images

আন্তর্জাতিক

ইরান যুদ্ধ শক্তিশালী করেছে নেতানিয়াহুকে, ক্ষতিগ্রস্ত ট্রাম্প ও আরবরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

২০ মার্চ ২০২৬, ০৮:৪৮ পিএম

যদি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ আগামীকাল শেষ হয়ে যায়, তবে একটি বিষয় ইতিমধ্যেই স্পষ্ট: ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবেন, অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিশ্ববাজারে সৃষ্ট ধাক্কা এবং এই যুদ্ধের সবচেয়ে বেশি মূল্য দেওয়া উপসাগরীয় মিত্রদের সামাল দেওয়ার দায়িত্ব নিতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর জন্য এই যুদ্ধ তার শর্তানুযায়ী ইসরায়েলের রাজনৈতিক মানচিত্র নতুন করে এঁকে দিয়েছে এবং গাজা থেকে মনোযোগ সরিয়ে ইরানের দিকে নিয়ে গেছে, যেখানে জাতীয় ঐক্য সবচেয়ে শক্তিশালী এবং তার নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক যোগ্যতা সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য।

ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এর ফল হয়েছে উল্টো: এটি তাকে এমন এক সংঘাতে জড়িয়েছে যেখান থেকে বেরোনোর ​​কোনো স্পষ্ট পথ নেই, আর তার উপসাগরীয় আরব মিত্রদের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে ফেলেছে এবং সেই অর্থনৈতিক আখ্যানকে দুর্বল করে দিয়েছে, যা তাকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক মধ্যপ্রাচ্য আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেছেন, ‘এখানে একজন স্পষ্ট বিজয়ী এবং একজন স্পষ্ট পরাজিত পক্ষ রয়েছে, নেতানিয়াহু নিঃসন্দেহে প্রধান বিজয়ী। তিনি ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন করেছেন। উপসাগরীয় দেশগুলো নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড় পরাজিত পক্ষ।’

তিনি আরও বলেন, ট্রাম্পের জন্য এমন কোনো পথ নেই যা তাকে বিজয় ঘোষণা করে সরে যাওয়ার সুযোগ দেবে।

ইরান বিশেষজ্ঞ করিম সাদজাদপুর বলেছেন, ট্রাম্প, যিনি ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ দাবি করেছিলেন এবং ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের মতো একজন নমনীয় ক্ষমতাধর মধ্যস্থতাকারী ইরানিকে খুঁজে পাওয়ার আশা করেছিলেন। কিন্তু পরিবর্তে তিনি উত্তর কোরিয়ার কর্তৃত্ববাদী মডেলের অনুকরণে “একজন ইরানি কিম জং-উনকে” (মোজতবা খামেনি) পেয়েছেন।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো নাতান স্যাকস বলেছেন, ওয়াশিংটনের বিপরীতে ইসরায়েলে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে পছন্দের যুদ্ধ হিসেবে নয়, বরং প্রয়োজনীয় যুদ্ধ হিসেবেই ব্যাপকভাবে দেখা হয়। 

তিনি আরও বলেন, ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন না ঘটলেও, ইরান এবং তার নেতৃত্বাধীন (মিলিশিয়া) অক্ষকে দুর্বল করা নেতানিয়াহুর একটি বিশাল লক্ষ্য।’

ট্রাম্পের জন্য কঠিন সিদ্ধান্ত

ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলছেন, আকাশযুদ্ধটি মূলত বিভক্ত। এতে ইসরায়েল পশ্চিম ও উত্তর ইরানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালাচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নৌ সক্ষমতা দুর্বল করার লক্ষ্যে হরমুজ প্রণালীসহ পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে মনোনিবেশ করেছে।

কর্মকর্তারা বলছেন, ইসরায়েল ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যায় নেতৃত্ব দিয়েছে, যার মধ্যে মঙ্গলবার নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানি এবং বুধবার গোয়েন্দা মন্ত্রী ইসমাইল খাতিব নিহত হয়েছেন। 

