images

আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্রকে হারাতে না পারলেও যেভাবে টিঁকে থাকবে ইরান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

০৬ মার্চ ২০২৬, ১০:২২ পিএম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার জবাবে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বলছে, তাদের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সামরিক শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘তাদের (ইরান) আকাশ-প্রতিরোধী ব্যবস্থা, বিমান বাহিনী, নৌবাহিনী আর নেতৃত্ব কিছুই আর নেই’।

মঙ্গলবার দেওয়া ওই পোস্টে তিনি আরও লিখেছেন, ‘ওরা আলোচনায় বসতে চেয়েছিল। আমি বলেছি, অনেক দেরি হয়ে গেছে!’

সামরিক দিক থেকে বিচার করলে ইসরায়েল আর যুক্তরাষ্ট্র অনেকটাই এগিয়ে আছে। সেদিক থেকে বিচার করলে এই যুদ্ধে ইরানের সামনে কী কী বিকল্প আছে? তারা কী কৌশল নিচ্ছে?— এমন প্রশ্নই উঠছে। 

‘ইরান এখন ক্ষয় করার যুদ্ধের কৌশলে’

 

রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটে মধ্য প্রাচ্যের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড. এইচএ হেলার বলছেন, প্রথাগত যুদ্ধ চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলকে পরাজিত করার চেষ্টা এখন আর করছে না ইরান, তবে এই সংঘাতকে তারা ‘দীর্ঘায়িত করে, অঞ্চলের নানা দিকে ছড়িয়ে দিয়ে এবং অর্থনৈতিকভাবে বহুমূল্য’ করতে চাইছে।

তিনি বলেন, ‘ইরান প্রথাগত যুদ্ধে জিততে পারবে না, তবে তাদের কৌশল হলো অন্যপক্ষের কাছে জয়টা যাতে অর্থের দিক থেকে বহুমূল্য আর অনিশ্চিত হয়ে ওঠে।’ 

ফ্রান্সের সিয়ঁসপোয়ের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নিকোল গ্রাজেউস্কিও এই বিষয়ে সহমত পোষণ করেন।

তিনি বলছিলেন, ইরান এখন ‘ক্ষয় করার যুদ্ধের’ কৌশল নিয়েছে। সামরিকভাবে এই কৌশলে প্রতিপক্ষের অস্ত্র, সরঞ্জাম ও লোকবল যাতে কমে আসতে থাকে এবং যতক্ষণ তাদের লড়াই করার ক্ষমতা কমে না আসে, ততক্ষণ শত্রুপক্ষের লাগাতার ক্ষতিসাধন করে যাওয়া যায়। এর একটা মনস্তাত্ত্বিক দিকও আছে।

গ্রাজেউস্কি বলেন, ‘গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ে ইরান ক্রমাগত বেসামরিক এলাকাগুলোর দিকে তাদের নজর সরিয়ে এনেছিল। নির্ভুল নিশানা করার ব্যাপারটা খুব গুরুত্ব পায় না। তবে জনগণের মধ্যে একটা মনস্তাত্ত্বিক ভয় আর আতঙ্ক তৈরি করা যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘ওই ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডারের বড়োসড়ো ক্ষতি হয়েছে, তবে সঠিক সংখ্যাটা এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি, কারণ মাটির নিচেও অনেক অস্ত্র মজুত আছে, আবার নতুন করে অস্ত্র উৎপাদানও করা হচ্ছে।’ 

ইসরায়েলের হিসাব অনুযায়ী ইরানের কাছে এবছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। এর মধ্যে এক হাজার কিলোমিটার রেঞ্জের স্বল্প দূরত্ব আর এক থেকে তিন হাজার কিলোমিটার রেঞ্জের মধ্যম দূরত্বের – দুই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রই আছে।

ইরানের কর্মকর্তারা বলছেন, তারা যে-সব ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছেন, তার মধ্যে যেমন আছে ‘সেজ্জিল’ ক্ষেপণাস্ত্র, যার রেঞ্জ প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার, তেমনই শব্দের দিক থেকেও দ্রুতগতিতে চলার ক্ষমতাধর ‘ফাতাহ্’ ক্ষেপণাস্ত্রও নিক্ষেপ করা হয়েছে।

