আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৯ মার্চ ২০২৬, ১০:৫৪ এএম
ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনো 'অটুট' থাকলেও তা 'ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত' বা 'দুর্বল' হয়ে পড়েছে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিশ্বব্যাপী হুমকি নিয়ে এক সংসদীয় শুনানিতে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে স্বাক্ষ্য দিয়েছেন মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ড এবং ট্রাম্প প্রশাসনের অন্য শীর্ষ কর্মকর্তারা।
ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এটিই ছিল মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের ওপর প্রথম প্রকাশ্য ব্রিফিং।
এর ঠিক একদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় একজন সন্ত্রাসবাদবিরোধী কর্মকর্তা পদত্যাগ করেছেন এবং জানিয়েছেন যে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো 'অনিবার্য হুমকি' ছিল না।
দেশটির গোয়েন্দা কার্যক্রমের সমন্বয়কারী তুলসী গ্যাবার্ড দাবি করেছেন যে, জাহাজ চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিতে সংকটের পূর্বাভাস আগেই পেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
তিনি বলেন, ‘গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি বলেই মনে হচ্ছে, তবে তাদের নেতৃত্ব এবং সামরিক সক্ষমতার ওপর হামলার কারণে সেগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
সিআইএ, এফবিআই, এনএসএ এবং ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির প্রধানদের সাথে উপস্থিত হওয়া গ্যাবার্ড, ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিতে অস্বীকার করেন।
এই সিনেটর বারবার জানতে চেয়েছিলেন যে, তিনি (গ্যাবার্ড) ইরানকে হুমকি হিসেবে দেখছেন কী-না।
উত্তরে গ্যাবার্ড বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনটা হুমকি আর কোনটা নয়, তা নির্ধারণ করার একমাত্র ব্যক্তি হলেন প্রেসিডেন্ট।’
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই রিপাবলিকা এবং ডেমোক্র্যাট - উভয় দলের আইনপ্রণেতা এবং বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র কেন ইসলামি প্রজাতন্ত্রটিতে হামলা চালালো? এছাড়া ইরানের দক্ষিণ উপকূলে হরমুজ প্রণালি ঘিরে সম্ভাব্য সমস্যা সম্পর্কে ট্রাম্প প্রশাসন অবগত ছিল কী-না, এ নিয়েও জানতে চান তারা।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছিল, যা যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের জন্য হুমকি ছিল। মূলত এ কারণেই উপসাগরীয় দেশটিতে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
মঙ্গলবার মার্কিন ন্যাশনাল কাউন্টারটেররিজম সেন্টারের পরিচালক জো কেন্ট পদত্যাগ করেন।
প্রকাশ্যে পোস্ট করা একটি পদত্যাগপত্রে তিনি লেখেন যে, ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘কোনো অনিবার্য হুমকি’ ছিল না এবং যুদ্ধের জন্য তিনি ট্রাম্পের সমালোচনা করেন।
তবে বুধবার স্বাক্ষ্য দেওয়ার সময় সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ জানান যে, তিনি কেন্টের সাথে একমত নন। ‘আমি মনে করি, ইরান দীর্ঘ সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি হুমকি ছিল এবং এই মুহূর্তেও এটি একটি তাৎক্ষণিক হুমকি হিসেবেই রয়েছে,’ বলেন তিনি।
তুলসী গ্যাবার্ড বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতার ‘বিরাট অংশে ধ্বংস’ হয়ে গেছে। তিনি আরও জানান, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মূল্যায়ন করেছে যে, ‘১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামোর যে মারাত্মক ক্ষতি হয়েছিল, দেশটি তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিল এবং তাদের পারমাণবিক বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে অস্বীকার করে আসছিল।’
পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতা ধ্বংস করার লক্ষ্যে ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ১২ দিন ধরে ইরানে হামলা চালায়।
শুনানির জন্য তৈরি করা লিখিত বক্তব্যে গ্যাবার্ড দাবি করেছিলেন যে, ওই হামলায় ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি ‘তছনছ’ হয়ে গেছে এবং ইরান তা পুনর্গঠনের ‘কোনো চেষ্টাই’ করেনি। তবে তিনি জনসমক্ষে বক্তব্যের সময় এই অংশটি এড়িয়ে যান।
ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার এই অংশ বাদ পড়ার কারণ জানতে চাইলে গ্যাবার্ড বলেন, বক্তব্য ‘অনেক দীর্ঘ’ হয়ে যাওয়ায় তাকে কিছু অংশ ছেঁটে ফেলতে হয়েছে।
ওয়ার্নার এর জবাবে বলেন, ‘তার মানে আপনি সেই অংশগুলো বাদ দিয়েছেন যা প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক।’
তিনি মূলত ট্রাম্পের সেই দাবিকে ইঙ্গিত করছিলেন যেখানে বলা হয়েছিল যে, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কারণেই ইরানে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি ছিল।
আইনপ্রণেতারা আরও জানতে চান যে, ট্রাম্পের ইরানে হামলার সিদ্ধান্তের সাথে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা কতটা জড়িত ছিলেন?
মেইন অঙ্গরাজ্যের স্বতন্ত্র সিনেটর অ্যাঙ্গাস কিং জানতে চান, ট্রাম্প যখন ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত’ নিচ্ছিলেন, তখন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা কি ‘একই কক্ষে’ উপস্থিত ছিলেন?
সিআইএ পরিচালক র্যাটক্লিফ জানান, তিনি প্রেসিডেন্টের সাথে ‘অনেক’ বৈঠকে ছিলেন, তবে এমন কোনো ‘নির্দিষ্ট মুহূর্ত’ তার জানা নেই, যেখানে সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছিল।
সিনেটর কিং আরও জানতে চান যে, যুদ্ধের সময় ইরান হরমুজ প্রণালিতে হামলা করতে পারে, এ বিষয়টি গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে জানিয়েছিলেন কী-না?
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান গুরুত্বপূর্ণ এই তেল পরিবহন পথটি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে।
সিআইএ পরিচালক র্যাটক্লিফ বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট প্রতিনিয়ত গোয়েন্দা ব্রিফিং পান।’
তিনি আরও যোগ করেন যে, পেন্টাগন আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছিল যে, ইরান এ অঞ্চলের ‘জ্বালানি কেন্দ্রগুলোতে মার্কিন স্বার্থে’ আঘাত হানতে পারে এবং সেই অনুযায়ী সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
আর তুলসী গ্যাবার্ড উল্লেখ করেন যে, গোয়েন্দা সংস্থার "দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ" ছিল যে ইরান সম্ভবত হরমুজ প্রণালি নিজেদের দখলে নেবে। তিনি জানান, ওই রিপোর্টের ভিত্তিতে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ আগেভাগেই প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। সূত্র: বিবিসি বাংলা
জেবি