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেছেন, তিনি এবং নেতানিয়াহু সামরিক বাহিনীকে কোনো অতিরিক্ত অনুমোদনের প্রয়োজন ছাড়াই খুঁজে পাওয়া যেকোনো শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তার ওপর হামলা চালানোর অনুমোদন দিয়েছেন।

তবে, এই সাফল্যগুলো যুদ্ধকে সমাপ্তির কাছাকাছি নিয়ে আসেনি। বিশ্লেষকরা বলেছেন, ট্রাম্পের সামনে তিনটি কঠিন পথ খোলা রয়েছে: হামলা দীর্ঘায়িত করা, বিজয় ঘোষণা করে তেহরানকে পিছু হটার আশা করা, অথবা পরিস্থিতিকে নাটকীয়ভাবে আরও গুরুতর করে তোলা—যার কোনোটি থেকেই বেরিয়ে আসার কোনো স্পষ্ট পথ নেই।

এই প্রতিবেদনের জন্য মন্তব্যের অনুরোধে হোয়াইট হাউস, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এবং নেতানিয়াহুর কার্যালয় কোনো সাড়া দেয়নি।

এদিকে মার্কিন গোয়েন্দা প্রধান তুলসি গ্যাবার্ড বুধবার কংগ্রেসকে বলেছেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের সরকার দুর্বল হয়ে পড়লেও তা এখনও অক্ষত রয়েছে এবং তেহরান ও তার মদদপুষ্ট শক্তিগুলো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে মার্কিন ঘাঁটি ও মিত্রদের স্বার্থে হামলা চালাতে সক্ষম।

ট্রাম্পের আপাত ভুল হিসাবের তীব্র প্রভাব উপসাগরীয় অঞ্চলে অনুভূত হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান যখন বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে এবং বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেলের প্রধান উৎস হরমুজ প্রণালিকে অচল করে দিচ্ছে, তখন উপসাগরীয় দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর সিনিয়র ফেলো মিলার বলেন, ‘তারা (উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলো) এখন যে সাধারণ হুমকিটি উপলব্ধি করছে, তা উপসাগরীয় অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ছাড়া আর কিছুই নয়। উপসাগরীয় অঞ্চলই যে এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ, এই ধারণাটি এখন ঝুঁকির মুখে—এবং এর সাথে সাথে নিজেদের সম্পর্কে উপসাগরীয় অঞ্চলের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে গেছে।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্য ভিন্ন

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি ইচ্ছুক হতে পারে, কারণ তারা হিসাব করে দেখেছে যে এতে তাদের আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া অনেক কম হবে, বিশেষ করে গত তিন বছরে ইরানের প্রক্সি হামাস ও হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়ে পড়ার পর।

একই সময়ে ওয়াশিংটন এবং তার উপসাগরীয় অংশীদাররা জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর এমন সব হামলার শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে অনেক বেশি থাকে, যা তেলের দাম বাড়িয়ে দেয় এবং জাহাজ চলাচল ব্যাহত করে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সাবেক কৌশল প্রধান আসাফ ওরিয়ন বলেছেন, আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো প্রশ্ন তুলছে যে ইসরায়েল ইরানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চাইছে কি না? 

তিনি আরও বলেন, এই ধরনের অস্থিতিশীলতায় ইসরায়েল তার প্রতিবেশী বা ওয়াশিংটনের তুলনায় কম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, মূলত এই দুই মিত্রের ঝুঁকি উপলব্ধি ভিন্ন: ইসরায়েল ইরানকে একটি সম্ভাব্য অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখে, অন্যদিকে ওয়াশিংটন একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এড়ানোর ওপর বেশি মনোযোগ দিচ্ছে, যা ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি করতে পারে এবং মৈত্রী সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

সূত্র: রয়টার্স


এমএইচআর