আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৬ মার্চ ২০২৬, ০৪:১৭ পিএম
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ধারাবাহিকভাবে হামলা চালাচ্ছে ইরান। এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত হামলার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে, যা থামার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
রোববার ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের ১৬তম দিন পেরিয়েছে। এরমধ্যে তেহরান সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে কুখ্যাত শাহেদসহ ১,৬০০টি ড্রোন, প্রায় ৩০০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১৫টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। যার ফলে একদিকে দেশটিতে ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে এবং অন্যদিকে বিশ্বের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে তার ভাবমূর্তির ওপরেও আঘাত লেগেছে।
এই যুদ্ধে অর্থনৈতিকভাবেও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমিরাত। এরমধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ততম দুবাই বিমানবন্দরে হামলায় বিমান চলাচল ব্যহত হওয়ার কারণে আমিরাতের রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা এমিরেটস এয়ারলাইন্সের দৈনিক ক্ষতি হয়েছে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার; ভীত বাজারের কারণে বিনিয়োগকারীদের ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হয়েছে; এবং গুরত্বর্পূণ জেবেল আলী বন্দরে ধীরগতির জাহাজ চলাচলের কারণে দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হয়েছে।
এছাড়াও ইরানের এসব হামলায় এখন পর্যন্ত পাকিস্তান, নেপাল এবং বাংলাদেশি নাগরিকসহ ছয়জন নিহত হয়েছেন।
তেহরান সংযুক্ত আরব আমিরাতকে তার ভূখণ্ডকে মার্কিন হামলার জন্য লঞ্চপ্যাড হিসেবে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার অভিযোগ করে বলেছে, তারা কেবল মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতেই হামলা চালাচ্ছে। যদিও বাস্তবে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অর্থনৈতিক ও তেল অবকাঠামোতেও আঘাত হানছে।
তবে বিনা উস্কানিতে চালানো এসব হামলা জবাবে আক্রমণাত্মক ক্ষমতায় কোনও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেনি আরব আমিরাত, যদিও জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদের অধীনে; ‘কোনও দেমশে বিরুদ্ধে সশস্ত্র আক্রমণ ঘটলে আত্মরক্ষার সহজাত অধিকার... এবং পাল্টা আক্রমণ ন্যায্য’। তবে এক্ষেত্রে আমিরাত শুধু ইরানের হামলা ঠেকাতে শত শত ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করেছে- যার মধ্যে আমেরিকান-নির্মিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা- ‘থার্ড’ রয়েছে।
এখন প্রশ্ন উঠেছে এতো ক্ষয়ক্ষতির পরও কেন ইরানে পাল্টা আঘাত করছে না আমিরাত?
সংযুক্ত আরব আমিরাত বলেছে, তাদের প্রতিশোধ নেওয়ার অধিকার আছে, তবে তারা ‘পরিস্থিতিকে অগ্রাধিকার দেবে’।
আমেরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ বলেছেন, ‘এই আগ্রাসনের মুখে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে... তবুও তারা এই হামলার কারণ ও যুক্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সংযম বজায় রেখেছে এবং চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে।’
মূল কথা হলো, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং অন্যান্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুরু করা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত। পর্যটন ও তেল রফতানির ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতিকে আরও বেশি আক্রমণের ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক তারা। কারণ পাল্টা হামলার কারণে তেহরানের সাথে যুদ্ধ আরও তীব্র হবে। এতে হরমুজ প্রণালীতে জ্বালানি সরবরাহ আরও অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যাবে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ৩.২ থেকে ৪.১ মিলিয়ন ব্যারেল উৎপাদন করে আমিরাত যা দেশটির প্রায় ৫৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের জিডিপির ৩০-৪০ শতাংশ এবং সরকারি রাজস্বের ৬০ শতাংশ। যদিও প্রতিবেশীদের তুলনায় দেশটির অর্থনীতিতে বৈচিত্র্যও অনেক বেশি। তাই দেশের জনসংখ্যা এবং অর্থনীতি রক্ষা করাও আমিরাতের প্রধান অগ্রাধিকার।
অন্যদিকে এই মুহূর্তে কেবল প্রতিরক্ষা-ভিত্তিক অবস্থান দুবাইকে কেবল তেল রফতানি ও পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতিকে রক্ষা করতে সাহায্য করে না বরং তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে এবং সম্ভবত যুদ্ধের শান্তিপূর্ণ সমাপ্তির জন্য আলোচনা করতেও সাহায্য করছে।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর ‘সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা... সম্মিলিত প্রতিরক্ষা জোরদার করার সময় সংলাপের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা...’।
এছাড়াও কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, আমিরাত যদি আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে ইরান দাবি করতে পারে যে আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। তখন নিজেদের রক্ষায় আক্রমণ বাড়িয়ে দেবে ইরান। অপরদিকে আমিরাত যদি কিছু না করে, তাহলে তাদের এমন একটি যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে যা তারা শুরু করেনি।
সূত্র: এনডিটিভি
এমএইচআর