আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:৫৫ পিএম
যৌথভাবে ক্ষেপণাস্ত্র, হেলিকপ্টার তৈরিসহ সামরিক ও বেসামরিক ক্ষেত্রে ২০টিরও বেশি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে ভারত ও ফ্রান্স।
গতকাল মঙ্গলবার মুম্বাইয়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিরর মধ্যে মুম্বাইতে এক দীর্ঘ বৈঠকে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গেই দুই দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা আরও জোরালো করার বার্তা দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকেই ভারতের কর্ণাটক ফ্রান্সের সঙ্গে যৌথভাবে নির্মিত একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন হেলিকপ্টার ‘অ্যাসেমব্লি’ কারখানার উদ্বোধন করা হয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ম্যাক্রোঁর সফর চলাকালীন দুই দেশের মধ্যে ‘হ্যামার’ ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণসহ সামরিক ও বেসামরিক ক্ষেত্রে ২০টিরও বেশি চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে। পৃথকভাবে ১১৪টি রাফাল যুদ্ধবিমান কেনা নিয়েও চুক্তি হয়েছে।
দীর্ঘ বৈঠকের পরে ফরাসি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মোদি বলেন, ফ্রান্স ভারতের প্রাচীনতম কৌশলগত অংশীদারদের অন্যতম। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর কার্যকালে সেই সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের সম্পর্ককে এখন 'বিশেষ বৈশ্বিক কৌশলগত অংশীদারিত্বে' উন্নীত করছি। এই সহযোগিতা শুধুমাত্র কৌশলগত নয়। গতিশীল বিশ্বের বর্তমান যুগে এই অংশীদারীত্ব বৈশ্বিক স্থায়িত্ব ও অগ্রগতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।’
সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কথা উল্লেখ্য করে মোদি আরও বলেন, ‘২০২৬ সাল ভারত আর ইউরোপের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি মোড় ঘোরানোর বছর।’
যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ বলেন, ‘গত আট বছরে ভারত আর ফ্রান্স বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা করে এসেছে। এখন এই সহযোগিতাকে আমরা বিশেষ কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত করতে পেরে আনন্দিত।’
এদিকে সংবাদ সম্মেলনেই নরেন্দ্র মোদী ঘোষণা করেন, ফ্রান্সের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এমন এক হেলিকপ্টার তৈরি হবে ভারতে, যা বিশ্বের একমাত্র হেলিকপ্টার হবে যেটি মাউন্ট এভারেস্টের শিখরের উচ্চতাতেও উড়তে পারবে।
এইচ-১২৫ নামের হেলিকপ্টার কারখানাটিও এদিন উদ্বোধন করেন দুই শীর্ষ নেতা। ফরাসি বিমান নিমার্তা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস এবং ভারতের শিল্প গোষ্ঠী টাটা-এর যৌথ উদ্যোগে এই কারখানাটি গড়েছে কর্ণাটকের ভিমাগালে। তবে
এই কারখানাটি অবশ্য একটি ‘অ্যাসেম্বলি লাইন’, অর্থাৎ হেলিকপ্টারের বিভিন্ন অংশ এখানে জুড়ে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া হবে।
ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, এই কারখানায় প্রায় এক হাজার কোটি রুপি বিনিয়োগ করা হবে এবং ভারতীয়দের জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বড়ো সংখ্যায় চাকরির সুযোগ তৈরি করবে। এছাড়াও
ভারতের কারখানা থেকে এই হেলিকপ্টার সারা বিশ্বে রফতানি করা হবে বলে জানিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। এই কারখানা ভারতের প্রথম বেসরকারি হেলিকপ্টার নির্মাণ কারখানা।
প্রসঙ্গত, এইচ-১২৫ হেলিকপ্টারই একমাত্র হেলিকপ্টার, যেটি মাউন্ট এভারেস্টে নামতে পেরেছে। বিশেষত হিমালয়ের সুউচ্চ পর্বত অঞ্চলে সামরিক বাহিনীর কাছে খুবই প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম হিসাবে তুলে ধরা হচ্ছে এই হেলিকপ্টারকে। আগামী দুবছরের মধ্যে ভারতে তৈরি প্রথম এইচ১২৫ হেলিকপ্টার বাজারে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
নরেন্দ্র মোদী ও এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর বৈঠক ছাড়া দুই দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের মধ্যে মঙ্গলবার সামরিক সহযোগিতা সংক্রান্ত বৈঠক হয়েছে বেঙ্গালুরুতে।
দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সামরিক সহযোগিতা সংক্রান্ত চুক্তির মেয়াদ আরও দশ বছর বাড়ানো হয়েছে ওই বৈঠকে। তবে এই বৈঠকটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে যৌথ উদ্যোগে 'হ্যামার' ক্ষেপণাস্ত্র ভারতেই নির্মাণ করার বিষয়টি।
আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপের এই ‘হ্যামার’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরের অতি গুরুত্বপূর্ণ কোনো লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত ভাবে হামলা চালাতে সক্ষম। সেই লক্ষ্যবস্তুটিকে যদি কংক্রিটের মোটা চাদরে মুড়ে রাখা থাকে বা ব্যাপক নিরাপত্তার মধ্যে থাকে সেটি, তাতেও এই 'হ্যামার' ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করতে পারে।
পার্বত্য এলাকা সহ দুর্গম অঞ্চলে এই ক্ষেপণাস্ত্রটি খুবই কার্যকর। ফ্রান্সের তৈরি রাফাল যুদ্ধবিমান এবং ভারতে নির্মিত তেজসে এই ক্ষেপণাস্ত্র সংযুক্ত করা যায়। গত বছর পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাতে- 'অপারেশন সিন্দুর'এ এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছিল ভারত। এর আগে ২০২০ সালে চীনের সঙ্গে যখন গালওয়ানে ভারতীয় বাহিনীর উত্তেজনা চরমে উঠেছিল, তখন জরুরি ভিত্তিতে এই ক্ষেপণাস্ত্র কিনেছিল ভারত।
সূত্র: বিবিসি
এমএইচআর