images

আন্তর্জাতিক

ভারতের আরএসএস ও ‘র’য়ের ওপর আসতে পারে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

১৭ মার্চ ২০২৬, ০৬:০৮ পিএম

ভারতের হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ও দেশটির প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা- রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং (র)-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে মার্কিন একটি কমিশনের প্রতিবেদনে। সেই সাথে এই সংস্থাগুলোর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা ও ইতোমধ্যেই সেখানে অবস্থানকারীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার জন্যও সুপারিশ করা হয়েছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম (ইউএসসিআইআরএফ)-এর ২০২৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে এই সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে ‘ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতা বিঘ্নিত হচ্ছে এবং বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণের ঘটনা বাড়ছে’— এই বর্ণনা দিয়ে ভারতকে রাখা হয়েছে সিপিসি অর্থাৎ ‘কান্ট্রি অব পার্টিকুলার কনসার্নের’ তালিকায়।

যদিও এই প্রতিবেদনের বিষয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এই রিপোর্টটিকে 'একপেশে' বলে অভিযোগ করেছে ভারত। আমেরিকায় ভারতীয়দের উপর আক্রমণের ঘটনার কথা উল্লেখ করে মার্কিন ওই প্রতিবেদনকে নাকচ করেছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

কী রয়েছে মার্কিন প্রতিবেদনে?

ইউএসসিআইআরএফ-এর প্রতিবেদনে ভারতে সম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা নিয়ে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর একাধিক হামলার কথা তুলে ধরা হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন সরকারি নীতিরও সমালোচনা করে বলা হয়েছে, সেই নীতিগুলি নির্দিষ্টভাবে সংখ্যালঘুদের নিশানা করে তৈরি করা হয়েছে।

ভারতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে প্রতিবেদনে যে মূল বিষয়গুলি তুলে ধরা হয়েছে সেগুলো হল—

বৈষম্যমূলক আইন: ভারতের সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট বা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ও ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেন্স আইনের কড়া সমালোচনা করা হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ধর্মান্তর বিরোধী বিভিন্ন আইন ও গো-রক্ষা আইন পাশ হওয়া নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে রিপোর্টটি। এই আইনগুলির মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের নিশানা করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে রিপোর্টটি।

মব ভায়োলেন্স: ভারতে সাম্প্রতিক অতীতে ঘটে যাওয়া সংখ্যালঘুদের উপর উন্মত্ত জনতার আক্রমণের কিছু ঘটনা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, "ভারতে ধর্মান্তকরণ ও গরু পাচারের অজুহাতে" সংখ্যালঘুদের হেনস্থা ও গণপিটুনির ঘটনা বাড়ছে যা আমেরিকার জন্য উদ্বেগের বিষয় হওয়া উচিত।

ধর্মীয় সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি বিরূপ মনোভাব: এই ইউএসসিআইআরএফ ২০২৬ রিপোর্টে ভারতের ওয়াকফ আইন, সন্ত্রাসবাদ দমনের জন্য ব্যবহৃত ইউএপিএ আইন ও এনজিওগুলিতে বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক আইনের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এই আইনগুলি দিয়ে সারা দেশে অবস্থিত সংখ্যালঘু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা খর্ব করা হচ্ছে।

এ ছাড়াও প্রতিবেদনে বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ঘরবাড়ি ও উপাসনালয় ভেঙে দেওয়াকে কেন্দ্র করেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

একগুচ্ছ নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ

ইউএসসিআইআরএফ যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বিষয়ে ৫টি ও মার্কিন কংগ্রেসের প্রতি একটি সুপারিশ করা হয়েছে। এই সুপরিশগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারতের ইন্টেলিজেন্স সংস্থা 'র' ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠন 'আরএসএস'-এর উপর নিষেধাজ্ঞা ও এই প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা ও যুক্তরাষ্ট্রে তাদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি।

এছাড়াও ওই প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক, সামরিক ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কগুলোকে ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতা বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করার সুপরিশ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আর্মস এক্সপোর্ট কন্ট্রোল আইনের ৬ নম্বর ধারা ব্যবহার করে ভারতে অস্ত্র বিক্রি স্থগিত করার সুপারিশ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। ভারতের মাটিতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও আমেরিকান নাগরিকদের হেনস্থার ঘটনার প্রেক্ষিতে এই পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

ভারতের প্রতিক্রিয়া

ইউএসসিআইআরএফ-এর প্রতিবেদন নিয়ে গতকাল সোমবার একটি বিবৃতি জারি করেছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সেই বিবৃতিতে এই রিপোর্টটিকে ‘একপেশে’ বলে দাবি করা হয়েছে।

‘ভারত এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও একপেশে রিপোর্টটিকে প্রত্যাখ্যান করে’ উল্লেখ করে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, ‘বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে ইউএসসিআরআইএফ বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের পরিবর্তে সন্দেহজনক সুত্র এবং মতাদর্শ-নির্ভর বয়ানের ওপর নির্ভর করে ভারতের একটি বিকৃত ও পক্ষপাতদুষ্ট চিত্র তুলে ধরার ধারা অব্যাহত রেখেছে। এ ধরনের বারবার ভুল উপস্থাপনা খোদ কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ক্ষুণ্ণ করে।’ 

যুক্তরাষ্ট্রে হিন্দু মন্দিরে আক্রমণের কিছু ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, "ভারতের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট সমালোচনা অব্যাহত রাখার পরিবর্তে, যুক্তরাষ্ট্রের হিন্দু মন্দিরগুলোতে ভাঙচুর ও হামলার উদ্বেগজনক ঘটনাগুলো, বেছে বেছে ভারতীয়দের টার্গেট করার প্রবণতা এবং যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ভারতীয় প্রবাসীদের প্রতি ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতার ঘটনাগুলি নিয়ে গভীরভাবে ভাবা উচিত ইউএসসিআরআইএফ-এর।"

ইউএসসিআরআইএফ কী?

ইউনাইটেড স্টেটস কমিশন অফ ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়স ফ্রিডম (ইউএসসিআরআইএফ) বা আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্র কমিশন হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের একটি সংস্থা।

১৯৯৮ সালের 'আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা আইন'-এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অন্য দেশগুলিতে ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় এই সংস্থাটি।

এটি বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রসার ও নিপীড়ন প্রতিরোধে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং মার্কিন কংগ্রেসকে নীতিগত সুপারিশ দিয়ে থাকে। বিবিসি বাংলা

 

এমএইচআর