আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:০৬ পিএম
গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দেড় বছর পর নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভোট দিচ্ছেন দেশের মানুষ। একই সঙ্গে গণভোটের মাধ্যমে সংবিধানের বেশ কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনার প্রস্তাবের পক্ষে-বিপক্ষে ‘হ্যাঁ’-‘না’ ভোট দিয়ে মত জানাচ্ছেন তারা। বাংলাদেশের এই নির্বাচনের খবর গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো।
‘একটি উৎসব: ঐতিহাসিক নির্বাচনে আশা নিয়ে ভোট দিচ্ছে বাংলাদেশ’— শিরোনামে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ৩০ বছরের কম বয়সীদের নেতৃত্বে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের পর বিশ্বের প্রথম নির্বাচন বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘জেন-জি নেতৃত্বাধীন ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দক্ষিণ এশিয়ার দেশ বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ভোটকেন্দ্রের বাইরে ভোটারদের সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশে স্থিতিশীল শাসনব্যবস্থার জন্য এবারের নির্বাচনে সুনির্দিষ্ট ফলাফল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শেখ হাসিনাবিরোধী প্রাণঘাতী আন্দোলনে কয়েক মাসের ব্যাপক অস্থিরতায় বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশটির গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন শিল্প খাতের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

বার্তা সংস্থা এএফপির শিরোনাম ‘গণ–অভ্যুত্থানের পর নির্বাচনে বাংলাদেশে বেশি ভোটারের অংশগ্রহণের প্রত্যাশা’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানে ১৫ বছরের স্বৈরশাসনের অবসানের পর অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনে তারা ব্যাপক ভোটারের অংশগ্রহণ আশা করছে।
বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ‘লাইভ নিউজ’ প্রকাশ করছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
এক প্রতিবেদনে বিবিসি লিখেছে, বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ চলছে এবং এরই মধ্যে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর শীর্ষ ও সিনিয়র নেতারা নিজ ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নিজেদের জয়ের ব্যাপারে আশা প্রকাশ করেছেন।
সারাদেশে কোথাও কোথাও ভোটার উপস্থিতি কম দেখা গেলেও সার্বিকভাবে তেমন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। যদিও নির্বাচনের আগের রাতে অংশগ্রহণকারী দলগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ এনেছিল।
অন্য একটি প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এটি শুধু ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচনই নয়, বরং কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথমবার বাংলাদেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব—শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া—কেউ-ই নির্বাচনী মাঠে নেই। ভোটাররা কেবল নতুন সরকারই নির্বাচন করবেন না; তারা একটি সাংবিধানিক গণভোটেও অংশ নেবেন, যেখানে ‘জুলাই সনদ’ নামে ব্যাপক সংস্কারপ্যাকেজ বাস্তবায়িত হবে কিনা সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ ছাড়া প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো পোস্টাল ভোটের মাধ্যমে গ্রহণ করা হচ্ছে।
তুর্কি বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি লিখেছে, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটানোর পর প্রথমবারের মতো নতুন সরকার নির্বাচনের জন্য বৃহস্পতিবার ভোট দিচ্ছেন বাংলাদেশের ১২ কোটি ৭৬ লাখেরও বেশি মানুষ। এই নির্বাচনে সারা দেশে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য প্রায় ১০ লক্ষ নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।
‘বাংলাদেশে নির্বাচনের প্রস্তুতির মধ্যে ইসলামপন্থিদের প্রভাব বাড়ছে’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জার্মানিভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্য যে কোনো নির্বাচনের মতো নয়। আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দেয়ায় শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে জোট করে একটি ইসলামপন্থি দল শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে।

কলকাতা-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার লিখেছে, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের ২৯৯টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ চলছে। ঢাকার গুলশান মডেল হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজে ভোট দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। গুলশান মডেল হাই স্কুলে ভোট দিয়েছেন বিএনপি-র চেয়ারম্যান তারেক রহমানও। বৃহস্পতিবার সকালে স্ত্রী জুবাইদা রহমান এবং মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে ভোট দেন তিনি।
এছাড়াও বাংলাদেশের সর্বত্রই মোটের ওপর নির্বিঘ্নে নির্বাচন চলছে। বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রের বাইরে ভোটারদের লম্বা লাইন দেখা গেছে বলে জানিয়েছে আনন্দবাজার।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে শিরোনামে বলা হয়েছে, ‘তারেক রহমান বনাম জামায়াত: হাসিনার পতনের ১৮ মাস পর ভোট দিচ্ছে বাংলাদেশ’।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএনপির বড় প্রতিপক্ষ হলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, একটি কট্টরপন্থী ইসলামী দল যেটি একসময় তাদের মিত্র ছিল। বাংলাদেশের পর্যবেক্ষকরা বিএনপির জয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করলেও, তারা স্বীকার করেছেন যে জামায়াত নির্বাচনে তাদের সেরা ফলাফল অর্জন করবে।
ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআই-এর প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়েছে, ‘ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অনিশ্চয়তার মধ্যে ভোট হচ্ছে বাংলাদেশে।’
আরেক ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার লাইভ প্রতিবেদনের একটি বলেছে, ‘বাংলাদেশের নির্বাচন : হাসিনা নেই, বিএনপির প্রত্যাবর্তন এবং পুনরুজ্জিীবিত জামায়াত’।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আওয়ামী লীগ বাদ পড়ায়, নির্বাচন কার্যত বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ইসলামপন্থী জোটের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান ১৭ বছরের নির্বাসন থেকে ফিরে বিএনপিকে নির্বাচনে নেতৃত্ব দেন। তিনি স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার, অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
অন্যদিকে ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামী তৃণমূল পর্যায়ে সুশৃঙ্খল প্রচেষ্টা শুরু করেছে। তাদের জোটে ২০২৪ সালের শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা তরুণ কর্মীদের দ্বারা গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টিও (এনসিপি) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা এই নির্বাচনে একটি প্রজন্মগত মাত্রা যোগ করেছে।
এমএইচআর