আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:৩৩ পিএম
পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারলে ইরানে হামলা করা হবে- যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন হুমকির মধ্যেই সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় তৃতীয় দফার পরোক্ষ আলোচনায় বসছেন মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা।
২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর ইরাক আক্রমণের পর মধ্যপ্রাচ্যে সব থেকে বড় সেনা সমাবেশ করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। ইরানও এই আক্রমণের জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। এমন একটি পরিস্থিতিতে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এই আলোচনাকে সংঘাত রোধের শেষ প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে, তবে চুক্তির সম্ভাবনা এখনো অস্পষ্ট।
ট্রাম্প যদিও বলেছেন, তিনি কূটনীতির মাধ্যমে সংকট সমাধান করতে পছন্দ করেন। তবে ইরানের নেতাদের চুক্তি মেনে নিতে চাপ দেওয়ার জন্য দেশটির ওপর সীমিত পরিসরে হামলার কথা বিবেচনা করছেন তিনি।
যদিও আলোচনায় তিনি কী দাবি করছেন এবং ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের সময় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আমেরিকা বোমা হামলা চালানোর আট মাস পর এখন কেন সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে, সেটি ব্যাখ্যা করেননি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
ইরান তার ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করার মার্কিন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে, তবে তারা যে নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচিতে কিছু ছাড় দিতে প্রস্তুত এমন ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে ।
এই মাসের শুরুতে ওমানের মধ্যস্থতায় হওয়া আগের দুই দফা আলোচনার মতো, ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করবেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করেছে। ট্রাম্প যাকে ‘আর্মাডা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যেখানে দুটি বিমানবাহী রণতরী, অন্যান্য যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান এবং জ্বালানি বহনকারী বিমান রয়েছে।
গত মাসে ট্রাম্প প্রথমবারের মতো ইরানে বোমা হামলার হুমকি দিয়েছিলেন। ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী দেশটির সরকারবিরোধী বিক্ষোভ নির্মমভাবে দমন করার সময় হাজার হাজার মানুষ নিহত হওয়ার প্রেক্ষাপটে ওই হুমকি দেন তিনি। কিন্তু তারপর থেকে, ট্রাম্পের মনোযোগ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির দিকে চলে যায়, যা পশ্চিমাদের সাথে দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে।
কয়েক দশক ধরে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টার অভিযোগ করে আসছে। তবে ইরান জোর দিয়ে বলেছে, তাদের কর্মসূচি কেবল শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে, যদিও দেশটি একমাত্র অ-পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র যারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি সম্ভব এমন স্তরের কাছাকাছি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে।
গত মঙ্গলবার কংগ্রেসে তার স্টেট অফ দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা নিয়ে সংক্ষিপ্ত এবং অস্পষ্টভাবে কথা বলেছেন ট্রাম্প, সেখানে সম্ভাব্য হামলার কারণ নিয়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেননি তিনি। বিস্তারিত কিছু না জানিয়ে ট্রাম্প বলেন, ইরান এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কাজ করছে, যা ‘শিগগিরই’ যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম হবে।
গত বছরের হামলার পর ইরান ‘পুনরায় নতুন করে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি শুরু করার’ চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেন ট্রাম্প এবং বলেন যে তিনি ‘বিশ্ব সন্ত্রাসের এক নম্বর পৃষ্ঠপোষককে পারমাণবিক অস্ত্র রাখার’ অনুমতি দিতে পারেন না।
গত জুনে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ওই সময় ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, স্থাপনাগুলো নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। ইরানও তখন জানিয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার পর তাদের পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। যদিও আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার পরিদর্শকদের ওই সময় ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলোতে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি দেশটি।
ট্রাম্পের ভাষণের কয়েক ঘণ্টা আগে, সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্ট করেছিলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। যেখানে ইরান ‘কোনো পরিস্থিতিতেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
আরাঘচি আরও বলেছিলেন, ‘পারস্পরিক উদ্বেগ মোকাবিলা এবং স্বার্থ অর্জনের জন্য একটি অভূতপূর্ব চুক্তিতে পৌঁছানোর ঐতিহাসিক সুযোগ’ রয়েছে।
এদিতে যুক্তরাষ্ট্রে সঙ্গে একটি চুক্তিতে যেতে ইরানের প্রস্তাবগুলো প্রকাশ করা হয়নি, তবে জেনেভায় হওয়া আলোচনায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের একটি আঞ্চলিক কনসোর্টিয়াম গঠনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে—যা আগের আলোচনাগুলোতেও উত্থাপিত হয়েছে।
এছাড়াও ইরানের প্রায় ৪০০ কেজি (৮৮০ পাউন্ড) উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ নিয়ে কী করা হবে, সে সম্পর্কিত বিভিন্ন ধারণাও আলোচনায় থাকতে পারে। এর বিনিময়ে ইরান আশা করছে যুক্তরাষ্ট্র তাদের এমন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে, যা ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে।
সূত্র: বিবিসি
এমএইচআর