images

আন্তর্জাতিক

হরমুজ প্রণালিতে সামরিক অভিযানে অংশ নেবে না ইউরোপীয় দেশগুলো

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

১৭ মার্চ ২০২৬, ১২:৪৪ এএম

মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলের সরবরাহ বিপর্যস্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আহ্বান ইউরোপীয় নেতারা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারা স্পষ্ট করে বলেছে, প্রণালি রক্ষা বা নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে কোনো সামরিক অভিযানে অংশ নেবে না। তবে কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার জন্য উন্মুক্ত।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে থাকায় সোমবার বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক বৈঠক হয়। সেখানে জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াডেফুল জানান, চলমান সংঘাতে জার্মানির সামরিক অভিযানে যোগ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই।

সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাদের আরও স্পষ্টতা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সেখানে কী করছে, তাদের লক্ষ্য কী এবং সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে কি না-এসব বিষয়ে তারা আমাদের অবহিত করবে বলে আমরা আশা করি।’

তিনি আরো বলেন, ‘পরিস্থিতি পরিষ্কার হলে পরবর্তী ধাপে পুরো অঞ্চলের জন্য একটি নিরাপত্তা কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে, যেখানে প্রতিবেশী দেশগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’

অন্যদিকে বার্লিন থেকে জার্মানির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বোরিস পিস্টোরিয়াস বলেন, তার দেশ কোনো সামরিক অভিযানে অংশ নেবে না। তবে হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে সমর্থন করতে প্রস্তুত জার্মানি।

তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের যুদ্ধ নয়। আমরা এটি শুরু করিনি। যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী নৌবাহিনী যেখানে আছে, সেখানে ইউরোপের কয়েকটি ফ্রিগেট পাঠিয়ে কী পরিবর্তন হবে?

এদিকে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ-এর মুখপাত্র স্টেফান কর্নেলিয়াস বলেছেন, এই সংঘাতের সঙ্গে ন্যাটোর কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, ন্যাটো মূলত সদস্যদেশগুলোর ভূখণ্ড রক্ষার জন্য গঠিত জোট, আর এই সংঘাতে ন্যাটো মোতায়েনের কোনো ম্যান্ডেট নেই।

জার্মানির এই অবস্থানের সঙ্গে একমত হয়েছে যুক্তরাজ্যও। লন্ডন থেকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেন, ‘এটি ন্যাটোর কোনো মিশন হবে না-এমন পরিকল্পনা কখনোই ছিল না।’

তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য বৃহত্তর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চায় না। তবে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। প্রয়োজনে ওই অঞ্চলে থাকা ব্রিটিশ মাইন অনুসন্ধানকারী ড্রোন ব্যবহার করা হতে পারে।

ইউরোপে সংশয়

রোববার ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি নৌ জোট গঠনের আহ্বান জানান। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি দেশ এতে সংশয় প্রকাশ করেছে।

বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ হয় এই প্রণালি ব্যবহার করে। কিন্তু চলমান যুদ্ধে প্রণালিটি প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালাচ্ছে। যার জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী রব জেটেন বলেন, ‘স্বল্প সময়ের মধ্যে সেখানে সফল কোনো মিশন পরিচালনা করা খুবই কঠিন।’

লিথুয়ানিয়া ও এস্তোনিয়া বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধ বিবেচনা করা উচিত। তবে সম্ভাব্য মিশনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা প্রয়োজন।

এস্তোনিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারগুস তসাখনা বলেন, ইউরোপীয় মিত্ররা ট্রাম্পের কৌশলগত লক্ষ্য সম্পর্কে জানতে চায়-‘পরিকল্পনাটা কী?’

গ্রিস সরকারের মুখপাত্র পাভ্লোস মারিনাকিস জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে কোনো সামরিক অভিযানে অংশ নেবে না গ্রিস।

ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি বলেন, ইতালি বর্তমানে এমন কোনো নৌ অভিযানে জড়িত নয়, যা ওই অঞ্চলে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।

তবে ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন বলেন, ইউরোপের উচিত খোলা মন নিয়ে পরিস্থিতি বিবেচনা করা। যদিও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে না ইউরোপ।

তিনি বলেন, ‘বিশ্বকে যেমন আছে তেমনভাবেই আমাদের মোকাবিলা করতে হবে।’ একই সঙ্গে তিনি উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্য নিয়ে পরিকল্পনা তৈরির আহ্বান জানান।

পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাদেক সিকোরস্কি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ন্যাটোর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সহায়তা চায়, তবে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। তিনি ন্যাটোর চুক্তির অনুচ্ছেদ–৪–এর কথাও উল্লেখ করেন, যা কোনো দেশের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে আলোচনা আহ্বানের সুযোগ দেয়।

ট্রাম্পের চাপ

সোমবার হোয়াইট হাউসে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, কিছু দেশ এই উদ্যোগে খুবই আগ্রহী, আবার কিছু দেশ তেমন উৎসাহ দেখাচ্ছে না।

তিনি বলেন, ‘আমরা অনেক বছর ধরে অনেক দেশকে রক্ষা করেছি। কিন্তু তারা খুব বেশি উৎসাহী নয়। আর উৎসাহের মাত্রাটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।’

ট্রাম্প বিশেষভাবে যুক্তরাজ্যের অনীহার কথাও উল্লেখ করে বলেন, ন্যাটোর পেছনে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল অর্থ ব্যয় করে তার ‘প্রাচীনতম মিত্রকে’ রক্ষা করেছে।

তিনি জানান, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক রুবিও শিগগিরই জানাবেন কোন কোন দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করতে রাজি হয়েছে।

এর আগে ব্রাসেলসে বৈঠকের আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাজা কালাস প্রস্তাব দেন, লোহিত সাগরে হুথিদের হামলা থেকে জাহাজ রক্ষায় ২০২৪ সালে চালু হওয়া আস্পিডিস মিশন সম্প্রসারণ করা হলে সেটিই দ্রুততম উপায় হতে পারে।

তবে বৈঠক শেষে তিনি বলেন, এই মিশন সম্প্রসারণে কোনো দেশের আগ্রহ দেখা যায়নি। তিনি বলেন, ‘কেউই সরাসরি এই যুদ্ধে জড়াতে চায় না।’

আগেই তিনি সতর্ক করেছিলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের বেশি হয়ে গেছে, যা ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার অর্থায়নকে পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে।

ব্রাসেলস থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক জানান, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করতে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করার জন্য ইউরোপীয় নেতাদের ওপর ট্রাম্পের চাপ ক্রমেই বাড়ছে।

তবে ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার আগ্রহ খুবই কম। তারা প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়ার উপায় নিয়ে আলোচনা করলেও সেটি যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর অর্থ নাও হতে পারে।

ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ’র সঙ্গে কথা বলেছেন এবং ম্যাক্রোঁ প্রণালিটি খুলে দিতে সহায়তা করতে রাজি।

বর্তমানে আস্পিডিস মিশনের অধীনে একটি ইতালীয় ও একটি গ্রিক যুদ্ধজাহাজ রয়েছে, প্রয়োজনে একটি ফরাসি ও আরেকটি ইতালীয় জাহাজ সহায়তা দিতে পারে।

রোববার ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে সামরিক অভিযানের প্রস্তাবে সাড়া না পেলে বা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া এলে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ ‘খুব খারাপ’ হতে পারে।

এমআর