীপটি সামরিক হামলার শিকার হয়েছে। আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ইরানের তেল রপ্তানি ব্যাহত করতে এখানে বারবার বোমা হামলা চালানো হয়েছিল।

এই প্রেক্ষাপটে কিছু বিশ্লেষক উল্লেখ করেন যে, এই দ্বীপে হামলা চালানোর বিষয়টি বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

১৯৭৯ সালে ইরানে মার্কিন জিম্মি সংকটের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলেও এই দ্বীপে হামলার নির্দেশ দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন। তার উত্তরসূরি রোনাল্ড রিগান আশির দশকে ইরান ও ইরাকের মধ্যে তথাকথিত 'ট্যাঙ্কার যুদ্ধ'-এর সময় জাহাজ চলাচল রক্ষা এবং ইরানের জাহাজ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্ল্যাটফর্ম লক্ষ্যবস্তু করার দিকে মনোযোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু খারগ দ্বীপ হামলার আওতার বাইরেই ছিল।

6

জেপি মর্গান চেজ জানান, আট বছরের যুদ্ধে ইরাকি বাহিনী কিছু রপ্তানি টার্মিনাল এবং তেলের ট্যাংকার লক্ষ্যবস্তু করলেও খারগ দ্বীপ মূলত সচল ছিল এবং কোনো ক্ষতি হলে তা দ্রুত মেরামত করা হতো। ব্যাংকটি আরও যোগ করেছে যে, এটি প্রমাণ করে যে এই দ্বীপটি অচল করতে হলে বড় মাপের এবং ধারাবাহিক হামলার প্রয়োজন হবে।

খারগ সম্পর্কে আরেও কিছু তথ্য

খারগ দ্বীপে দুটি ঘাট রয়েছে—একটি পূর্বদিকে, আরেকটি পশ্চিমদিকে। ১৯৫৫ সালে একটি তেল কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের পর খারগে লোডিং ডক এবং অপরিশোধিত তেল সংরক্ষণ ট্যাংক নির্মাণের প্রকল্প শুরু হয়।

দ্বীপটিতে অপরিশোধিত তেলের গুণগতমান পরীক্ষা করার জন্য একটি ল্যাবরেটরিও রয়েছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ইরানিয়ান অয়েল টার্মিনালস অর্গানাইজেশন দাবি করে, এটি বিশ্বের সেরা ল্যাবরেটরিগুলোর একটি।

খারগ পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানিও দ্বীপটিতে কার্যক্রম পরিচালনা করে, যার উদ্দেশ্য তেল উত্তোলনের ফলে উৎপন্ন গ্যাস শিখায় পুড়ে নষ্ট হওয়া ঠেকিয়ে তা মূল্যবান পণ্যে রূপান্তর করা। এই কোম্পানি মিথানল, সালফার, প্রোপেন, বিউটেন এবং ন্যাফথা (গ্যাসোলিন) উৎপাদন করে।

আট হাজারের কিছু বেশি জনসংখ্যার এই খারগ দ্বীপেই ইসলামী আজাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ক্যাম্পাস রয়েছে, যেখানে মেরিন সায়েন্স এবং আর্টস বিভাগ আছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাক্ষেত্রগুলোর একটি হলো তেল ও সামুদ্রিক বিষয়ক অধ্যয়ন।

খারগ দ্বীপে ভূমির সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং এটি প্রায়ই ঝড়ো আবহাওয়ার সম্মুখীন হয়। তাই ২০১৬ সালে দ্বীপের ২৩ কিলোমিটার দূরে, বুশেহর প্রদেশের ভেতরে, ১ কোটি ব্যারেল ধারণক্ষমতাসম্পন্ন একটি অপরিশোধিত তেল সংরক্ষণাগার নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়।

/এএস