images

আন্তর্জাতিক

ইরান যুদ্ধের মধ্যেই ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে চলছে হামলা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

২৩ মার্চ ২০২৬, ১২:২৮ পিএম

পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে উগ্রপন্থী ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ঘরবাড়ি, যানবাহন এবং ফসলি জমিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে একের পর এক।

শনিবার (২১ মার্চ) ১৮ বছর বয়সী ইহুদি তরুণ ইহুদা শেরম্যানের মৃত্যুর পর এই সহিংসতার সূত্রপাত হয়। জানা গেছে, কোয়াড বাইক চালানোর সময় এক ফিলিস্তিনির গাড়ির ধাক্কায় তার মৃত্যু হয়। ঘটনাটি পরিকল্পিত নাকি দুর্ঘটনা—তা তদন্ত করছে পুলিশ।

এই ঘটনার পর বসতি স্থাপনকারীদের ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ‘প্রতিশোধ অভিযান’ চালানোর আহ্বান জানানো হয়। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমে এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়েছে, রাতারাতি ২০টিরও বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর থেকেই ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। গত ১ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত তাদের হাতে অন্তত ছয়জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ) জানিয়েছে, শনিবার রাতে একাধিক ফিলিস্তিনি গ্রামে সেনা ও সীমান্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। অধিকৃত এলাকায় ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিকদের অগ্নিসংযোগ ও বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়ার পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

হামলার শিকার গ্রামগুলোর মধ্যে রয়েছে জালুদ, কারিয়ুত, আল-ফান্দুকুমিয়াহ এবং সিলাত আদ-দাহর। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ফুটেজে (যার সত্যতা বিবিসি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি) দেখা যায়, কালো পোশাক ও মুখোশ পরা ৯০ জনের বেশি ব্যক্তি জালুদ গ্রামে ঢুকে তাণ্ডব চালাচ্ছে।

অন্য ভিডিওতে গ্রামটিতে একাধিক যানবাহনে আগুন, ভবনের জানালা ভাঙচুর এবং অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শোনা যায়। একটি ভবনের দেয়ালে স্প্রে-পেইন্ট দিয়ে ‘ইহুদার বদলা নাও’ লেখা হয়েছে।

ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, হামলাকারীদের প্রতিহত করতে গিয়ে অন্তত তিনজন ফিলিস্তিনি মাথায় আঘাত পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। হামলাকারীদের মধ্যেও আহতের খবর রয়েছে।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, একটি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় বলা হয়েছে, ‘ইহুদিদের রক্ত ঝরলে আমরা চুপ থাকব না।’ আরেকটিতে লেখা, ‘আমরা প্রতিশোধ এবং শত্রুদের নির্মূল করতে চাই।’

7

ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, ঈদুল ফিতরের মধ্যে চালানো এই হামলায় ঘরবাড়ি ও সম্পত্তি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, বেসামরিকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

রোববার ইসরায়েলি পুলিশ জানিয়েছে, দেইর আল-হাতাব গ্রামের কাছে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ইতামার বসতির কাছে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলায় একজন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন বলেও জানানো হয়। পুলিশ বলেছে, তারা ‘উগ্রপন্থী সহিংস ব্যক্তিদের প্রতি একটুও শিথিল থাকবে না।’

ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে কাজ করা ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা ইয়েশ দিন এই ঘটনাগুলোকে ‘এক রাতের তাণ্ডব বা পোগ্রোম’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটি অভিযোগ করে বলেছে, আগাম তথ্য থাকা সত্ত্বেও বাহিনী কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

রোববার ইহুদা শেরম্যানের জানাজায় ৫০০’র বেশি মানুষ অংশ নেন। সেখানে ইসরায়েলের কট্টরপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচও উপস্থিত ছিলেন, যিনি ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানির অভিযোগে যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছেন।

সেদিন সন্ধ্যায় পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন গ্রামসংলগ্ন এলাকায় তারা আবারও জড়ো হতে শুরু করেছে। ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ‘ওয়াফা’ জানিয়েছে, নাবলুসের উত্তর-পশ্চিমে একটি কার ওয়াশ সেন্টারেও আগুন দেওয়া হয়েছে।

চলতি মাসের শুরুতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য বলেছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা যে হারে বেড়েছে, তা ইসরায়েলকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বসতি স্থাপনকারীদের হাতে সাতজন এবং ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে ১৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৫টি ঘটনা ঘটেছে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর।

8

ইসরায়েলের মধ্য-বামপন্থী দল ডেমোক্র্যাটস-এর নেতা ইয়ার গোলান এই সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে সরকারকে দায়ী করেছেন। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘ইরান ও উত্তর সীমান্তে যুদ্ধের মধ্যে সরকার নৈরাজ্যকে উৎসাহিত করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে ইহুদি সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে পড়ছে, যা প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর উৎসাহে ঘটছে। এটি ইসরায়েলের নিরাপত্তার বড় ব্যর্থতা।’

এর আগে আইডিএফ প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতাকে ‘নৈতিক ও নীতিগতভাবে অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন।

১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পর থেকে ইসরায়েল পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে প্রায় ১৬০টি বসতি স্থাপন করেছে, যেখানে বর্তমানে প্রায় সাত লাখ ইহুদি বসবাস করছে।

অন্যদিকে, ফিলিস্তিনিরা গাজাসহ এই অঞ্চলকে তাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে দেখে। বর্তমানে পশ্চিম তীরে প্রায় ৩৩ লাখ ফিলিস্তিনি বসবাস করছেন।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, এসব বসতি অবৈধ বলে বিবেচিত। সূত্র: বিবিসি বাংলা

/এএস