আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৭ মার্চ ২০২৬, ০৩:৪০ পিএম
নেপালের সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপখ নিয়েছেন রাজধানী কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র ও র্যাপার বালেন্দ্র শাহ, যিনি ‘বালেন শাহ’ নামে পরিচিত।
শুক্রবার প্রেসিডেন্টর কার্যালয় শীতল নিবাসে এক বিশেষ অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির (আরএসপি) বলেন্দ্র শাহ শপথ গ্রহণ করেন। অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কির উপস্থিতিতে দেশটির প্রেডিডেন্ট রামচন্দ্র পাউডেল তাকে পদ ও গোপনীয়তার শপথবাক্য পাঠ করান। এরআগে অনুষ্ঠানে ২০০ জনেরও বেশি হিন্দু পুরোহিত ও বৌদ্ধ লামা শঙ্খধ্বনির পাশাপাশি স্তোত্র ও শান্তির প্রার্থনা করেন।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালের ঐতিহাসিক জেন-জি নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের পর গত ৫ মার্চ দেশটিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে বালেন শাহের মাত্র তিন বছর বয়সী দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) ২৭৫ সদস্যের সংসদে ১৮২টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।
মূলত, চীন ও ভারতের মধ্যে অবস্থিত একটি ছোট হিমালয় জাতি নেপালে দীর্ঘদিন ধরে মুষ্টিমেয় কিছু প্রতিষ্ঠিত দলের আধিপত্য রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওলির নেতৃত্বাধীন নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি (ইউনিফাইড মার্কসবাদী-লেনিনবাদী), যাকে চীনের দিকে ঝুঁকে দেখা যায় এবং মধ্যপন্থী। আর দেশটির প্রাচীনতম দল নেপালি কংগ্রেস, যাকে ভারতের কাছাকাছি বলে মনে করা হয়।
অন্যদিকে নেপালের ইতিহাসে প্রথম স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কাঠমান্ডুর মেয়র হওয়া বালেন শাহ বর্তমানে রবি লামিছানের নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থী নবাগত দল- রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টিতে (আরএসপি) যোগ দেন। দলটি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বড় দুই প্রতিবেশী (ভারত-চীন) দেশের সঙ্গে ‘ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক সম্পর্ক’ বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে, নেপালি কংগ্রেস মাত্র ৩৮টি আসন পেয়ে সংসদে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। আর গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হওয়া ওলির নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি মাত্র ২৫টি আসনে জয়ী হয়।
প্রসঙ্গত, বালেন শাহ কোনও রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান নন। তিনি একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তার ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন। তারপর র্যাপার হিসেবে ভাগ্যে অন্বেষণের চেষ্টা করেন। তাতে সাফল্যও পান। সবশেষে রাজনীতিতে যোগ দেন। ২০২২ সালে কাঠমাণ্ডুর মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং জেতেন। রাজনীতিতে তার অপ্রত্যাশিত উত্থান, জনপ্রিয়তা তাকে যুবসমাজের আইডল করে তোলে।
মেয়র হিসেবে কাঠমান্ডুর অবকাঠামো উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে বালেন শাহ ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বেশ কিছু সংস্থা তার সমালোচনাও করেছে। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ ব্যবহার করে তিনি হকার এবং ভূমিহীনদের উচ্ছেদ করেছেন।
নির্বাচনে লড়তে গত জানুয়ারিতে মেয়রের পদ থেকে পদত্যাগ করেন বালেন। নেপালের প্রথাগত রাজনৈতিক নেতাদের মতো তিনি মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে খুব একটা সাক্ষাৎকার দেন না। পরিবর্তে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার সাড়ে তিন কোটির বেশি অনুসারীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখাই তার পছন্দ।
মেয়রের দায়িত্বে থাকলেও সামাজিক কাজেই বেশি যুক্ত ছিলেন তিনি। যুবসমাজের একটা বিশাল অংশ বালেনের ভক্ত। সোশ্যাল মিডিয়ায় খুব সক্রিয় তিনি। সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন এমন জিনিস পোস্ট করেন যা বিতর্কের জন্ম দেয়। তার জীবনযাপন, স্টাইল, গাড়ির কালেকশন ইত্যাদির কারণে অনেকের কাছে রোল মডেল।
অন্যদিকে কেপি শর্মা ওলি ও বালেন শাহর মধ্যে দ্বন্দ্ব যদিও আজকের নয়। এক সময় কাঠমাণ্ডু মেট্রোপলিটন সিটির ৩ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি কর্মচারীর দীর্ঘদিন ধরে বেতন পাচ্ছিলেন না। তখন বালেন তাদের পাশে দাঁড়ান। তখন তরুণরা আন্দোলনকে সমর্থন করেন। এছাড়াও একাধিক আন্দোলনে সরকার বিরোধিতা করেছিলেন বালেন।
নেপালি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুকে বালেনের সমর্থনে বহু পোস্ট করা হয়েছে। দেশের বৃহৎ অংশের মানুষের দাবি, দেশের তিনটি ঐতিহ্যবাহী প্রধান দলের নেতারা তাদের কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। নেপালের তরুণরা শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে বালেন শাহের তুলনা করতে শুরু করেছে।
উল্লেখ্য, গত সেপ্টেম্বরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধের প্রতিবাদে শন্তিপূর্ণ বিক্ষোভ শুরু করে নেপালের তরুণ প্রজন্ম। তবে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ১৯ জনের প্রাণহানির পর রাজধানী কাঠমাণ্ডুসহ দেশজুড়ে সহিংসতা বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এরমধ্যেই প্রাণ হারান ৭৭ জন, যার জেরে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি।
সূত্র: রয়টার্স, কাঠমান্ডু পোস্ট
এমএইচআর