‘ক্ষেপণাস্ত্রের শহর’

ইরানের কর্মকর্তারা এবং সেদেশের সংবাদমাধ্যম 'ক্ষেপণাস্ত্রের শহর' বা 'মিসাইল সিটি'র উল্লেখ করে থাকে, যা আসলে মাটির নিচে গড়ে তোলা ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডার। এসব ভাণ্ডারগুলির আয়তন আর সেগুলিতে কত ক্ষেপণাস্ত্র রাখা আছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

image

তবে শীর্ষ মার্কিন কমান্ডার জেনারেল ড্যান কেইন বলছেন, গত শনিবার ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথম দিন থেকে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করার সংখ্যা ৮৬ শতাংশ কমে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্ট-কম বলছে, মঙ্গলবার, ৪ মার্চ ওই সংখ্যাটা আরও ২৩ শতাংশ কমেছে।

তবে হেলার মনে করেন, ‘ইসরায়েলের স্থাপনা, এই অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন-মিত্রদের ওপরে হামলা চালানোর ক্ষমতা যেমন এখনও আছে ইরানের, তেমনই হরমুজ প্রণালী দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রেও তারা ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠেছে’।

তার কথায়, ‘হরমুজ প্রণালীতে সামান্য বিঘ্নও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড়ো প্রভাব ফেলবে’।

বিশ্বের জ্বালানি তেলের ২০ শতাংশ ওই সরু প্রণালীটি দিয়েই পারাপার করে, যা এখন ইরান কার্যত বন্ধ করে রেখেছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করলে যে কোনো জাহাজকে তারা আক্রমণ করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে।

ইরানের যদিও অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র আর রকেট উৎক্ষেপণের জ্বালানির সংকট দেখা দিতে পারে। তবে গ্রাজেউস্কি বলছেন, দেশটির কাছে যত ড্রোন মজুত আছে, সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

মনে করা হয়, যুদ্ধের আগেই ইরান হাজারে হাজারে একমুখী আক্রমণের জন্য ‘শাহেদ’ ড্রোন তৈরি করে রেখেছে। এই ড্রোনের কারিগরি ডিজাইন তারা রাশিয়ার কাছে রফতানি করেছে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও এর নকল তৈরি করে ফেলেছে।

সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আক্রমণ করে সেগুলি ক্ষতিগ্রস্ত করা ছাড়াও এই ড্রোনগুলো ব্যবহারের একটি কৌশলগত উদ্দেশ্যও আছে – এই ড্রোনের হামলা সামলাতে যাতে প্রতিপক্ষকে বহুমূল্য ‘ইন্টারসেপ্টার মিসাইল’ ব্যবহার করতে হয় আর তার ফলে ক্রমে শত্রু দেশের আকাশ প্রতিরোধী ব্যবস্থার ক্রমাগত ক্ষয় হতে থাকে।

image

নিকোল গ্রাজেউস্কি বলছেন, ‘এর একটি দিক হলো ইন্টারসেপ্টার নিঃশেষিত করে দেওয়া। চালকহীন বিমান আর ড্রোন ব্যবহার করে ইরান এই কৌশলটা নিয়েছে। একই কৌশল রাশিয়াও নিয়েছে ইউক্রেনে।’

তবে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, সংঘাতের প্রথম দিন থেকে ইরানের ড্রোন উৎক্ষেপণের সংখ্যা ৭৩ শতাংশ কমে গেছে।

সংঘাত দীর্ঘায়িত করতে পারে ইরান?

