আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৯ মার্চ ২০২৬, ০৪:৫৪ পিএম
ইরানের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র ‘সাউথ পার্স’-এ ইসরায়েলের হামলার জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা জোরদার করেছে তেহরান। বিশেষ করে কাতারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসক্ষেত্র ‘রাস লাফান এনার্জি কমপ্লেক্সে’ ভয়াবহ হামলা চালায় ইরান। এর জেরে বিশ্ববাজারে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম হু হু করে বেড়ে গেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম প্রায় ৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৫ দশমিক ১০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুড ফিউচারসের দাম ৫৭ সেন্ট বা ০.৬ শতাংশ বেড়ে ৯৬ দশমিক ৮৯ ডলারে পৌঁছেছে।
যদিও যুদ্ধের শুরুতে এক পর্যায়ে ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৯ দশমিক ৫০ ডলার এবং ডব্লিউটিআইয়ের দাম ১১৯ দশমিক ৪৮ ডলারে উঠেছিল, পরে দাম কিছুটা কমে।
অন্যদিকে ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম একদিনেই ২৪ শতাংশ বেড়েছে, যা গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।
ইউরোপীয় বেঞ্চমার্ক হিসেবে বিবেচিত ডাচ টিটিএফ প্রাকৃতিক গ্যাসের চুক্তিমূল্য বৃহস্পতিবার একপর্যায়ে লাফিয়ে ৭৪ ইউরোতে গিয়ে ঠেকেছে। যদিও পরবর্তীতে এই দাম কিছুটা কমেছে।
মূলত, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরব, ইরাক, আরব আমিরাত এবং কুয়েত উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। এছাড়াও ইরান বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহনের সমুদ্র পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে, যা তেলের বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
এরমধ্যেই গতকাল বুধবার রাতে ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে, যা বিশ্বের সর্ববৃহৎ প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র বলে বিবেচিত' হামলা চালায় ইসরায়েল। এর জবাবে কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশে হামলা চালিয়েছে ইরান।
কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি ‘কাতার এনার্জি’ জানিয়েছে, দেশটির রাস লাফান এলএনজি হাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। রাস লাফফান শিল্পাঞ্চলে লাগা আগুন নেভাতে কাজ করছে জরুরি পরিষেবা সংস্থার সদস্যরা। তবে ইরানের এ হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি বিশ্বের বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস স্থাপনা হিসেবে পরিচিত। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই হামলা শুরু হয়েছে তাদের নিজস্ব জ্বালানি স্থাপনায় আঘাতের প্রতিক্রিয়ায়। ইসরায়েলের এক হামলায় ইরানের সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ড লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়, যা বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্রের অংশ।
এছাড়াও রাতভর সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে হামলা চালায় ইরান। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের দুটি তেল শোধনাগার হামলার মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ।
সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যালিস্টিক মিসাইলগুলো প্রতিহত করছে এবং আকাশে থাকা যুদ্ধবিমানগুলো ড্রোন ধ্বংসের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। রাতভর তিনটি সতর্কতা জারি করে নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাহরাইন। একইসঙ্গে, কুয়েতেও ড্রোন হামলায় দুটি শোধনাগারে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে, যা পরে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
রয়টার্স বলছে, চলমান সংঘাত দ্রুত শেষ হলেও ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো, সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন এবং জাহাজ চলাচলের ঝুঁকির কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্য কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে থাকতে পারে।
উল্লেখ্য, লন্ডন ভিত্তিক বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আর্থিক বাজার অবকাঠামো এবং তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এলএসইজির ১৯৮০ সাল পরবর্তী তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে তেলের দাম সর্বোচ্চ ব্যারেলপ্রতি ১৪৭ ডলারে উঠেছিল। আর ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর ওই বছরের ৭-৮ মার্চের দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রতি ব্যারেলে প্রায় ১৩৯ ডলারে পৌঁছেছিল।
সূত্র: রয়টার্স, সিএনএন
এমএইচআর