মধ্যপ্রাচ্যে সব থেকে বড়ো সামরিক বাহিনী আছে ইরানের।

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ প্রকাশিত 'মিলিটারি ব্যালান্স ২০২৫' শীর্ষক প্রতিবেদন বলা হয়েছে যে, ইরানের প্রায় ৬ লাখ ১০ হাজার সৈন্য সবসময়ে প্রস্তুত থাকে। এর মধ্যে সাড়ে তিন লক্ষ সরাসরি সেনাবাহিনীতে আছেন। ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ডস কোর, যারা নিয়মিত কাজের সঙ্গেই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ আর ড্রোন উৎক্ষেপণের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে, তাদের সংখ্যা এক লাখ ৯০ হাজার সদস্য।

এর বাইরেও ইরানের কিছু আঞ্চলিক মিত্র আছে, যেমন হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী, ইরাকে কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী, লেবাননে হেজবুল্লাহ আর গাজা ভূখণ্ডে হামাস।

তবে ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাস গাজা থেকে হামলা চালানোর পরে এই অঞ্চলে যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছিল, তার ফলে ইরানের এই স্বঘোষিত ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ বড়োসড়ো ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে।

সাম্প্রতিক সমস্যাগুলো সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত মোকাবিলা করার অভিজ্ঞতা আছে ইরানের, বলছিলেন গ্রাজেউস্কি। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় থেকেই এটা লক্ষ্য করা গেছে। তবে ইরানের এই কৌশল কতটা কাজ করবে, তা নির্ভর করবে দেশটির অভ্যন্তরে কতটা সংহতি আছে, তার ওপরে।

গ্রাজেউস্কি বলছিলেন, ‘নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক শীর্ষ নেতৃত্ব কতটা এক থাকতে পারেন এবং তাদের মধ্যে কোনো বিভেদ আছে কি না, তার ওপরেই সবটা নির্ভর করবে। পরিস্থিতি যদি সত্যিই এমন হয়, তাহলে সামরিক কৌশল নিয়েও বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মনে হচ্ছে ক্ষেপণাস্ত্র যারা নিক্ষেপ করছেন, তাদের ওপরে খুব চাপ আছে, তারা পরিশ্রান্তও। এই সময়ে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করায় ভুল হয়ে যেতে পারে, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণেও ভুল হতে পারে। অনেক কিছুই বেশ অসংগঠিত মনে হচ্ছে, আর পরিশ্রান্ত হওয়াটাও স্পষ্ট হচ্ছে।’ 

এরকম একটা সময়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের ওপরে যদি বারবার হামলা হয়, তাহলে বাহিনী ভুলক্রমেই সংঘাতের মাত্রা বাড়িয়ে ফেলতে পারে।

সংঘাত কি আরও বাড়বে?

গ্রাজেউস্কি তুরস্কের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছেন, ন্যাটোর আকাশ-প্রতিরোধী ব্যবস্থা বুধবার তাদের দেশে উড়ে আসা একটি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে।

ইরানের প্রতিবেশী দেশ তুরস্ক চেয়েছিল , যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানের মধ্যে একটি আলোচনায় মধ্যস্থতা করতে। তুরস্ক সব পক্ষকে এই বার্তাও দিয়েছিল যে তারা যেন সংঘাত আরও বাড়তে পারে, এমন কোনো কাজ না করে।

তবে ইরানের বৃহত্তর লক্ষ্য ছিল প্রতিবেশী দেশগুলোর সামনে এতটাই কঠিন শর্ত হাজির করা, যাতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপরে চাপ তৈরি করতে পারবে, অথবা, অন্তত সংঘাত এড়ানোর জন্য আলোচনার মাধ্যমে আমেরিকাকে সংঘাত থেকে সরিয়ে আনতে পারবে।

মিজ গ্রাজেউস্কি বলছেন, ‘আমি জানি না এই প্রচেষ্টা সফল হবে কি না, তবে ইরানের হাতে এই একটাই তুরুপের তাস আছে।’ তবে এরকম একটা বাজির পাশা উল্টিয়েও যেতে পারে।

হেলার বলছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলি এরকম একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে তারা আগে ইরানের ওপরে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধের বিরোধিতা করলেও এখন তাদের নিজেদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে, কারণ ইরান তাদের ওপরে হামলা চালাচ্ছে। তাই তারা হয়ত ইরানের দিক থেকে সাম্প্রতিক হুমকির মুখে মার্কিন হামলাকে সমর্থন করতে পারে।"

তিনি বলছেন, ‘উপসাগরীয় দেশগুলি এখনও ওই সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।’ বিবিসি বাংলা

এমএইচআর